এবার দলীয় প্রতীক হারানোর ঝুঁকিতে মমতার তৃণমূল
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর ভেঙে খানখান হওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস এবার দলীয় প্রতীক ‘জোড়া ঘাসফুল’ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে।
দল ভেঙে বেরিয়ে আসা তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ নেতারা সোমবার দলের চেয়ারপারসনের পদ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরিয়ে দিয়েছেন।
দলের নতুন চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়েছে হাওড়ার মধ্য বিধানসভার বিধায়ক ও রাজ্যের সাবেকমন্ত্রী অরূপ রায়কে। সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়সহ ৪ জন।
মঙ্গলবার আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এবার বিদ্রোহীরা দলীয় প্রতীক ‘কব্জা’ করবেন কিনা, সেই জল্পনা শুরু হয়েছে।
এ ঘটনার পর মমতাপন্থি তৃণমূল নেতারা বিদ্রোহীদের ‘বেঈমান’ বলতে ছাড়েননি। আট নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিসও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু তাতে দলের প্রতীক হাতছাড়া হওয়া আটকানো যাবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সংশয় রয়েছে। কারণ নির্বাচন কমিশনকে নতুন কমিটির কথা জানানো হবে বলে ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছেন ঋতব্রত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে আনন্দবাজার লিখেছে, নির্বাচন কমিশনকে নতুন কমিটির কথা জানালে জোড়া ঘাসফুল প্রতীকের ‘দখল’ পাওয়া বিদ্রোহীদের পক্ষে খুব একটা কঠিন হবে না।
“তাই চুপ করে বসে নেই তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা। ইতোমধ্যে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়ায় (এনসিপিআই) মিশে গেছেন তারা। তা সত্ত্বেও ঘাসফুল প্রতীকের জন্য সর্বশক্তিতে ঝাঁপাতে দেখা যাবে তাদের,” লিখেছে পশ্চিমবঙ্গের পত্রিকাটি।
অতীতে ত্রিপুরার বিধানসভার নির্বাচনে ‘কলমের নিব’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল এনসিপিআই। কিন্তু সেই প্রতীক একেবারেই পছন্দ নয় তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদের। তাই গত ১৮ জুন নিজেদের নেত্রী শতাব্দী রায়ের কলকাতার বাড়িতে বৈঠক করেন তারা। সেখানেই ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক ‘কব্জা’ করতে আদালতে যাওয়ার আলোচনা হয়।
জন্মলগ্ন থেকে তৃণমূলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে ‘ঘাসফুল’ প্রতীক। এর স্রষ্টা হিসাবে বরাবর নিজেকে তুলে ধরেছেন মমতা। যদিও এই নির্বাচনি প্রতীক নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। আনন্দবাজার বলছে, পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর ঘাসফুল প্রতীকের ছবিটি মমতার আঁকা নয় বলে বিস্ফোরক দাবি করে বসেন সোমনাথ চৌধুরী নামের এক চিত্রশিল্পী। এক সময় কংগ্রেসের ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে মমতাকে বহিষ্কার করে কংগ্রেস। ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে দলের নাম আগেই নথিভুক্ত করা হয়েছিল। প্রথমে সেটা ছিল, পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেস। পরে পাল্টে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস নাম রাখেন মমতা। বিজেপির সঙ্গে জোট করে ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীকে সে বছর লোকসভা নির্বাচন করে তার দল।
তৃণমূলের দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীকটির একটি বিশেষ অর্থ আছে। এর মাধ্যমে সমাজের নিচুতলা থেকে শুরু করে আমজনতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফুটিয়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
চিত্রশিল্পী সোমনাথ চৌধুরীর দাবি, প্রয়াত এমপি অজিত পাঁজার নির্দেশে ওই লোগো তৈরি করেন তিনি। আনুষ্ঠানিকভাবে তখনো তৃণমূলের জন্ম হয়নি।
সে সময়কার স্মৃতিচারণ করে সোমনাথ বলেছিলেন, কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত মমতা যে নতুন দল তৈরি করতে চলেছেন, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া যায়নি। তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার দিনই তার আঁকা লোগোকে নির্বাচনী প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করা হয়। এই নকশা তৈরির ষোলআনা কৃতিত্ব দাবি করে বসেন মমতা। ফলে রাতারাতি মুছে যায় সোমনাথের নাম। এভাবে তার শিল্পীসত্ত্বাকে অস্বীকার করা হচ্ছে দেখেও ‘ভয়ে’ কাউকে কিছু বলতে পারেননি তিনি।
২০০৪ সালে বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ভরাডুবি হয় তৃণমূলের। মমতা নিজে ছাড়া আর কেউই ভোটে জিততে পারেননি। পরের বছর কলকাতা পৌরসভাও হাতছাড়া হয় তার।
২০০৬ সালের ভোটে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মাত্র ৩০টি আসন জেতে ‘জোড়া ঘাসফুল’ শিবির। কোনোমতে বিরোধী দলের তকমা পায় তৃণমূল। তবে অটুট ছিল দল। প্রতীক নিয়েও টানাহেঁচড়া হয়নি।
২০১১ সালে কংগ্রেস এবং এসইউসিআইয়ের সঙ্গে জোট বেঁধে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর সর্বভারতীয় দল হয়ে উঠতে গোয়া, ত্রিপুরা, আসাম, মনিপুর, অরুণাচল প্রদেশ এবং কেরালায় শাখা খোলা হয়। ফলে তৃণমূলের দখলে আসে বেশ কয়েকটা বিধানসভা আসন। রাজ্যসভাতেও প্রতিনিধি বাড়াতে সক্ষম হয়েছিল তারা।
