জেন-জি বিক্ষোভের পর ‘পরিবর্তনের’ আশায় ভোট দিচ্ছে নেপাল
তরুণদের নেতৃত্বাধীন নজিরবিহীন বিক্ষোভ এবং ৭৭ জনের মৃত্যু নেপালে প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করার প্রায় ছয় মাস পর নতুন করে পার্লামেন্ট সদস্যদের বেছে নিতে সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে হিমালয়ের কোলে থাকা ছোট দেশটি।
চীন ও ভারতের মাঝে চিড়েচ্যাপ্টা অবস্থায় থাকা দেশটির ৩ কোটি মানুষ কয়েক দশক ধরেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় জর্জরিত; কৃষি নির্ভর অর্থনীতি ক্রমশ পঙ্গু হয়ে আসছে, বেকারত্ব তরতর করে বাড়ছে, ব্যাপক দুর্নীতি এসব সমস্যাকে আরও প্রকট করছে।
এসব ঘিরে দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, অসন্তোষ গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিস্ফোরিত হয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, বাধে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, যার জেরে শেষ পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলিকে পদত্যাগ করতে হয়।
মধ্যপন্থি কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালকে (ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট, ইউএমএল) নেতৃত্ব দেওয়া সেই ওলি বৃহস্পতিবারের নির্বাচনেও লড়ছেন, তার সঙ্গে লড়ছে ৬৫টি দলের ৩ হাজার ৪০০-র বেশি প্রার্থী, জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
৪৯ বছর বয়সী গগন থাপার নেতৃত্বে এবারের নির্বাচনে আছে দেশটির সবচেয়ে পুরনো দল নেপালি কংগ্রেস এবং মাওবাদী বিদ্রোহের লাইন ছেড়ে মূলধারার রাজনীতিতে যোগ দেওয়া নেপালি কমিউনিস্ট পার্টিও (এনসিপি)।
গত তিন দশকে এই তিনটি দলই নেপালের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, তা সত্ত্বেও গত ৩৫ বছরে ৩২ বার সরকার বদলাতে দেখেছে দেশটি।
তবে এবার এ তিন দল নয়, নির্বাচনে সবচেয়ে ভালো করার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে তিন বছরের পুরনো দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি), যারা তাদের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছে র্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া বালেন্দ্র শাহকে।
রাজধানী কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র, ৩৫ বছর বয়সী বালেনের নির্বাচনী প্রচারণায় বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি দেখা গেছে; অনলাইন-অফলাইনে অসংখ্য তরুণের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছেন তিনি, যারা পরিবর্তনের পক্ষে সোচ্চার। তিনি ওলির বিরুদ্ধে ভারত সীমান্তবর্তী সেই আসনেই লড়ছেন, যেটি ৭৪ বছরের রাজনীতিকের পুরনো ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
“তরুণদের যে আকাঙ্ক্ষা জেন-জি বিক্ষোভের মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছিল, তা পূরণের ক্ষেত্রে এবারের নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি নতুন নেতারা তা পূরণে অযোগ্য হন, তাহলে আরও সমস্যার ঝুঁকি তৈরি হবে,” বলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক পুরঞ্জন আচার্য।
মিশ্র পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্থায় পার্লামেন্টের ২৭৫ সদস্য বেছে নিতে এবার নেপালের ১ কোটি ৯০ লাখের মতো ভোটার তাদের রায় জানাতে পারবেন। এর মধ্যে ১৬৫ জন সাংসদ নির্বাচিত হবেন আসনভিত্তিতে, ১১০ জন আসবেন সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বে।
বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে, শেষ হবে বিকাল ৫টায়। এরপরই ভোট গণনা শুরু হবে বলে দেশটির নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
জনরায়ের পাল্লা কোনদিকে ভারি তা শুক্রবার খানিকটা বোঝা গেলেও সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি থাকায় পুরো ফলাফল পেতে এক সপ্তাহ বা তারচেয়েও বেশি সময় লেগে যেতে পারে।
“ভোট দেওয়া মানে কেবল কাউকে বিজয়ী করে পাঠানো নয়। এটা এমন এক সিদ্ধান্ত যা আপনি আপনার এবং আপনার সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য নিচ্ছেন,” চলতি সপ্তাহে জনগণের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে এমনটাই বলেছেন ওলির পদত্যাগের পর দায়িত্ব নেওয়া নেপালের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি।
গত বছরের সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভে যেসব দাবি উঠে এসেছিল—কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, দুর্নীতি নির্মূল, সুশাসন, এবারের নির্বাচনী প্রচারেও সেসব দাবি পূরণের অঙ্গীকারই ছিল সব প্রার্থীর মুখে। তাদের সেই প্রচারণা শেষ হয় সোমবার, ভোটের দুই দিন আগে।
একেবারে শেষ মুহূর্তের প্রচারেও কাঠমান্ডুতে বেশিরভাগ প্রার্থীকে গলায় ফুলের মালা পরে, কপালে সিঁদুর দিয়ে রাস্তায় হেঁটে, ট্রাকে বা ছাদখোলা গাড়িতে চড়ে ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করতে দেখা গেছে।
এতসবের পরও অনেক ভোটারের দ্বিধা কাটছে না।
“পুরনো দলগুলো দুর্নীতি ছাড়া কিছু করেনি। নতুনগুলোকেও ভালো মনে হচ্ছে না। কাকে সমর্থন দেব, এখনও সিদ্ধান্ত নিইনি,” রাজধানীর উপকণ্ঠে একটি খবরের কাগজের দোকানে আধডজন লোকের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় এমনটাই বলেছেন ৫০ বছর বয়সী রামকৃষ্ণ পান্ডে।