সোমবার ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, মাঘ ৬ ১৪৩২, ৩০ রজব ১৪৪৭

আন্তর্জাতিক

অবশেষে ইউরোপ বুঝল, যুক্তরাষ্ট্র আর তাদের বন্ধু নয়

 প্রকাশিত: ১০:৩৬, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

অবশেষে ইউরোপ বুঝল, যুক্তরাষ্ট্র আর তাদের বন্ধু নয়

বছর খানেক আগে ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর থেকে ইউরোপের সরকারগুলোকে নিজেদের বোঝাতে থাকে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যে মিত্রতা, তা ঠিকঠাকই থাকবে।

তারা মার্কিন সরকারের শুল্ক ও নানা অপমান হজম করেছে; ট্রাম্পকে বিভিন্ন উপহার দিয়েছে; তোষামোদ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে প্রকাশ্যে একটি কথাও বলেনি।

তবে যুক্তরাষ্ট্র আর মিত্র নাও থাকতে পারে— এমন একটা ধারণা তাদের ভেতরে ভেতরে ঠিকই ছিল।

এর মধ্যে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে গত এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ ইউরোপের নেতাদের মধ্যে এই ধারণা পোক্ত করেছে যে, ট্রাম্প নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র এখন বাস্তব অর্থেই তাদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গেল ডিসেম্বরে ‘জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্র’ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে ইউরোপ ‘সভ্যতাগত বিলুপ্তির’ মুখে রয়েছে বলে দাবি করা হয়। সঙ্গে বলা হয়, ইউরোপের কট্টর ডানপন্থি ‘দেশপ্রেমিক’ দলগুলোর প্রতি মার্কিন সমর্থন অব্যাহত থাকবে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অবজারভার এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলেছে, ওই কৌশলপত্রের মাধ্যমে ইউরোপের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায়।

এর মধ্যে ডনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় নেওয়ার জন্য গো ধরলে দুই পক্ষের দূরত্ব অবধারিত হয়ে ওঠে।

গত কয়েক দিনে ইউরোপের নেতারা ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা সতর্কবার্তা শুনিয়েছেন এবং গ্রিনল্যান্ডের বিষয়ে ডেনমার্কের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাম মুখে আনা থেকে বিরত রয়েছেন।

অন্যদিকে শনিবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করায় যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের আট দেশকে অতিরিক্ত মার্কিন শুল্কের মুখে পড়তে হবে।

অবজারভারের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের এ ঘোষণার মুহূর্তেই ইউরোপের নেতাদের উচিৎ ছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রকাশ্যে ও দ্ব্যর্থহীনভাবে সম্পর্কের ইতি টানা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপ ইতোমধ্যে এমন এক বিশ্বের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পাশে থাকবে না।

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াই ন্যাটো— এই ধারণা ইউরোপ এখন সক্রিয়ভাবেই বিবেচনা করছে।

গত সপ্তাহে ইইউয়ের প্রতিরক্ষা কমিশনার আন্দ্রিউস কুবিলিউস বিষয়টি স্পষ্ট করার চেষ্টা করেন। তিনি ইউরোপে মোতায়েনকৃত ১ লাখ মার্কিন সেনার বিকল্প কী হতে পারে, তা সহকর্মীদের ভেবে দেখতে বলেন।

তিনি একটি ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব দেন, যা যৌথ সামরিক পদক্ষেপ সমন্বয় করবে।

সম্প্রতি সুইডেনের জাতীয় প্রতিরক্ষা সম্মেলনে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা স্মরণ করিয়ে দেন কুবিলিউস, যেখানে সশস্ত্র আগ্রাসনের মুখে পড়া সদস্য রাষ্ট্রের জন্য পারস্পরিক সহায়তার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এই অনুচ্ছেদ যখন লেখা হয়, তখন সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভাব্য আক্রমণকারী হিসেবে ইউরোপ কখনো কল্পনাও করেনি।

ন্যাটোর নীতি পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক পরিচালক ফ্যাব্রিস পোঁতিয়ের বলেন, “আমাদের এখন যুক্তরাষ্ট্রবিহীন ন্যাটো নিয়ে ভাবতে হবে।”

“অন্তত এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমাদের গড়ে তুলতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমান না হলেও যেন যথেষ্ট কার্যকরী হয়।”

২০২২ সালে ইউক্রেইনে রাশিয়ার হামলা যেভাবে সুইডেন ও ফিনল্যান্ডকে ন্যাটোতে যোগ দিতে উৎসাহ যুগিয়েছিল, একইভাবে গ্রিনল্যান্ড দখলে নেওয়ার মার্কিন আকাঙ্ক্ষা ইউরোপের দেশগুলোকে অকল্পনীয় অনেক কিছু ভাবতে বাধ্য করছে।

মাইক্রোসফটের মতো আমেরিকান প্রযুক্তির ওপর ইউরোপের নির্ভরতাও এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ইউরোপের অনেক সরকারেরই অবকাঠামোগত চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ঘোষণা দেয়, তারা মাইক্রোসফট অফিসের পরিবর্তে জার্মান সফটওয়্যার ব্যবহার করবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ফলে মাইক্রোসফট সেবা বন্ধ করে দিতে পারে— এমন একটা আশঙ্কা ছিল। এখন ইউরোপের কিছু সরকারও একই ধরনের চিন্তাভাবনা করছে।

ইউরোপের অনেকেই মনে করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাজের কাজের চেয়ে কথাই বেশি ধাক্কা দিয়েছে।

চলতি মাসে সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার মার্কিন প্রশাসনের নতুন বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেন।

তিনি বলেন, “আমরা এমন এক দুনিয়ায় বাস করি, যেখানে আন্তর্জাতিক সৌজন্য নিয়ে যতই কথা বলুন, বাস্তব দুনিয়া চলে শক্তি, বলপ্রয়োগ আর ক্ষমতা দ্বারা।”

চ্যাথাম হাউসের পরিচালক ব্রনউইন ম্যাডক্স বলেন, “এটা এক গভীর পরিবর্তন। একে পশ্চিমা জোটের অবসান বললেও বাড়াবাড়ি হবে না।

“সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, গত এক বছরে, এমন আশা প্রবল ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশের পর তা বদলে গেছে।”

তিনি বলেন, “এটা ছিল মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মুহূর্ত, যেখানে ইউরোপের প্রতি অবজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। নথিটি সত্যিই বিস্ময়কর।”

যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াবে— এমন আশা অবশ্য এখনও অনেকের মধ্যে আছে, যারা তাকিয়ে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে।

তারা আশা করছেন, ওই নির্বাচনে রিপাবলিকানরা পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে নিয়ন্ত্রণ হারাবে এবং ট্রাম্পের উত্তরসূরি খোঁজার দৌড় শুরু হবে। এরপর ২০২৮ সালে যদি কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী প্রেসিডেন্ট হন, তখন হয়ত আবার ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ঠিক হয়ে যাবে।

ম্যাডক্স অবশ্য এতটা আশাবাদী নন। তার মতে, এসব নির্বাচনে শুধু ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তার পরীক্ষা নয়, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন কতটা অবাধ ও সুষ্ঠু হবে, সেই পরীক্ষাও বটে।

“এগুলো আরও এক গভীর প্রশ্নের জবাব দেবে। সেটা হলো, যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী এবং তারা আসলে কী হতে চায়, যার পরিধি হয়ত ট্রাম্পের বাইরেও বিস্তৃত।”