সোমবার ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, মাঘ ৬ ১৪৩২, ৩০ রজব ১৪৪৭

জাতীয়

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বেড়ে ‘দ্বিগুণ’ হচ্ছে, বাস্তবায়ন কবে?

 প্রকাশিত: ১০:৪০, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বেড়ে ‘দ্বিগুণ’ হচ্ছে, বাস্তবায়ন কবে?

সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোতে মূল বেতন বাড়িয়ে দ্বিগুণ করে প্রতিবেদন দাখিল করতে যাচ্ছে জাতীয় বেতন কমিশন।

তাদের সুপারিশ ঠিক থাকলে সর্বনিম্ন মূল বেতন হবে ২০ হাজার টাকা। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ে মূল ব্তেন ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

এর বাইরে এখনকার মতই অন্যান্য ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা প্রযোজ্য হবে। তাতে ঢাকায় সর্বনিম্ন, অর্থাৎ ২০তম গ্রেডের একজন কর্মীর বেতন দাঁড়াবে প্রায় ৪২ হাজার টাকা।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয় বাজেটে অর্থের সংস্থান রেখেছে। সংশোধিত বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর তথ্য মিলেছে।

পে কমিশনের প্রধান, সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খান রোববার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা ২১ জানুয়ারি (বুধবার) প্রধান উপদেষ্টার সময় পেয়েছি। সেদিন আমরা প্রতিবেদন তার হাতে তুলে দেব। এতটুকু বলতে পারি, খুব ভালো কিছু হচ্ছে। খুব ভালো প্রস্তাব আমরা দিচ্ছি।”

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো করতে গত ২৪ জুলাই পে কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। জাকির আহমেদ খানকে প্রধান করে গঠিত এই পে কমিশনকে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।

কয়েক দফা সময় বাড়ানোর পর এখন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে পে কমিশন, যদিও বর্তমান সরকার এ কাজ শেষ করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় আছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে জীবযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বেতন কাঠামো ঘোষণার দাবি বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনায় ছিল। ২০২৪ সালের অগাস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার দাবি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

অনেকেই আশা করছিলেন, জুন মাসে ঘোষিত নতুন অর্থবছরের বাজেটে এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসতে পারে। তবে

শেষ পর্যন্ত মহার্ঘ ভাতার বদলে বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, যা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে।

বর্তমানে ২০১৫ সালের পে স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি বেতন গ্রেড রয়েছে। দেশের প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এ পে স্কেল অনুসারে বেতন-ভাতা পান।

এই কাঠামোতে সর্বনিম্ন, অর্থাৎ ২০ তম গ্রেডে মূল বেতন হয় মাসে ৮ হাজার ২৫০ টাকা। বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা পদে যোগ দেওয়া নবম গ্রেডের একজন চাকরিজীবীর মূল বেতন হয় মাসে ২২ হাজার টাকা।

আর সর্বোচ্চ ধাপে একজন সচিব মাসে ৭৮ হাজার টাকা, জ্যেষ্ঠ সচিব ৮২ হাজার টাকা এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ৮৬ হাজার টাকা মূল বেতন হিসেবে পান।

মূল বেতনের সঙ্গে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত বাবদ আলাদা ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পান সরকারি কর্মচারীরা।

এছাড়া বছরে দুটি উৎসব ভাতার পাশাপাশি বাংলা নববর্ষে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাড়তি একটি ভাতা পান তারা।

গ্রেড কমছে না, বাড়ছে বেতন

কমিশনের একজন সদস্য বলেন, “আমরা বর্তমানের মতই গ্রেড রাখছি। তবে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের মধ্যে অনুপাত কমানোর প্রস্তাব করছি। এখন ১:৯ হলেও নতুন বেতন-কাঠামোতে ১:৮ করছি।”

সবক্ষেত্রেই বর্তমান বেতনকাঠামোর তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

“আমরা সব সেক্টরের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছি। বিস্তর আলোচনা করে বর্তমান মূল্যস্ফীতির বিবেচনা করে এটা করা হয়েছে। একজন ২০ গ্রেডের কর্মী যদি ঢাকায় চাকরি করেন, তাহলে মূল বেতনের ৬৫ শতাংশ বাসা ভাড়া পান। সে হিসেবে তার অন্যান্য সুযোগ মিলে এটি দাঁড়াবে প্রায় ৪২ হাজার টাকা। বর্তমানে পান প্রায় ১৭ হাজার টাকা।”

বরাদ্দ বাড়ল

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়ে একমাত্র বাজেট দিতে এসে সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস করে। পরে অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে ২৪ ডিসেম্বর বাজেটের আকার দুই হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত বাজেট অনুমোদন করে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৮৪ হাজার ৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা বেশি।

সংশোধিত বাজেটে এসে এ খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে এক লাখ ছয় হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা করা হয়েছে।

এর ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৩০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ কমালেও সংশোধিত বাজেটের আকার কমেছে কেবল ২ হাজার টাকা।

নতুন বেতন কাঠামো আংশিক বা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে তার অর্থের সংস্থান এবং ইতোমধ্যে বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর যেসব ঘোষণা এসেছে তার ব্যয়ও এই বরাদ্দের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে তথ্য দিয়েছেন অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা।

তার ভাষ্য, সাধারণত বেতন কাঠামোতে ব্যয়ের ক্ষেত্রে মূল বেতন ও ভাতা আলাদা কোডে সংস্থান করা হয়। সে হিসাব করে মূল বেতন বা ভাতার যে কোনো একটি জানুয়ারি থেকে বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরে এ অর্থের সংস্থান দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাকি অংশ পরবর্তী সরকারের বিবেচনাধীন থাকবে।

বাস্তবায়নে শঙ্কা

পে কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের এ খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণের বেশি করতে হবে। কিন্তু সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়ছে না, সুদের ব্যয় সামাল দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এসব আমলে নিয়ে সরকার সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অস্বাভাবিক মাত্রায় বাড়িয়েছে।

গত অর্থবছরে আন্দোলন ও সরকারের পালাবদলে অস্থিরতার মধ্যে রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি দেখা গিয়েছিল। সে সময়ের হিসাবকে ভিত্তি ধরায় চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের গতি বেড়েছে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

এমন প্রেক্ষাপটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে আদায় করা হবে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। আর কর বহির্ভূত রাজস্ব আহরিত হবে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত সূত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা আহরিত হবে বলে সরকার আশা করছে।

এনবিআর প্রবৃদ্ধি দেখালেও উল্টো চিত্রও আছে। লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে হিসাব করলে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১৯ কোটি টাকা।

এ সময় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, কিন্তু আদায় হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা।

মাঝপথে এসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘাটতি বাড়তে থাকবে। অর্থবছরের শেষ দিকে এসে মাসিক লক্ষ্যও বেড়ে যাবে। ফলে আদায় বাড়লেও পরিসংখ্যানে ঘাটতি তখন বেশি দেখা যাবে।

সে হিসেবে চলতি অর্থবছরেও এক লাখ কোটি টাকার বেশি ঘাটতি দেখা যেতে পারে কর্মকর্তারা মনে করছেন।

সব দিক বিবেচনায় পে কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তাবায়ন করা যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কার সুর মিলেছে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের কথায়।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, পে-কমিশন ‘সাবস্টেনটিভ’ কাজ করছে। তবে বাস্তবায়নের ব্যাপারটা ‘অন্য জিনিস’।