গ্রিনল্যান্ড নিতে আগেও চেষ্টা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, এবার পারবে?
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তার দেশ থেকে অপহরণ করার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে তার আকাঙ্ক্ষার কথা জোরের সঙ্গে বলে যাচ্ছেন, আরেকটি সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা সামনে আনছেন, যা ইউরোপজুড়ে ভয় ছড়াচ্ছে, বিশ্বজুড়ে নিন্দাও কুড়াচ্ছে।
এখন না হয় ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রসারণবাদ ভিন্ন মাত্রা ধারণ করেছে, তাই বলে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের এ ধারণা মোটেও ‘ইউনিক’ নয়। স্বশাসিত এ ডেনিশ অঞ্চলের প্রতি ট্রাম্পের আগেও আরও অনেক মার্কিন কর্মকর্তার চোখ পড়েছিল, কিন্তু তাদের কেউই সফল হতে পারেননি।
সিএনএন বলছে, ৮ লাখ ৩৬ হাজার বর্গমাইলের বিশাল দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব মারাত্মক। এটি যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপের মাঝে অবস্থিত, আর্কটিককে আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা সামুদ্রিক পথ, যা গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে অবস্থিত তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুও এটি।
দ্বীপটি তেল, গ্যাস ও বিরল খনিজসহ প্রাকৃতিক সম্পদেও ভরপুর, যার সিংহভাগ এখনও খনন হয়নি। সব মিলিয়ে ৫৭ হাজার জনসংখ্যার গ্রিনল্যান্ডে যে কারওই লোলুপ দৃষ্টি পড়ার কথা।
দ্বীপটিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ শুরু উনিশ শতকে। ১৮৬৭ সালে রাশিয়ার কাছে আলাস্কা কেনার রেশ থাকতে থাকতেই সেসময়কার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম এইচ সিউয়ার্ড ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ড কিনে নেওয়ার পরিকল্পনা সামনে আনেন।
শেষ পর্যন্ত ওই পরিকল্পনা হালে পানি না পেলেও পরের দশকগুলোতেও যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার বিশ্বের সর্ববৃহৎ এ দ্বীপটিকে নিজেদের ঝোলায় ভরার উদ্যোগ নিয়েছিল, এমনকী একবার তারা গ্রিনল্যান্ডের জন্য ফিলিপিন্সে তাদের নিয়ন্ত্রাণাধীন অঞ্চল ডেনমার্কের সঙ্গে অদল-বদলের সম্ভাবনা নিয়েও আলাপ তুলেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে, যখন যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষার ভার নিয়েছিল, সেসময় একবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান গ্রিনল্যান্ড পেতে ডেনমার্ককে ১০ কোটি ডলার স্বর্ণ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ডেনমার্ক সে প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছিল।
১৮৬৭: আলাস্কা ক্রয়, যুক্তরাষ্ট্রের আর্কটিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা
গৃহযুদ্ধের পর তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনের প্রশাসন প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন প্রভাব বাড়াতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
১৮৬৭ সালে মাত্র ৭২ লাখ ডলারে রাশিয়ার কাছ থেকে আলাস্কা কিনে নেওয়ার পর জনসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিউয়ার্ড আর্কটিকের অন্যান্য অঞ্চলগুলোর দিকে নজর দিতে শুরু করেন।
সিউয়ার্ডের অনুরোধে সাবেক অর্থমন্ত্রী ও কট্টর সম্প্রসারণবাদী রবার্ড জে ওয়াকারও যুক্তরাষ্ট্রকে তার অধীনে নেওয়া এলাকাগুলোর মধ্যে আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডকেও যুক্ত করার সুপারিশ করেছিলেন বলে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে। ওয়াকার আলাস্কা চুক্তি সম্পাদনে সহায়তা করা ‘বিশেষ করে পরের দ্বীপটির’ ব্যাপারে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
“এর কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক,” প্রতিবেদনে গ্রিনল্যান্ডের বিস্তৃর্ণ ভূমি ও বিপুল খনিজ সম্পদের দিকে ইঙ্গিত করে লিখেছিলেন তিনি।
গ্রিনল্যান্ডের দখল পেলে তা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বিশ্বের বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেবে’ বলেও যুক্তি দিয়েছিলেন তিনি।
তবে এতসবের পরও সেসময় যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটি পেতে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব দেয়নি।
১৯১০: একটি ‘অত্যন্ত দুঃসাহসী প্রস্তাব’
১৯১০ সালে ডেনমার্কে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত মরিস ফ্রান্সিস এগান তখনকার সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটি ‘অত্যন্ত দুঃসাহসী প্রস্তাবের’ কথা লেখেন। তার প্রস্তাব ছিল যুক্তরাষ্ট্র যেন তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ফিলিপিন্সের দ্বীপ মিন্দানাও ডেনমার্ককে দিয়ে তাদের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ নিয়ে নেয়।
কিন্তু তার ওই প্রস্তাব বেশিদূর আগায়নি; দৃশ্যপটে এগিয়ে আসছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ তখন অন্য কোথাও।
এর কয়েক বছর পর যুক্তরাষ্ট্র ২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বিনিময়ে ডেনমার্কের কাছ থেকে ডেনিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিনে নেয়, যেন সেটি জার্মানির নিয়ন্ত্রণে চলে না যায়। ওই দ্বীপটি এখন ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ড নামে পরিচিত।
১৯৪৬: ১০ কোটি ডলারের প্রস্তাব
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, জার্মানি ডেনমার্কে আক্রমণ চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিয়ে নেয় এবং দ্বীপটিতে সামরিক উপস্থিতি গড়ে।
এরপর ১৯৪৬ সালে, অনেক দশকের রাখঢাকের পর, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের প্রশাসন ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়।
সেসময় এই প্রস্তাবের খবর গোপন রাখা হয়েছিল। ১৯৯১ সালে একটি ডেনিশ খবরের কাগজ এটি প্রথম জনসমক্ষে আনে, তাও এ সংক্রান্ত নথি প্রকাশিত হওয়ার দুই দশক পর।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, ১৯৪৬ সালের এপ্রিলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জন হিকারসন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের পরিকল্পনা ও কৌশল প্রণয়ন কমিটির এক বৈঠকে অংশ নেন, সেখানে ‘কার্যত প্রায় সব সদস্যই’ গ্রিনল্যান্ড কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের চেষ্টার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল বলে পরে এক নথিতে বলেন।
“কমিটির ইঙ্গিত ছিল অর্থ যথেষ্ট আছে, তাছাড়া গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মূল্যহীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া অপরিহার্য,” এক নথিতে হিকারসন এমনটাই বলেছেন বলে জানিয়েছে তারা।
স্নায়ু যুদ্ধ শুরু হচ্ছিল, এবং সেসময় যুক্তরাষ্ট্রও তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ডকে অপরিহার্য মনে করছিল।
হিকারসন জানান, তিনি কমিটিকে বলেছিলেন ডেনমার্ক এটি বিক্রি করতে চাইবে এ ব্যাপারে তার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
পরে মে মাসের আরেকটি নথি বলছে, সেসময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উত্তর ইউরোপ বিভাগের সহকারী প্রধান উইলিয়াম সি ট্রিম্বল গ্রিনল্যান্ড কিনতে যুক্তরাষ্ট্রকে ১০ কোটি ডলারের স্বর্ণ দেওয়ার প্রস্তাব দিতে সুপারিশ করেন।
গ্রিনল্যান্ড কিনলে সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ‘মূল্যবান ঘাঁটি’ বানানোর সুযোগ পাবে, কোনো হামলার ঘটনায় সেখান থেকে আকাশপথে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, বলেছিলেন তিনি।
মার্কিন কর্মকর্তারা তখন আলাস্কার তেলসমৃদ্ধ ভূমির সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের কিছু অংশ অদল-বদলের প্রস্তাব দেওয়া যায় কিনা সে কথাও ভাবছিলেন। যদিও ট্রিম্বল বলেছিলেন, তার ধারণা এই ধরনের অদল-বদলে ডেনিশদের রাজি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম।
এরপর তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বায়ার্নস ১৯৪৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর নিউ ইয়র্কে সফররত ডেনিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী গুস্তভ রাসমুসেনের কাছে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন বলে কোপেনহেগেনে মার্কিন মিশনে পাঠানো এক টেলিগ্রামে বায়ার্নসই জানিয়েছিলেন বলে মার্কিন এক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে।
ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ড বিক্রি করতে রাজি হয়নি। তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বীপটিতে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ ও পরিচালনা করার অনুমতি দেয়। সেই সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে কয়েকটি ঘাঁটি বানালেও পরে একটি বাদে বাকি সব বন্ধ করে দেয়। যেটি চালু আছে সেটি হল- পিটফুক মহাকাশ ঘাঁটি, যেটি আগে পরিচিত ছিল থুল বিমান ঘাঁটি হিসেবে।
১৯৭৯ সালে এক গণভোটে গ্রিনল্যান্ডবাসী দ্বীপটিতে নিজেদের শাসন চালানোর অধিকার অর্জন করে, এর দরুন তারা ডেনমার্কে থেকেও বিস্তৃত স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ লাভ করে।
এল ট্রাম্প যুগ, তিনি কি পারবেন?
গ্রিনল্যান্ডকে নিজেদের মানচিত্রভুক্ত করতে ওয়াশিংটনের আগেকার চেষ্টাগুলো সফলতার মুখ না দেখলেও ট্রাম্প প্রশাসন ওই গেরো কাটাতে চাইছে। সেজন্য প্রয়োজনে ‘সামরিক হস্তক্ষেপের’ সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না তারা।
ট্রাম্প প্রথম প্রকাশ্যে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার কথা বলেন, তার প্রেসিডেন্সির প্রথম মেয়াদে, ২০১৯ সালে। সেসময় তিনি গ্রিনল্যান্ড কেনাকে ‘বড় রিয়েল এস্টেট চুক্তির’ সঙ্গে তুলনা দিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড ও ডেনিশ কর্তৃপক্ষ ‘দ্বীপটি বিক্রির জন্য নয়’ বলে শক্ত অবস্থান নিলে দ্রুতই ওই ভাবনা উবে যায়।
২০২৪ সালে নির্বাচনে জেতার কিছু সময় পর ট্রাম্প ফের তার প্রথম মেয়াদের আকাঙ্ক্ষা পুনর্ব্যক্ত করে গ্রিনল্যান্ড কেনার কথা তোলেন, এবারও তা প্রত্যাখ্যাত হয়। বছরখানেক আগে ফ্লোরিডায় বিলাসবহুল মার-আ-লগোতে এক বিস্তৃত সংবাদ সম্মেলনে তিনি গ্রিনল্যান্ড আকাঙ্ক্ষা পূরণে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাও সামনে আনেন। যেটি সাম্প্রতিক সময়ে হোয়াইট হাউসের কাছ থেকে প্রায়ই শোনা যাচ্ছে।
গত বছরের শুরুর দিকে মার্কিন কংগ্রেসের এক যৌথ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে তার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেন, “আমার মনে হয়, আমরা এটি পাবো। একভাবে, বা অন্য কোনো ভাবে, আমরা এটি পেতে যাচ্ছি।”
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিটের কণ্ঠে সেই একই ভাষ্যই প্রতিফলিত হয়েছে।
তিনি বলেছেন, ট্রাম্প এটা স্পষ্ট করেছেন যে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অগ্রাধিকার এবং আর্কটিক অঞ্চলে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিদের ঠেকাতে এই অধিগ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
“প্রেসিডেন্ট এবং তার দল গুরুত্বপূর্ণ এই পররাষ্ট্র নীতির লক্ষ্য অর্জনে নানামাত্রিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছেন, এবং অবশ্যই মার্কিন সেনাবাহিনীকে কাজে লাগানোর মতো বিকল্প তো কমান্ডার ইন চিফের কাছে থাকেই,” বলেছেন তিনি।