বরিশাল মেডিকেলে ইনজেকশনের পর দুই রোগীর মৃত্যু, ২ নার্স বরখাস্ত
বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অপারেশনের আগে ‘ভুল করে’ ইনজেকশন দেওয়ার পর পরই দুই রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় হাসপাতালের দুজন নার্সকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে কর্তৃপক্ষ।
রোববার সকালে হাসপাতালের চতুর্থ তলার নাক-কান-গলা বিভাগের নারী ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে বলে পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর জানান।
তিনি বলেন, এ ছাড়া এ ঘটনায় এরই মধ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মৃতরা হলেন- বরিশাল সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের শার্শী গ্রামের বাসিন্দা বাবুল হাওলাদারের স্ত্রী হেলেনা বেগম (৪৮) এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর ডাবলুগঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা মন্নান তালুকদারের স্ত্রী শেফালী বেগম (৬০)।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৫ রমজান ভর্তি হন হেলেনা বেগম এবং ১৮ রমজান ভর্তি হন শেফালি বেগম। হেলেনা বেগম থাইরয়েড রোগে ভুগছিলেন এবং শেফলী বেগম মুখের ভেতর টিউমার অপসারণ করার জন্য ভর্তি হন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সার্জারি ওয়ার্ডের রোগীর স্বজন মরিয়ম বেগম বলেন, “সকাল ৮টায় শেফালী বেগমকে ওটিতে নেওয়ার কথা ছিল। সকালে নার্স এসে শেফালী বেগমকে আগে ইনজেকশন দিয়েছেন। নার্সরা জানিয়েছেন, তিনটি ইনজেকশন দিয়েছেন। ইনজেকশন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগী সাথে মারা গেছেন।
“তখন রোগীর স্বজনরা নার্সকে বলেন, কী ইনজেকশন দিয়েছেন যে, আমার রোগী অসুস্থ হয়ে পড়ল। তখন নার্স বলেন, ডাক্তার যেটা বলছে ওটাই আমরা দিয়েছি। আপনারা হাতে-পায়ে তেল মালিশ করেন। বেশি কথা বলবেন না।”
মরিয়ম বেগম বলেন, “সেখানে তর্ক-বিতর্ক করে আমার পাশের বেডের রোগীর (হেলেনা) কাছে আসেন। উনি বসা ছিলেন। দিব্যি সুস্থ মানুষ, প্রেশার ছিল না। ডায়াবেটিকস ছিল না। উনার শুধু থাইরয়েডের সমস্যা। বসা অবস্থায় ইনজেকশন দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে উনি ঢলে পড়েছেন। মুখ দিয়ে ফেনা বের হয়েছে। প্রশ্রাব করে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে মারা গেছেন।”
মৃত হেলেনা বেগমের ছেলে ইব্রাহিম বলেন, “নার্স ইনজেকশন পুশ করার পরই আমার সুস্থ মা অসুস্থ হয়ে যায় এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বিষয়টি আমরা হাসপাতাল প্রশাসনকে জানিয়েছি।”
তিনি বলেন, “আমরা কোনো মামলায় যাচ্ছি না। কারণ, একে তো আমরা মা হারিয়েছি, তার উপর মামলা নিয়ে হয়রানি হতে চাই না।”
অপরদিকে শেফালি বেগমের মেয়ে খাদিজা বেগম বলেন, “আমার মা সুস্থ ছিলেন। কিন্তু সকালে নার্স এসে কয়েকটা ইনজেকশন দেওয়ার পরই অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিষয়টি নার্সদের জানানো হলেও তারা কোনো ভ্রুক্ষেপ করেননি। মাকে সুস্থ করার জন্য কোনো উদ্যোগ নেননি।
“চোখের সামনে সুস্থ মা অসুস্থ হয়ে মুহূর্তেই মারা গেল। আর মায়ের মৃত্যুর পরে নার্সদের টনক নড়ে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালনকারী নার্স হেলেন অধিকারী বলেন, তিনি কোনো ইনজেকশন ভাঙেননি, ভেঙেছেন মলিনা হালদার। তাই তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না। তিনি শুধু ইনজেকশন পুশ করেছেন দুজন রোগীর শরীরে।
তবে ওই দুই রোগীর সঙ্গে যা ঘটেছে তা দুঃখজনক এবং তাদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে বলে জানান তিনি।
নার্স মলিনা হালদার বলেন, “চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী অপারেশন থিয়েটারে যাওয়ার আগে যেসব ইনজেকশন দেওয়ার কথা তাই দেওয়া হয়েছে। পরে রোগী দুজনের অবস্থা খারাপ হলে চিকিৎসককে মোবাইলে বিষয়টি জানাই। তিনি ওইসময় যে ধরনের ইনজেকশন দিতে বলেন; তাই দিয়েছি।”
তিনি বলেন, “কোনো রোগীর মৃত্যু হোক, সেটা আমরা চাই না। ২৬ বছরে কোনো ভুল করিনি, এবার এমন হল কীভাবে তা বুঝতে পারছি না।”
বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্সিং তত্ত্বাবধায়ক খাদিজা বেগম বলেন, “সকালে হাসপাতালে এসেই বিষয়টি শুনতে পেরেছি। কীভাবে কী হয়েছে তা এখনও সঠিকভাবে জানতে পারিনি। একই ওয়ার্ডে দুজন রোগীর মৃত্যু অবশ্যই দায়িত্ব অবহেলা। এ ঘটনায় আমাদের অভিভাবক হাসপাতাল পরিচালক যে ব্যবস্থা নেবেন তাতে আমাদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে এবং সার্বিক সহযোগিতাও করব।”
হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, “আজ ওই দুই রোগীর অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। এক্ষেত্রে কিছু ওষুধ রয়েছে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার আগে দিতে হয় এবং কিছু ওষুধ অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার পর দিতে হয়।
“অ্যানেসথেটিক ড্রাগ দেওয়ার পরে রোগীর এমন কিছু পরিবর্তন ঘটে যা মেশিনের মাধ্যমে কাজ করাতে হয়। কিন্তু ওই ওষুধ সেবিকারা অপারেশন থিয়েটারে না নিয়ে আগে ওয়ার্ডে বসে দিয়েছেন। ফলে কিছু সময় পরে রোগীরা মারা গেছেন। এটি অবশ্যই পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে দায়িত্ব অবহেলা এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।”
তিনি বলেন, “দায়িত্বে অবহেলা, খামখেয়ালিপনা তো অবশ্যই আছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানিয়েছি। সেই সঙ্গে রোগীর স্বজনরা ইচ্ছে করলে মামলাও দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে স্বজনদের সহযোগিতা করা হবে। আর ঘটনাটি ভুল হোক বা যাই হোক, শক্তভাবে দেখা না হলে ভবিষ্যতে আবার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।”
পরিচালক বলেন, “এরই মধ্যে দুটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দুই নার্সকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। রোগীর স্বজনরা মামলা না করলেও বিভাগীয় মামলা করে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”