যুদ্ধের দিনে ইরানের হাসপাতাগুলো যেভাবে চলছে
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরানের রক্তদান কেন্দ্রগুলো নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। এই সময় কেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে, লবি ও রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। যাদের মধ্যে আছে শিক্ষার্থী, বয়স্ক মানুষ, বিভিন্ন পেশাজীবী ও তরুণ-তরুণীরা। তারা সবাই রক্ত দান করতে চায়।
উত্তর তেহরানের একজন রক্তদাতা সাইয়েদা নাজাফি। তিনি বলেন, ‘আমি মানুষের চেহারায় প্রকৃত উদ্বেগ দেখেছি। আমি সূচের ভয় পাচ্ছি না, আমি ভয় পাচ্ছি মানুষ হয়ত হাসপাতালে পর্যাপ্ত রক্ত পাবে না।’ ইরানি গণমাধ্যমে প্রচারিত একটি বিবৃতিতে সাড়া দিয়ে তিনি এখানে এসেছেন, যাতে মানুষকে ক্রমবর্ধমান রক্তের চাহিদা পূরণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সাইয়েদা নাজাফি অন্য দাতাদের সঙ্গে রক্ত দানের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সেখানে তাদের ভেতর এই ঘুরে ফিরে একটি কথাই বার বার উচ্চারিত হচ্ছিল—‘এই সময় রক্ত দান করার অর্থ হলো একটি প্রাণ রক্ষা করা। সে আপনার প্রতিবেশী বা আত্মীয়ও হতে পারেন।’
হামলা শুরু হওয়ার প্রাথমিক দিনগুলোতে ইরানে রক্তের অভাব ছিল না। স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে চাপ থাকলেও কিছুটা প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু হামলা তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব হিসাব পাল্টে যেতে থাকে। হাসপাতালগুলো যতটা রক্ত সংরক্ষণ করতে পারে তার অনেক বেশি রোগী প্রতিনিয়ত হাজির হচ্ছে। মারাত্মক আহত ও পুড়ে যাওয়া ব্যক্তিরা সেখানে উপস্থিত হচ্ছে, যাদের নিয়মিত রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু আঘাত সরাসরি স্বাস্থ্য অবকাঠামোগুলোকে আঘাত করছে। স্বাস্থ্য সেবার কাজে ব্যবহূত পরিবহন, ব্লাড ব্যাংকগুলোও আক্রান্ত হচ্ছে। যা পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করছে। এছাড়াও পূর্ব থেকে হাসপাতালে ভর্তি জটিল রোগে আক্রান্তদের রক্তের চাহিদা তো আছেই।
তেহরান হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ফিজিশিয়ান ড. হাসসান সাদেগি গত সপ্তাহের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এক দিনের কথা, আমাদের এখানে এমন তিনজন গুরুতর রোগী হাজির হন ২৪ ঘণ্টায় যাদের প্রত্যেকের প্রায় ছয় ব্যাগ করে রোগীর প্রয়োজন হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা খুবই উদ্বেগের কথা। যদিও রক্তদান কেন্দ্রগুলো থেকে নিয়মিত তথ্য সরবারহ করা হচ্ছিল, তবুও পরিস্থিতি সামাল দিতে আমার হিমশিম খেতে হচ্ছিল।
পশ্চিম তেহরানে একটি রক্ত দান কেন্দ্র পরিচালনা করেন ডা. লায়লা তাবরিজি। তিনি জানান, মানুষকে আহ্বান জানানোর পর থেকে মানুষের ভিড় বাড়ছেই। একই সঙ্গে সপ্তাহের প্রথম দিন থেকে এখন পর্যন্ত রক্তের চাহিদা কমেনি। বিশেষত বিরল গ্রুপের রক্তগুলো। আমরা হাসপাতাল ও রক্ত দান কেন্দ্রগুলোর ভেতর সমন্বয় করে কাজ করছি। হাসপাতালগুলো আমাদের চাহিদা জানাচ্ছে এবং আমরা সেগুলো দাতাদের জানিয়ে দিচ্ছি। যুদ্ধের সময় হাসপাতাগুলোতে রক্তের যে সংকট দেখা দিয়েছে আমরাই প্রথম তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছি।
আরাশ কারিমি কোম শহর থেকে গাড়ি চালিয়ে একটি দানকেন্দ্রে লাইনে দাঁড়াতে আসেন। তিনি বিমান হামলার প্রথম দিনগুলোতে শহরের হাসপাতালগুলোয় তীব্র রক্ত সংকটের খবর শুনেছিলেন। অপেক্ষা করার সময় তিনি লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যদের সঙ্গে কথা বলেন, যাদের অনেকেই আগে সাধারণ দান কর্মসূচিতেও রক্ত দিয়েছেন। তাদের একজন কাছের একটি হাসপাতালের একজন চিকিত্সকের কাছ থেকে শুনেছিলেন যে এবি-নেগেটিভ রক্তের তীব্র সংকট রয়েছে, ফলে কিছু জরুরি অস্ত্রোপচারও করা যাচ্ছে না।
আরাশ বলেন, ‘যখন আমরা একে একে বসে রক্ত দিলাম, তখন পরিবেশে এক ধরনের উদ্বেগ ছিল, কিন্তু একই সঙ্গে ছিল অন্যদের সাহায্য করার আন্তরিক ইচ্ছাও ছিল। কারণ প্রতিটি ফোঁটা রক্তই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা হাসপাতালের চাপ কিছুটা হলেও কমাতে পারছি।
নাসরিন মির্জা তেহরানের একটি কেন্দ্রে আসেন কয়েকদিন ধরে জরুরি বিভাগগুলোতে অতিরিক্ত চাপের খবর শোনার পর। লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি দেখলেন, ছাত্র-ছাত্রী, অফিসকর্মী এবং বয়স্ক নারীরাও সেখানে আছেন। তার পাশে থাকা এক স্বেচ্ছাসেবক বলছিলেন, ‘একটি রক্তদানও অপারেশন থিয়েটারের শেষ ফলাফল বদলে দিতে পারে।’ কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার সময়ও নাসরিন সেই কথাগুলো ভাবছিলেন।
ফাতিমা কাশফি কয়েক বছর ধরে তেহরানের একটি রক্ত সঞ্চালন কেন্দ্রে কাজ করছেন। সংঘাত বাড়ার পর থেকে তিনি যা দেখছেন, তা আগে কখনো দেখেননি। তিনি দেখেন, দাতারা পরীক্ষা শেষ করে চলে যান এবং আবার সময় হলে ফিরে আসেন।
এই সংকট শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নয়। মাশহাদ, ইসফাহান, তাবরিজ ও কেরমানশাহ শহরেও দানকেন্দ্রগুলোতে একই ধরনের চাপ দেখা গেছে, যা পুরো যুদ্ধজুড়েই অব্যাহত রয়েছে। কিছু শহরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতালগুলোর দিকে দাতাদের পাঠাতে বিশেষ প্রচার অভিযানও চালানো হয়েছে। সব জায়গায় চ্যালেঞ্জ একই আহতের সংখ্যা বাড়ছে, বিরল রক্তের গ্রুপ দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর প্রয়োজন ও প্রাপ্যতার মধ্যকার ব্যবধান কমছে না।
দ্য নিউ আরব অবলম্বনে