রোববার ১৫ মার্চ ২০২৬, চৈত্র ১ ১৪৩২, ২৬ রমজান ১৪৪৭

ব্রেকিং

সংসদের সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে ‘লুটপাটের’ অভিযোগ শাহজাহান চৌধুরীর রাজশাহীতে জমেছে রেশমি পোশাকের বিকিকিনি, দাম নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া মধ্যরাতের পর থেকে ইসরায়েলে ইরানের পঞ্চম ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, আহত ২ ইস্পাহানে কারখানায় মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত ১৫ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ: সংঘাতের বলি হচ্ছে প্রকৃতি ও পরিবেশ পারমাণবিক রকেট লঞ্চারের পরীক্ষা উত্তর কোরিয়ার ইরানি বিপ্লবী গার্ডের ঘোষণা: নেতানিয়াহুকে খুঁজে হত্যা করবে। ঈদের আগে শেষ বৈঠকে সংসদ দেশে প্রথমবারের মতো ট্রেনে স্টারলিংকের ইন্টারনেট চালু চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল সরবরাহের ঘোষণা সিরিজ জয়ের লড়াইয়ে বাংলাদেশ-পাকিস্তান খার্কে আরও হামলার হুমকি ট্রাম্পের, মিত্রদের হরমুজে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান

ইসলাম

ইস্তাম্বুলের ইয়াভুজ সুলতান সেলিম মসজিদ

 প্রকাশিত: ১৫:৫৭, ১৫ মার্চ ২০২৬

ইস্তাম্বুলের ইয়াভুজ সুলতান সেলিম মসজিদ

ইস্তাম্বুলের ফাতিহ জেলায় গোল্ডেন হর্ন উপসাগরের দিকে মুখ করে পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক স্থাপনা-ইয়াভুজ সুলতান সেলিম মসজিদ। অনন্য অবস্থান, সরল অথচ সুষম স্থাপত্যরীতি এবং গভীর ঐতিহাসিক তাত্পর্যের কারণে এটি ধ্রুপদী অটোমান মসজিদ স্থাপত্যের প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। অটোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম শক্তিশালী শাসক সুলতান সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট তাঁর পিতা প্রথম সেলিম (ইয়াভুজ সুলতান সেলিম)-এর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন। ষোড়শ শতাব্দীর শুরুর দিকে নির্মিত এই স্থাপনাটি দ্রুতই ইস্তাম্বুলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও স্থাপত্যিক নিদর্শনে পরিণত হয়। ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত সাতটি পাহাড়ের একটির উপর অবস্থিত হওয়ায় মসজিদটি শহরের আকাশরেখায় বিশেষভাবে দৃশ্যমান। এখান থেকে গোল্ডেন হর্নের বিস্তৃত দৃশ্য চোখে পড়ে, যা মসজিদটির নান্দনিক মর্যাদাকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেছে। মসজিদটি এমন একটি স্থানে নির্মিত হয়েছে যা আগে ‘আসপার সিস্টার্ন’ নামে পরিচিত একটি প্রাচীন জলাধারের অবস্থান ছিল। পরে এই জলাধারটি ‘ইয়াভুজ সেলিম সিস্টার্ন’ নামে পরিচিতি পায়। জনশ্রুতি রয়েছে যে এই স্থানটি স্বয়ং সুলতান সেলিম প্রথমই নির্বাচন করেছিলেন।

ইয়াভুজ সুলতান সেলিম মসজিদ প্রাথমিক অটোমান স্থাপত্যধারা থেকে ধ্রুপদী অটোমান স্থাপত্যে উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। মসজিদটিতে ‘তাবহানে’ নামে পরিচিত কাঠামো রয়েছে-যা মূলত অতিথিদের জন্য নির্মিত কক্ষ। প্রাথমিক অটোমান মসজিদ স্থাপত্যে এ ধরনের কক্ষ খুবই সাধারণ ছিল। উদাহরণ হিসেবে বায়েজিদ মসজিদেও এ ধরনের কাঠামো দেখা যায়। প্রথমদিকে এই তাবহানে কক্ষগুলো মসজিদের মূল স্থাপনার সঙ্গে একীভূত থাকলেও পরবর্তীকালে মহান স্থপতি মিমার সিনান ধ্রুপদী অটোমান স্থাপত্যে এগুলোকে পৃথক কাঠামো হিসেবে বিকশিত করেন। এই পরিবর্তনের সূচনা হয় শাহজাদে মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমে। মসজিদটির স্থাপত্য বিন্যাস তুলনামূলকভাবে সরল ও সংযত। এখানে বাহুল্য অলংকরণের চেয়ে কার্যকারিতা এবং ভারসাম্যের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মসজিদের প্রধান নামাজঘর একটি বড় কেন্দ্রীয় কক্ষ নিয়ে গঠিত, যার উপর স্থাপিত রয়েছে বিশাল একটি গম্বুজ। এই গম্বুজটি দেয়ালের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি বর্গাকার কাঠামোর ওপর স্থাপন করা হয়েছে। ফলে অভ্যন্তরে সৃষ্টি হয়েছে প্রশস্ত ও উন্মুক্ত একটি পরিবেশ।

ইসলামী স্থাপত্যে গম্বুজকে মুসলিমদের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তী সময়ে শাহজাদে, সুলেমানিয়ে এবং সেলিমিয়ে মসজিদের মতো স্থাপনায় চারটি বিশাল স্তম্ভের ওপর গম্বুজ স্থাপনের রীতি দেখা যায়। কিন্তু ইয়াভুজ সুলতান সেলিম মসজিদে গম্বুজটি দেয়ালের উপর নির্ভর করে নির্মিত হয়েছে, যা এটিকে প্রাথমিক ধ্রুপদী অটোমান স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণে পরিণত করেছে। মসজিদের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো জানালার উপরের অংশে ব্যবহূত টাইলসের অলংকরণ। এগুলো তৈরি করা হয়েছে ‘কুয়েরদা সেকা’ নামে পরিচিত একটি বিশেষ কৌশলে, যার অর্থ ‘শুষ্ক কর্ড’। এই অলংকরণ কৌশলটি খুব অল্প সময়ের জন্য ব্যবহূত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সুলতান সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের আমলে নির্মিত মসজিদগুলোতে ইজনিক শৈলী এবং তথাকথিত গোল্ডেন হর্ন কৌশল বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যেখানে নীল ও সাদা টাইলসের ব্যবহার দেখা যায়। 

মসজিদ কমপেক্সের ভেতরে অবস্থিত রয়েছে সুলতান প্রথম সেলিম এবং তাঁর স্ত্রী হাফসা সুলতান-এর সমাধি। এছাড়া এখানে কয়েকজন অটোমান রাজপুত্রের কবরও রয়েছে, যার মধ্যে সুলতান সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের পুত্ররাও অন্তর্ভুক্ত।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে অটোমান সুলতান আব্দুল মেসিদ তাঁর প্রিয় পূর্বপুরুষ সেলিম প্রথমের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এই কমপ্লেক্সেই নিজের সমাধি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। প্রথমে তিনি সেলিম প্রথমের সমাধির চেয়েও বড় একটি সমাধি নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তা ভেঙে ছোট আকারে পুনর্নিমাণ করেন, কারণ তিনি মনে করেছিলেন তাঁর সমাধি যদি অতিরিক্ত বড় হয়, তবে তা পূর্ববর্তী মহান শাসকের সমাধিকে আড়াল করে ফেলবে। একসময় এই কমপ্লেক্সে একটি মাদ্রাসা, প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং হাম্মাম ছিল। 

মসজিদের কাছাকাছি যে প্রাচীন জলাধারটি ছিল, সেটি বর্তমানে ‘চুকুরবোস্তান’ নামে পরিচিত। একসময় সেখানে আবাসিক এলাকা ছিল। ১৮ শতকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সেই এলাকা ধ্বংস হয়ে যায় এবং পরে সেটিকে একটি বাগানে রূপান্তর করা হয়। বর্তমানে এটি একটি জনসাধারণের পার্ক হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। মসজিদের অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত। পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে গোল্ডেন হর্নের পূর্ণ দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ থাকায় এটি ইস্তাম্বুলের আকাশরেখায় অন্যতম দৃশ্যমান স্থাপনা। সমুদ্রপথে শহরের দিকে এগিয়ে এলে সুলেমানিয়ে মসজিদ এবং ইয়াভুজ সুলতান সেলিম মসজিদ-এই দুই মসজিদই ইস্তাম্বুলের সিলুয়েটে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।

যদিও আজ মসজিদটি শহরের প্রধান পর্যটন পথের বাইরে হওয়ায় তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত, তবু অটোমান যুগে এর গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত বেশি। অটোমান সুলতানরা সিংহাসনে আরোহণের আনুষ্ঠানিকতার পর আইয়ুবে তরবারি বাঁধার অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে এখানে এসে সুলতান সেলিম প্রথমের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। সেখানে তারা একটি পশু কোরবানি দিতেন, দোয়া ও প্রার্থনা করতেন এবং এরপর তাদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা অব্যাহত করতেন। এই মসজিদ অটোমান ইতিহাস, স্থাপত্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক। সরল অথচ গভীর তাত্পর্যপূর্ণ এই স্থাপনা আজও ইস্তাম্বুলের আকাশরেখায় দাঁড়িয়ে অতীতের মহিমা ও ইতিহাসের স্মৃতি বহন করে চলেছে।