নির্বাচনে যেন কোনো ‘গলদ’ না থাকে: প্রধান উপদেষ্টা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেন কোনো ‘গলদ’ না থাকে সেজন্য সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
নির্বাচনের দিন যেন কোনো কিছুর অভাব বোধ না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ মনোযোগী হওয়ার বিষয়েও জোর দিয়েছেন তিনি।
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে আয়োজিত গণভোটকে সামনে রেখে বুধবার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বক্তব্য রাখছিলেন।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ে এই বৈঠক হয় বলে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমরা আসলে নির্বাচন কমিশনকে সাহায্য করব, এটাই আমাদের কাজ। জাতির জন্য এটা বড় এক চ্যালেঞ্জ, যা আমাদের নিতে হবে এবং এই বিশাল কাজটি শেষ করে তাকে ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে দাঁড় করাতে হবে।”
তিনি বলেন, “নির্বাচনের দিন যেন কোনো কিছুর অভাব বোধ না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ মনোযোগী হতে হবে। ১২ ফেব্রুয়ারি কোথাও যেন কোনো গলদ না থাকে।”
এবারের নির্বাচন ভবিষ্যতের জন্য একটি আদর্শ নির্বাচন হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের ধাপে ধাপে পরীক্ষা শুরু হল। আজ থেকে শুরু, ১২ ফেব্রুয়ারি হবে ফাইনাল।
“ইসির নির্দেশই এখন সবচেয়ে বড় নির্দেশ, ইসির নির্দেশনা মেনে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কমান্ডের মূল ভূমিকায় থাকবে। এখন নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।”
নির্বাচনে প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রসঙ্গ টেনে সররকারপ্রধান বলেন, “আমরা এবারের নির্বাচনে বডি ক্যামেরা ব্যবহার করব। সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করব, কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম থেকে সবকিছু মনিটরিং করা হবে।”
দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয়ে কোনো ঘাটতি রাখা যাবে না, এমন বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি নির্বাচন ঘিরে দেশি-বিদেশি বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকের উপস্থিতির কথাও তুলে ধরেন মুহাম্মদ ইউনূস।
তিনি বলেন, “তারা বিষয়টিকে খুবই ‘সিরিয়াসলি’ নিয়েছে, আমাদেরও এ বিষয়ে ‘সুপার সিরিয়াস’ থাকতে হবে।”
নির্বাচনের বর্তমান প্রস্তুতি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমাদেরই সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এই মুহূর্তে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং যে প্রস্তুতি রয়েছে, তাতে একটি সুন্দর নির্বাচন সম্ভব।”
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা ‘ইতিবাচক’ মনোভাব নিয়ে পারস্পরিক ‘সৌহার্দ্য’ বজায় রাখছেন, নিজের এমন আস্থার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি আশা করেন যে তারা কেউই এই মনোভাব থেকে ‘সরে যাবেন না’।
বৈঠকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব আখতার আহমেদ জানান, এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল অংশগ্রহণ করছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ২৬টি দেশের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় ৩০০ পর্যবেক্ষকের একটি দল পাঠাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তাদের ৫৬ জন প্রতিনিধি বাংলাদেশে অবস্থান করছেন, যাদের মধ্যে দুজন মনোনয়নপত্র সংক্রান্ত আপিল প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন।
ইসি সচিব বলেন, আজ মধ্যরাত থেকে শুরু হয়ে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রচার চালাতে পারবেন।
সাইবার স্পেসে তথ্য বিকৃতিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, দলীয় প্রতীকের ব্যালট, গণভোটের ব্যালট এবং পোস্টাল ব্যালট গণনায় বাড়তি সময় লাগবে। এ নিয়ে যেন অপতথ্য বা গুজব না ছড়ায়, সে জন্য গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান ইসি সচিব।
সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, নির্বাচনের দিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে তার মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ভোটের দিন সব ভোটকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ২০২৪ সালের অগাস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া ৩ হাজার ৬১৯টি অস্ত্রের মধ্যে ২ হাজার ২৫৯টি উদ্ধার করা হয়েছে, যা লুট হওয়া মোট অস্ত্রের ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে লুট হওয়া ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮ রাউন্ড গোলাবারুদের মধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ১০০ রাউন্ড উদ্ধার হয়েছে, যা ৫২ শতাংশ।
তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় জনমনে স্বস্তি নিশ্চিত করতে বাহিনীগুলো সমন্বিতভাবে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা কার্যকর করা গেলে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) মহাপরিচালক আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সশস্ত্র আনসার সদস্যরা ভোটকেন্দ্রের ভেতরে অবস্থান করবেন। ফলে কেউ বেআইনিভাবে কোনো প্রার্থীর এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দিতে পারবে না।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, এবার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং প্রয়োজনে তারা ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় প্রবেশ করতে পারবেন।
স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গণি জানান, আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে বডি ক্যামেরা পৌঁছে যাবে। প্রয়োজনে ড্রোন ব্যবহার করা হবে। ভোটের চার দিন আগে সব বাহিনী মোতায়েন হবে এবং ভোটের পর আরও সাত দিন মাঠে থাকবে।
তিনি বলেন, আজ থেকেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে একাধিক টিম নির্বাচনসংক্রান্ত মাঠপর্যায়ের তথ্য ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং ও রেকর্ড করবে। বডি ক্যামেরার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সংযোগ স্থাপন করে সব ঘটনা রেকর্ড করা যাবে। এ সময় তিনি বডি ক্যামেরা ব্যবহারের ওপর একটি ভিডিওচিত্র উপস্থাপন করেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বডি ক্যামেরা সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে ‘বিশাল মাত্রায় সাফল্য পাওয়া সম্ভব’।
তিনি বলেন, এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে এবং প্রয়োজনে আরও কম সময়ের ব্যবধানে এ ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ, নৌবাহিনী প্রধান মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান হাসান মাহমুদ খান, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া, পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা।