ইসলামে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনাচারের গুরুত্ব
ইসলাম মানুষের জীবনকে ভারসাম্য, সৌন্দর্য ও মর্যাদার পথে পরিচালিত করে। মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন থেকে শুরু করে বাহ্যিক পোশাক-পরিচ্ছেদ, খাওয়াদাওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রেই ইসলাম মধ্যপন্থা ও শালীনতাকে গুরুত্ব দিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে অসংখ্য নিয়ামত দান করেন, সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার ও প্রকাশও ইসলামের দৃষ্টিতে ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, তবে শর্ত হলো তা হতে হবে সম্পূর্ণ অহংকার ও অপচয়মুক্ত।
এ ব্যাপারে আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত একটি চমৎকার হাদিস পাওয়া যায়।
যেখানে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দাকে কোনো নিয়ামত দান করেন, তখন তিনি ভালোবাসেন যে সেই নিয়ামতের প্রভাব তার জীবনে ও আচরণে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠুক। তিনি কৃত্রিম দারিদ্র্য ও লোক-দেখানো অভাব প্রদর্শন অপছন্দ করেন, (বাস্তবে অভাব না থাকা সত্ত্বেও) বারবার অনুনয়কারী (মানুষকে বিরক্তকারী) ভিক্ষুককে ঘৃণা করেন; আর তিনি সংযমী, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও নিজেকে কৃত্রিম অভাব প্রদর্শন থেকে বাঁচিয়ে চলা ব্যক্তিকে ভালোবাসেন।’ (বায়হাকি)
এই হাদিসে আল্লাহর দৃষ্টিতে পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় কয়েকটি আচরণ স্পষ্ট করা হয়েছে।
প্রথমত, নিয়ামতের প্রকাশ।
আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দাকে ধন-সম্পদ, মর্যাদা বা সামর্থ্য দান করেন, তখন তিনি ভালোবাসেন যে তার প্রভাব বান্দার জীবনে দৃশ্যমান হোক। অর্থাৎ বান্দা তার অবস্থা অনুযায়ী পরিচ্ছন্ন ও শালীন পোশাক পরবে, খাবারদাবারে কৃপণতা করবে না এবং জীবনযাপনে সৌন্দর্য বজায় রাখবে। এটাই আল্লাহর নিয়ামতের শোকর। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এবং তোমার প্রতিপালকের যে নিয়ামত (পেয়েছ), তার চর্চা করতে থাক।’
(সুরা : দুহা, আয়াত : ১১)
তাফসিরবিদদের মতে, অনুগ্রহকারীর অনুগ্রহের কথা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে প্রচার করলে তাতে শরিয়তে কোনো দোষ নেই, বরং তা প্রশংসনীয় কাজ। সুতরাং আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-এর প্রতি যেসব অনুগ্রহ করেছেন, এ আয়াতে তাঁকে তা প্রচার করার হুকুম দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, দুটি আচরণ ইসলামে নিন্দিত। একটি হলো নিয়ামত থাকা সত্ত্বেও নিজেকে জীর্ণ, করুণ ও হীনভাবে উপস্থাপন করা। আরেকটি হলো বাস্তবে অভাবী না হয়েও কৃত্রিমভাবে দারিদ্র্য ও নিঃস্বতা জাহির করে মানুষের সহানুভূতি বা সাহায্য পাওয়ার চেষ্টা করা।
এ দুটি আচরণ আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতার শামিল এবং সমাজে ব্যক্তির মর্যাদা নষ্ট করে। এ ধরনের ভান করা হয় সাধারণত নিজের সম্পদ দিয়ে কাউকে সহযোগিতা করার ভয়ে কিংবা কৃত্রিম দরিদ্রতা দেখিয়ে অন্যের কাছ থেকে অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার আশায়।
তৃতীয়ত, অযথা মানুষের কাছে হাত পাতা। হাদিসে এসেছে, মহান আল্লাহ যন্ত্রণাকারী ভিক্ষুক তথা, বিরক্ত করার উদ্দেশ্যে বারবার অনুনয়কারী ভিক্ষুককে অপছন্দ করেন। ব্যস্ত সড়ক কিংবা বাজারগুলোতে সাধারণত এ রকম কিছু ভিক্ষুক দেখা যায়, যারা মানুষের মানিব্যাগ হাতে নেওয়ার সময় দল বেঁধে তাদের সামনে গিয়ে তাদের বিরক্ত করতে থাকে। এমনকি এক পর্যায়ে তাদের ভিক্ষা দিতে বাধ্য করে। বাস বা ট্রেন স্টেশনে অনেক সময় যাত্রীরা নিজেদের পরিবার ও লাগেজ-ব্যাগ ইত্যাদি নিয়ে বেকায়দায় থাকে, তখনো এসব ভিক্ষুক তাদের অনবরত বিরক্ত করতে থাকে। অথচ বাস্তবে অভাবী হলেও মানুষকে বিব্রত করে ভিক্ষা আদায় অনুচিত, বরং সেসব অভাবীকে সহযোগিতা করা উচিত, যারা অভাব-অনটন থাকা সত্ত্বেও মানুষকে বিব্রত করে পয়সা উসুল করতে পারে না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, (আর্থিক সহযোগিতার জন্য বিশেষভাবে) উপযুক্ত সেই সব গরিব, যারা নিজেদের আল্লাহর পথে এভাবে আবদ্ধ করে রেখেছে যে (অর্থের সন্ধানে) তারা
ভূমিতে চলাফেরা করতে পারে না। তারা যেহেতু (অতি সংযমী হওয়ার কারণে কারো কাছে) সওয়াল করে না (ভিক্ষা চায় না), তাই অনবগত লোকে তাদের বিত্তবান মনে করে। তুমি তাদের চেহারার আলামত দ্বারা তাদেরকে (অর্থাৎ তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা) চিনতে পারবে। (কিন্তু) তারা মানুষের কাছে না-ছোড় হয়ে সওয়াল করে না। তোমরা যে সম্পদই ব্যয় করো, আল্লাহ তা ভালো করেই জানেন।
(সুরা: বাকারাহ, আয়াত : ২৭৩)
চতুর্থত, আত্মসংযম ও লজ্জাশীলতা। আল্লাহ যেসব লজ্জাশীলকে ভালোবাসেন, যারা হারাম থেকে নিজেকে বাঁচায় এবং প্রয়োজনে কষ্ট সহ্য করেও মানুষের কাছে হাত পাতে না। এটি মুমিনের আত্মমর্যাদা ও ঈমানের পরিচায়ক।
সবশেষে বলা যায়, ইসলাম না দারিদ্র্য পূজা শেখায়, না বিলাসিতার অনুমোদন দেয়; বরং ইসলাম শেখায় আল্লাহর নিয়ামত গ্রহণ করা, তা সংযমের সঙ্গে উপভোগ করা, শোকর আদায় করা এবং আত্মমর্যাদা ও ভারসাম্য বজায় রেখে জীবন যাপন করা। এটাই ইসলামের সৌন্দর্য ও বাস্তবমুখী শিক্ষা।