বেলারুশে মুসলিম আগমনের ইতিহাস
বেলারুশের সঙ্গে মুসলমানদের যোগাযোগের সূচনা হয়েছিল খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগে। সে সময় বেলারুশে ইসলামী মুদ্রার আগমন ঘটে। ১৯৬২ সালে বেলারুশের গ্লুবোকো জেলায় খলিফা হারুনুর রশিদ ও খলিফা আল মুতাসিমের আমলের মুদ্রা পাওয়া যায়। ১৯৬০ সালে একই জেলার পরিচয়েই গ্রামে একটি গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া যায়, সেখানে খলিফা আল মানসুরের নামাংকিত মুদ্রা পাওয়া যায়। আল বালখি, আল ইস্তাখরি, আল হাওকালসহ অন্যান্য আরব লেখকের রচনায় আরসানিয়া রাজ্যের বর্ণনা পাওয়া যায়, যার শাসক আরসা নামক শহরে বসবাস করতেন। অনেকেই মনে করেন—আরসা হলো বেলারুমের ওরশা শহর। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকে রচিত ‘দ্য টেল অব বিগন ইয়ার্স’ বইতে লেখা হয়েছে, ৯৮৬ খ্রিস্টব্দে মুসলিম ভলগা বুলগার্সদের পক্ষ থেকে বেলারুশের শাসক ভ্লাদিমির দ্য গ্রেটকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। তাঁর সামনে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার সৌন্দর্য তুলে ধরা হয়।
খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে বেলারুশে লিপকা তাতারদের আগমন ঘটে। ১৪১০ সালে সংঘটিত গ্রুনওয়াল্ড যুদ্ধের পর লিথুনিয়ান বাহিনীকে সাহায্য করতে তাদের আগমন ঘটে। লিপকা তাতাররা ছিল ধর্মপরায়ণ। তারা আরবি বর্ণমালা ব্যবহার করে স্থানীয় ভাষায় ধর্মীয় গ্রন্থগুলো অনুবাদ করেছিল। পরবর্তীতে তারা বেলারুশিয়ান ও পোলিশ ভাষা গ্রহণ করেছিল। তবে তারও আগে ১৩১৯ সালে তাতার প্রথম টিউটোনিকের বিরুদ্ধে জেডিমিনাসের নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছিল। ১৬ শতকে বেলারুশে মুসলিম তাতারদের আগমন বেগবান হয় এবং তারা বসতি স্থাপন করতে আরম্ভ করে। লিপটা তাতাররা ধর্মপ্রাণ হলেও স্থানীয়দের ধর্মান্তরের চেষ্টা তারা কখনো করেনি।
১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দে লুবলিন ইউনিয়নের লিথুনিয়ার গ্রান্ড ডাচিতে প্রথম বৃহৎ মুসলিম বসতি স্থাপন করা হয়, বর্তমানে এই অঞ্চলটি বেলারুশের অংশ। ১৫৯১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ পোলিশ-লিথুনিয়ান কমনওয়েলথ বাহিনীতে মুসলিম সৈনিকদের সংখ্যা এক লাখে উন্নীত হয়। মুসলিম সেনারা তাদের সেবা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে শাসকদের মন জয় করে এবং অনুদান হিসেবে ভূমি লাভ করে। ষোড়শ শতকের শেষ ভাগে কমনওয়েলথ অঞ্চলে চার শতাধিক মসজিদ ছিল। এসব মসজিদের ইমামরা শিক্ষক ও কাজি (বিচারক) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করত। ইমামরা সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তি, বিবাহ ও বিচ্ছেদের ফায়সালা দিতেন। অভিজাত তাতাররা পাথরের মসজিদে নামাজ আদায় করতেন। ইমামরা উচ্চ শিক্ষার জন্য উসমানীয় অঞ্চলে গমন করতেন। ১৬৭২ খ্রিস্টাব্দে কিছু সংখ্যক তাতার উসমানীয়দের পক্ষে বিদ্রোহ করলে বেলারুশের শাসকদের মুসলমানদের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়। অবশ্য রাজা তৃতীয় জন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলে সংকটের অবসান হয়।
১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে পোলিশ-লিথুনিয়ান কমনওয়েলথ ভেঙ্গে গেলে বেলারুশ অঞ্চল রুশ সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়। তখন থেকে মুসলিমদের সংখ্যা ও প্রভাব কমতে থাকে। এ সময় জোরপূর্বক ধর্মান্তরের ঘটনাও ঘটে। কিন্তু সেনা বাহিনীতে লিপকা তাতারদের অংশগ্রহণ অব্যাহত থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত তারা বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ১৯২০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পর চরম ধর্মবিরোধী নীতি গ্রহণ করা হয়। এই সময় ধর্মচর্চা ও ধর্মীয় শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়। যাবতীয় ওয়াকফ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং বিপুল সংখ্যক আলেমকে হত্যা, বন্দি ও দেশান্তরে বাধ্য করা হয়। সোভিয়েত সরকার বেলারুশের সব মসজিদ বন্ধ করে দেয়। সে সময় কেবল তিনটি মসজিদ চালু থাকে। ১৯৬২ সালে মিনস্কের ঐতিহাসিক তাতার মসজিদ ধ্বংস করা হয়। সোভিয়েত সরকারের ধর্মবিরোধী নীতির কারণে বেলারুশে মুসলমানের সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়।
২০২০ সালের সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে বেলারুশে ২৪ হাজার ৫০০ মুসলমান রয়েছে। তবে বেসরকারি সূত্রগুলোর দাবি মুসলমানদের সংখ্যা লক্ষাধিক। বেলারুশে মুসলমানদের ২৪টি উপশাখা রয়েছে। যার মধ্যে একটি শিয়া মুসলিমদের। বেলারুশের সর্ববৃহত্ মুসলিম সংগঠন ‘দ্য মুসলিম রিলিজিয়াস অ্যাসোসিয়েশন অব দ্য রিপাবলিক অব বেলারুশ’। ১৯৯৪ সালে সুন্নি মুসলিমরা এটা প্রতিষ্ঠা করে। ধর্মীয় শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের মতো কাজগুলো এই অ্যাসোসিয়েশনই করে থাকে। তাদের অধীনে ছয়টি মসজিদ ও দুটি প্রার্থনা কক্ষ পরিচালিত হয়।
তথ্যঋণ: গ্রোকিপিডিয়া, দাওয়া ডটসেন্টার ও উইকিপিডিয়া