রোববার ০৮ মার্চ ২০২৬, ফাল্গুন ২৪ ১৪৩২, ১৯ রমজান ১৪৪৭

ইসলাম

ইফতার আয়োজনে সমাদৃত হায়দারাবাদি হালিম

 প্রকাশিত: ১৫:১০, ৮ মার্চ ২০২৬

ইফতার আয়োজনে সমাদৃত হায়দারাবাদি হালিম

ইফতার আয়োজনে জনপ্রিয় খাবার হালিম। হালিমের জনপ্রিয়তা উপমহাদেশ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। ইফতারে হালিমের এই জনপ্রিয়তা তৈরি করেছে হায়দারাবাদি হালিম। সুস্বাদু এই হালিমের যাত্রা শুরু হয়েছিল ভারতের হায়দারাবাদ থেকে। এখন তা ভারতসহ উপমহাদেমের ইফতার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

হায়দারাবাদে মুসলিম নিজামের শাসনের অবসান হয়েছে অর্ধ-শতাব্দী আগে। কিন্তু এখনো সেখানে রয়ে গেছে হালিমের রাজত্ব। রমজান মাসে ইফতারের আগে যদি আপনি হায়দারাবাদের বিখ্যাত চারমিনার এলাকায় যান, তবে হায়দারাবাদি হালিমের ঘ্রাণ এবং তার প্রতি স্থানীয়দের ভালোবাসা আপনাকে মোহিত করবে। ইফতার ক্রয়কারীদের ভিড়ে সেখানে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রতিটি হালিমের দোকানের সামনে তৈরি হয় দীর্ঘ লাইন। 

হায়দারাবাদি হালিম তৈরি হয় বাদাম, বাসমতি চাল, গোল মরিচ, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, জিরা, ডাল, রসুন, কাঁচা মরিচ, ঘি, পেঁয়াজ, গম এবং অবশ্যই খাসির মাংস। এক পাতিল হালিম তৈরি করতে প্রায় ১২ ঘণ্টা সময় লাগে। রন্ধন প্রণালী অনুসারে বাবুর্চিরা ইট ও মাটির তৈরি চুলা ভাট্টিতে হালিম রান্না করেন। রমজানে হায়দারাবাদে রাস্তার পাশের দোকান থেকে পাঁচ তারকা হোটেল পর্যন্ত সর্বত্র হালিম পাওয়া যায়। 

মজার বিষয় হলো, হায়দারাবাদি হালিম ভারতীয় খাবার হিসেবে পৃথিবীতে সুনাম অর্জন করলেও এর উত্পত্তি হয়েছিল আরবে। আরবের বাবুর্চিরা ভারতের রাজন্যবর্গের জন্য হালিম রান্না করেন এবং ধীরে ধীরে তা সাধারণ মানুষের ভেতর জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অবশ্য স্থানীয় মশলা ও রন্ধন প্রক্রিয়া ভারতীয় হালিমকে আরবীয় হালিমের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব এনে দিয়েছে। আরবরা হালিম তৈরি করে মাংস ও পেষা গম দিয়ে।

ধারণা করা হয়, হায়দারাবাদের নিজামের বাহিনীতে যোগদান করা আরব চৌশ সৈন্যদের মাধ্যমে ভারতে হালিমের আবর্তন ঘটে। চৌশরা এসেছিল ইয়েমেন থেকে এবং তারা আরবের বিখ্যাত হাদরামি বংশোদ্ভূত। ভারতে হালিমের প্রচলন কয়েক শ বছর আগে হলেও ইফতার আয়োজনে তা জনপ্রিয় হয় গত শতাব্দীতে। ইফতার ছাড়াও বিয়েসহ অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানেও হালিম বেশ জনপ্রিয়। হায়দারাবাদে হালিম জনপ্রিয় করে তুলতে বিশেষ অবদান রাখেন সুলতান সাইফ নওয়াজ জং বাহাদুর, তিনি ছিলেন হায়দারাবাদের সপ্তম নিজাম মির উসমান আলী খানের বিশিষ্ট সভাসদ।

হায়দরাবাদ ও আশপাশের এলাকায় রমজান মাস যেন হায়দরাবাদি হালিমে একাকার হয়ে যায়। ২০১৪ সালের রমজান মৌসুমে শহরে প্রায় ৫ বিলিয়ন রুপির হালিম বিক্রি হয়েছিল এবং হালিম প্রস্তুত ও বিক্রির কাজে অতিরিক্ত প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল। দক্ষ রন্ধনশিল্পীরা মাসে প্রায় এক লাখ রুপি পর্যন্ত বেতন পান। ২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী, রমজান মাসে পুরো শহরে প্রায় ছয় হাজার খাবারের দোকানে হালিম বিক্রি করা হয়। যার মধ্যে ৭০ শতাংশ ছিল অস্থায়ী দোকান, যা রমজান শেষে বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া শহরে উত্পাদিত হায়দরাবাদি হালিমের প্রায় ২৮ শতাংশ বিশ্বের ৫০টি দেশে রপ্তানি করা হতো।

হায়দরাবাদি হালিম একটি উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারও বটে। যা ধীরে হজম হওয়া এবং দ্রুত শক্তি উত্পন্নকারী উপাদান থাকার কারণে দ্রুত শক্তি জোগায়। এতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ শুকনো ফল থাকে। মাংস ও শুকনো ফল থাকার কারণে এটি উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য। শহরের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিধি তদারকি করা স্থানীয় সংস্থা গ্রেটার হায়দরাবাদ মিউনিসিপাল কর্পোরেশন হালিম বিক্রি করা খাবারের দোকানগুলোর জন্য স্বাস্থ্যবিধি ও মান নিয়ন্ত্রণের নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে।