রোববার ০৮ মার্চ ২০২৬, ফাল্গুন ২৪ ১৪৩২, ১৯ রমজান ১৪৪৭

আন্তর্জাতিক

ইরানের হামলা, ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি

 প্রকাশিত: ১৫:৪২, ৮ মার্চ ২০২৬

ইরানের হামলা, ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি

মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এমন উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে শনিবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে হামলার হুমকি দিলেও নতি স্বীকার না করার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান।

তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা বাহরাইনে অবস্থিত আমেরিকার ‘জুফায়ার’ ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। 
তাদের দাবি, শনিবার সকালেই এই ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের একটি পানি শোধন কেন্দ্রে (ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট) হামলা চালানো হয়েছিল।

শনিবার ইসরাইলের জেরুজালেম এবং কাতারের দোহায় বিমান হামলার সাইরেন ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনেও হামলা হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, শনিবার সকালে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১৫টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১১৯টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। ভিডিও ফুটেজে একটি প্রজেক্টাইল দুবাই বিমানবন্দরে আছড়ে পড়তে দেখা গেছে। এএফপি’র সাংবাদিকরা শনিবার সন্ধ্যায় বাগদাদ, এরবিল এবং দুবাইয়ে বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন।

ইরানের কট্টরপন্থী বিচার বিভাগীয় প্রধান গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজেই বলেন, ‘ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে প্রমাণ আছে যে, এই অঞ্চলের কিছু দেশের ভূখণ্ড প্রকাশ্য ও গোপনে শত্রুর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব লক্ষ্যবস্তুতে ভারী হামলা অব্যাহত থাকবে।’

এর আগে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বড় বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।

সৌদি আরব শনিবার জানিয়েছে, মার্কিন সেনারা অবস্থান করছে এমন একটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে। 

অন্যদিকে জর্ডান অভিযোগ করেছে যে, গত এক সপ্তাহ ধরে ইরান তাদের দেশের ভেতরে ‘গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা’ লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘শর্তহীন আত্মসমর্পণের’ দাবির প্রেক্ষিতে পেজেশকিয়ান বেশ কঠোর সুরেই কথা বলেছেন। তিনি এক ভাষণে বলেন, ‘ইরানি জনগণের শর্তহীন আত্মসমর্পণের যে স্বপ্ন শত্রুরা দেখছে, সেই স্বপ্ন সঙ্গে নিয়েই তাদের কবরে যেতে হবে।’

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইল শনিবার অন্যতম বড় অভিযানগুলো চালিয়েছে। তাদের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল একটি সামরিক একাডেমি, একটি ভূগর্ভস্থ কমান্ড সেন্টার এবং একটি ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগার।

ভোররাতের এক হামলার পর তেহরানের মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আগুনের শিখা ও ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে। ইসরাইল দাবি করেছে, ওই হামলায় তারা ১৬টি বিমান ও যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে।

ট্রাম্প তার সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, ‘আজ ইরানে খুব বড় হামলা করা হবে!’

তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের খারাপ আচরণের কারণে এখন পর্যন্ত যেসব এলাকা বা গোষ্ঠীগুলো আমাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল না, সেগুলোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।’

পরে ফ্লোরিডায় তিনি বলেন, ‘ইরানে আমরা খুব ভালো করছি।’

ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল দাবি করে ট্রাম্প বলেন, ‘ওরা পাগল এবং ওরা সেটা ব্যবহারও করত। তাই আমরা বিশ্বের উপকার করেছি।’

ইরাকের উত্তরাঞ্চলে সাবেক আধাসামরিক জোট হাশদ আল-শাবি’র সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন হামলায় শনিবার একজন ইরাকি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।

ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর এই যুদ্ধ আজ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়াল।

সংঘাত এখন লেবানন, সাইপ্রাস, তুরস্ক ও আজারবাইজান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি শ্রীলঙ্কার উপকূলেও এর আঁচ লেগেছে, যেখানে মার্কিন বাহিনী টর্পেডো দিয়ে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে।

ইরানের ভেতরে অবকাঠামো ও আবাসিক ভবনের ক্ষয়ক্ষতি বেড়েই চলেছে। তেহরানের বাসিন্দারা চরম উদ্বেগ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতির কথা জানিয়েছেন। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২৬ বছর বয়সী এক শিক্ষক এএফপি’কে বলেন, ‘যে যুদ্ধ দেখেনি, সে এর যন্ত্রণা বুঝবে না। বোমার শব্দ কানে আসলে বুঝতে পারি না, কোথায় পড়বে।’

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানিয়েছে, হামলায় এ পর্যন্ত ৯২৬ জন সাধারণ মানুষ নিহত এবং প্রায় ৬ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তবে এএফপি স্বতন্ত্রভাবে এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

এদিকে ইসরাইল লেবাননে তাদের বিমান হামলা আরও জোরদার করেছে। ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর শক্তিশালী অবস্থান থাকা বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলীতে বারবার বোমাবর্ষণ ও এলাকা খালি করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। 

ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ শনিবার লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনকে সতর্ক করে বলেছেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণে ব্যর্থ হলে তার দেশকে ‘চরম মূল্য’ দিতে হবে।

রাতে ইসরায়েলি কমান্ডোরা ১৯৮৬ সালে নিখোঁজ হওয়া এক বিমান বাহিনীর নেভিগেটরের দেহাবশেষ উদ্ধারে নাবি শিত শহরে একটি অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানটি ব্যর্থ হয় এবং এতে ৪১ জন নিহত হয়।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ২৯৪ জন নিহত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম এক ‘মানবিক বিপর্যয়ের’ আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

এই যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি ক্ষতিগ্রস্তদের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। 

বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই সংঘাত থামার কোনো স্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না। মার্কিন ও ইসরাইলি কর্মকর্তাদের মতে, এ যুদ্ধ এক মাস বা তার বেশি সময় ধরে চলতে পারে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানায়, তারা শনিবার উপসাগরে দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে বিস্ফোরক ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন ব্যবস্থা অচল করে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা।

শনিবার বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। কেউ ইরানের পক্ষে, কেউ যুদ্ধের বিরুদ্ধে, আবার কেউ যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত সাবেক শাহ-এর ছেলে রেজা পাহলভির সমর্থনে রাজপথে নেমেছেন।

ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তেহরান তার ‘পছন্দমতো’ কাউকে নেতা হিসেবে মেনে নিলে ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠনে সাহায্য করা হবে।

তবে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি বলেন, খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা থাকবে না। 

তিনি বলেন, ‘ইরানের নেতৃত্ব নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ আমাদের সাংবিধানিক নিয়ম মেনে এবং কেবল ইরানি জনগণের ইচ্ছায়, কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ ছাড়াই।’

চীন ও রাশিয়া এখন পর্যন্ত এই সংঘাত থেকে অনেকটা দূরে রয়েছে। তবে কিছু খবরে বলা হয়েছে যে, মার্কিন সেনাদের অবস্থান ও গতিবিধি সম্পর্কে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে রাশিয়া। 

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অবশ্য বলেছেন, তারা এসব খবরে ‘উদ্বিগ্ন নন’।