রোববার ০৮ মার্চ ২০২৬, ফাল্গুন ২৪ ১৪৩২, ১৯ রমজান ১৪৪৭

আন্তর্জাতিক

সমঝোতায় আগ্রহী নন ট্রাম্প, ইরানের পরের নেতাদেরও হত্যার ইঙ্গিত

 প্রকাশিত: ১৫:০৩, ৮ মার্চ ২০২৬

সমঝোতায় আগ্রহী নন ট্রাম্প, ইরানের পরের নেতাদেরও হত্যার ইঙ্গিত

ইরানের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী নন জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এ যুদ্ধ তখনই শেষ হবে যখন তেহরানের কোনো কার্যকর সামরিক বাহিনী ও ক্ষমতায় টিকে থাকা আর কোনো নেতৃত্ব অবশিষ্ট থাকবে না।

শনিবার তাকে বহন করা বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রিপাবলিকান এ প্রেসিডেন্ট জানান, বিমান অভিযান আলোচনাকে অর্থহীন করে দিতে পারে, যদি ইরানের সব নেতা মারা পড়েন এবং তাদের সামরিক বাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়।

“এক পর্যায়ে ‘আমরা আত্মসমর্পণ করছি’ এমনটা বলার মতোও কেউ থাকবে বলে আমার মনে হয় না,” ট্রাম্প এ কথা বলেছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

ইরানি প্রেসিডেন্টের ক্ষমা প্রার্থনায় তোলপাড়

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়ানোর পর শনিবার তেহরান ও তেল আবিব আকাশপথে একে অপরের ওপর দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন। ওই দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরান যুদ্ধ শুরুর দিন থেকেই ধারাবাহিক ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে। তেহরানের হামলায় উপসাগরজুড়ে যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে তা প্রশমিত করতেই পেজেশকিয়ান ক্ষমা চেয়েছেন মনে হচ্ছে, তবে তার এ কাণ্ড দেশের ভেতরের কট্টরপন্থিদের চটিয়ে দিয়েছে।

“ইরানের পদক্ষেপে প্রভাব পড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে আমি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাইছি,” ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধে আশপাশের দেশগুলোকে না জড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে পেজেশকিয়ান এমনটাই বলেন।

ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটিকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ করতে ট্রাম্পের আহ্বানকে ‘স্বপ্ন’ বলেও উড়িয়ে দেন তিনি। ইরানি এ প্রেসিডেন্ট জানান, তাদের অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ আশপাশের দেশগুলোতে হামলা স্থগিত রাখতে রাজি হয়েছে, যতক্ষণ না তাদের ভূখণ্ড থেকে ইরানের দিকে হামলা হয়।

তার এ মন্তব্য ইরানের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়; পরে তড়িঘড়ি পেজেশকিয়ানের কার্যালয় জানায়, মার্কিন ঘাঁটিগুলো থেকে হামলা হলে ইরানের সামরিক বাহিনী কঠোর জবাব দেবে। এরপর ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ আলি লারিজানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, যুদ্ধ কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই।

এ প্রসঙ্গে রয়টার্স মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্তব্য চাইলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।

এদিকে সৌদি আরব তেহরানকে বলেছে, তাদের ভূখণ্ডে ও জ্বালানি খাতে ধারাবাহিক ইরানি হামলা হতে থাকলে তারাও এর জবাব দিতে বাধ্য হবে। বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত চারটি সূত্র রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছে।

শনিবার এবং রোববার ভোরের আগে ইরান থেকে ছোড়া ড্রোনে ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছে সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরকার। এসব হামলায় কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী আইআরজিসি বাহরাইনে মার্কিন বাহিনীর ঘাঁটি লক্ষ্য করেও হামলা চালিয়েছে, জানিয়েছে ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।

নরওয়ের অসলোতে মার্কিন দূতাবাসে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। দূতাবাস প্রাঙ্গণ থেকে ধোঁয়া ওঠা দেখতে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। দূতাবাসের সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হলেও কেউ হতাহত হয়নি। বিস্ফোরণের কারণ কী, কেউ এর সঙ্গে জড়িত ছিল কিনা তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা এরই মধ্যে অন্তত এক হাজার ৩৩২ জন বেসামরিক ইরানির প্রাণ কেড়ে নিয়েছে ও কয়েক হাজারকে আহত করেছে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি।

যুদ্ধ শুরুর দিনই ইরানের একটি প্রাইমারি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেড়শর বেশি শিশু নিহতের ঘটনায় ‘যুক্তরাষ্ট্রই সম্ভবত দায়ী’ বলে একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে আভাস দিয়েছিলেন। কিন্তু শনিবার ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই ওই ঘটনার জন্য ইরানকে দায়ী করেন।

“এটা ইরান করছে বলে আমরা মনে করছি, কারণ আপনারা জানেন তারা নির্ভুলভাবে ক্ষেপণাস্ত্র মারতে পারে না। যাই হোক তারা সঠিক জায়গায় মারতে পারে না। এটা ইরানই করেছে,” বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

এয়ার ফোর্স ওয়ানে তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, স্কুলে হামলা ঘটনাটি এখনও তদন্তনাধীন।

ইরানের হামলায় এখন পর্যন্ত নিজেদের ১১ জন নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে ইসরায়েল। অন্তত ৬ মার্কিন সেনা নিহতের খবর নিশ্চিত করেছে ওয়াশিংটন। তাদের মৃতদেহ শনিবার ডেলাওয়্যারের বিমান ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়।

লেবাননকে হিজবুল্লাহ লাগাম টেনে ধরতে বলল ইসরায়েল

সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল তেহরানের পশ্চিমের এলাকা কারাজসহ অন্তত তিনটি স্থানে ইরানের জ্বালানি ডিপো লক্ষ্য করে হামলা করেছে বলে ইরানি তেল মন্ত্রণালয়ের এক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো।

ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে দমাতে লেবাননেও টানা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তেল আবিব। সংঘাত বিস্তৃত হতে থাকায় ইসরায়েল লেবাননকে সতর্ক করে বলেছে, তারা যদি হিজবুল্লাহর লাগাম টেনে ধরতে না পারে তাহলে তাদেরকে ‘চড়া মূল্য চুকাতে’ হবে।

শনিবার ইসরায়েল হিজবুল্লাহর একাধিক শক্ত ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং লেবাননের পূর্বাঞ্চলে বড়সড় বিমান হামলা চালিয়েছে।

রয়টার্সের ভিডিওতে শনিবার সকালে বৈরুতের হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত দক্ষিণ প্রান্তে অসংখ্য ভবনের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে।

সোমবার থেকে লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় মৃত্যু ৩০০ জনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বৈরুতের কেন্দ্রে রামাদার এক হোটেল ভবনের অ্যাপার্টমেন্টে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গত সপ্তাহে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাত নতুন করে শুরু হওয়ার পর লেবাননের রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে এটাই প্রথম হামলা।

ওয়াশিংটন-তেল আবিবের হামলার পাল্টায় অঞ্চলজুড়ে যতবেশি অস্থিরতা তৈরির যে কৌশল ইরান নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে তা যুদ্ধেরও খরচ বাড়িয়েছে; জ্বালানির দাম বাড়ছে এবং বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

কাতার ও ইরাক তেল-গ্যাস উৎপাদন কমানোর পদক্ষেপ নেওয়ার পর শনিবার থেকে কুয়েতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিও তাদের উৎপাদন কমানো শুরু করেছে।

নয় দিনে পড়া যুদ্ধটি এরই মধ্যে বিশ্বের শেয়ারবাজারগুলোকে অস্থির করে তুলেছে, হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় তেলের দামও কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে গেছে।

এদিকে ইরানের কট্টরপন্থি ধর্মীয় নেতারা শিগগিরই সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বেছে নেওয়ার তাগাদা দিয়েছেন। শনিবার ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকে এ পদটি ফাঁকা রয়েছে। যে বিশেষজ্ঞ পরিষদ সর্বোচ্চ নেতা বেছে নেবে তাদের বৈঠক রোববার হতে পারে বলে ইরানি গণমাধ্যমে আভাস দেওয়া হয়েছে।