মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হামলা, চতুর্থ দিনে ইরান-ইসরাইল সংঘাত
মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মঙ্গলবার নতুন করে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে লেবাননে ইসরাইলের হামলা এবং সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলার ঘটনা রয়েছে। ওয়াশিংটন থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
সপ্তাহের শেষে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাত ইরানের পাল্টা আঘাতে অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত হয়। চতুর্থ দিনে গড়ালেও পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় মধ্যরাতের কিছু পর ইসরাইলের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা ইরান থেকে ছোড়া বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। এগুলোর লক্ষ্য ছিল জেরুজালেমসহ একাধিক স্থান।
সামরিক বাহিনী জানায়, ‘কিছুক্ষণ আগে আইডিএফ ইসরাইল রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের দিকে ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে। হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে।’
মঙ্গলবার ভোরে রিয়াদের কূটনৈতিক এলাকায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায় বলে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী এএফপিকে জানান। ওই এলাকায় বিদেশি দূতাবাস ও কূটনীতিকদের বাসভবন রয়েছে।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, রাজধানীতে দুইটি ড্রোন হামলায় মার্কিন দূতাবাসে আগুন লাগে।
কাতারে মঙ্গলবার ভোরে দুইটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এর আগে দোহাজুড়ে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনেন এএফপি সাংবাদিকরা।
সোমবার কাতার দুইটি ইরানি বোমারু বিমান ভূপাতিত করে এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। একই সময়ে তেহরান সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়ে সংকট আরও তীব্র করে তোলে। এতে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়।
ইসরাইলের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ‘কমান্ড সেন্টার ও অস্ত্র গুদাম’ রয়েছে। ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে আগেই সতর্ক করেছিল ইসরাইল।
লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীটি মধ্যরাতের কিছু পর জানায়, এক বছরের বেশি সময় ধরে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইলের হামলার জবাবে তারা রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। একে তারা ‘প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করে।
- মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের ‘এখনই চলে যাওয়ার’ আহ্বান
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে মিসর ও উপসাগরীয় দেশসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে মার্কিন নাগরিকদের চলে যেতে আহ্বান জানিয়েছে।
কনস্যুলার বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরা নামদার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে নিচে উল্লেখিত দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের এখনই বাণিজ্যিক পরিবহন ব্যবহার করে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।’ সতর্কবার্তায় অন্তর্ভুক্ত ১৪টি দেশ হলো—বাহরাইন, মিসর, ইরান, ইরাক, ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন।
ইসরাইলের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইরানের রাষ্ট্রীয় বেতার ও টেলিভিশন সম্প্রচার সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি)-এর সদর দপ্তরে হামলা চালিয়ে সেটিকে আঘাত করে ও ভেঙে দেয়। তাদের দাবি, তারা ‘ইসরাইল রাষ্ট্র ধ্বংস এবং পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছিল।
আইআরআইবি টেলিগ্রামে লিখেছে, তেহরানে তাদের সদর দপ্তরের কাছে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে তাদের কার্যক্রমে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর একজন জেনারেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা যেকোনো জাহাজ ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। বৈেিতল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।
গার্ড বাহিনীর টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া এক পোস্টে জেনারেল সারদার জাব্বারি বলেন, ‘আমরা তেল পাইপলাইনেও হামলা চালাব এবং অঞ্চল থেকে এক ফোঁটা তেলও বাইরে যেতে দেব না। আগামী দিনগুলোতে তেলের দাম ২০০ ডলারে পৌঁছাবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, মিত্র দেশ ইসরাইল ইরানে হামলা চালাতে যাচ্ছে—এমন তথ্য জানার পরই যুক্তরাষ্ট্র আঘাত হানে।
রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, আমরা জানতাম, ‘তারা হামলা চালানোর আগে যদি আমরা আগাম ব্যবস্থা না নিতাম, তাহলে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি আরও বেশি হতো।’
স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরানে অবস্থিত ইউনেসকো তালিকাভুক্ত গোলেস্তান প্রাসাদ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরইলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আইএসএনএ সংবাদ সংস্থা জানায়, রোববার সন্ধ্যায় তেহরানের দক্ষিণে আরাগ স্কয়ারে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলার পর গোলেস্তান প্রাসাদের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিস্ফোরণের অভিঘাতে জানালা, দরজা ও আয়না ভেঙে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় তারা ১ হাজার ২৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
অঞ্চলে দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড প্রকাশিত এক তথ্যানুসারে, হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ইরানি নৌবাহিনীর জাহাজ ও সাবমেরিন এবং জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা।
যুদ্ধের সতর্কবার্তা ট্রাম্পের-
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানে মার্কিন হামলা প্রাথমিক পূর্বাভাসের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে পরস্পরবিরোধী বার্তার সমালোচনার জবাব দিতেই তার প্রশাসন এ অবস্থান নেয়।
সামরিক অভিযান শুরুর পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরানে হামলার চারটি প্রধান লক্ষ্য রয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রথমত, আমরা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করছি। দ্বিতীয়ত, তাদের নৌবাহিনী নিশ্চিহ্ন করছি। তৃতীয়ত, বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসে পৃষ্ঠপোষক দেশ যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না পায়, তা নিশ্চিত করছি।
‘সবশেষে, আমরা নিশ্চিত করছি যে ইরানি শাসনব্যবস্থা তাদের সীমান্তের বাইরে সন্ত্রাসী বাহিনীকে অস্ত্র, অর্থ ও নির্দেশনা দিতে না পারে।