হরমুজের কাছে হানা, খার্ক দখলে ‘স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে’ পেন্টাগন
খার্ক দ্বীপ ও হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সামরিক অভিযানসহ পেন্টাগন ইরানে কয়েক সপ্তাহব্যাপী দীর্ঘ স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিস্তৃত হয়ে পড়া যুদ্ধ পঞ্চম সপ্তাহে গড়ানোর মাঝে মার্কিন সংবাদমাধ্যমটিতে শনিবার মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতি নেওয়ার এ খবর দেওয়া হয়।
মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায় বিশেষ অভিযানের পাশাপাশি নিয়মিত পদাতিক বাহিনীকে ব্যবহারের বিষয়ও থাকতে পারে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এসব পরিকল্পনার কোনটি বেছে নেন বা সবকটিই বাতিল করে দেন কি না তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি, নাম প্রকাশ না করে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে এমনটাই জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট।
কোনো স্থল অভিযান হলেও সেটি সীমিত আকারে, পুরোদস্তুর আক্রমণ হবে না, বলা হয়েছে এ প্রতিবেদনে।
খার্ক দ্বীপে ইরানের সর্ববৃহৎ তেলের টার্মিনাল অবস্থিত, সে কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন ওই দ্বীপটি দখলের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। এর পাশাপাশি তারা হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থিত উপকূলীয় এলাকাগুলোতে অভিযানের কথাও ভাবছেন। বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজকে নিশানা করতে পারে এমন ‘অস্ত্র খুঁজে বের করে তা ধ্বংস করার’ লক্ষ্যে এ অভিযান হতে পারে, বলছে ওয়াশিংটন পোস্ট।
গত মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল-গ্যাস রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে।
স্থল অভিযানের যেসব লক্ষ্য বিবেচনা করা হচ্ছে তা অর্জনে ‘মাস নয়, কয়েক সপ্তাহ’ লাগতে পারে বলে ওয়াশিংটনভিত্তিক সংবাদমাধ্যমটিকে বলেছেন একজন। আরেক কর্মকর্তা অভিযান শেষ হতে ‘কয়েক মাসও’ লেগে যেগে পারে বলে আভাস দিয়েছেন।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর পরিকল্পনা সম্বন্ধে অবগত সাবেক এক ঊর্ধ্বতন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, পরিকল্পনা বেশ বিস্তৃত।
“আমরা দেখেছি এটা। এর মহড়া হয়েছে। এটা শেষ মুহূর্তের পরিকল্পনা নয়,” ওয়াশিংটন পোস্টকে তিনি এ কথা বলেছেন।
ইরানি ভূখণ্ড দখল করা গেলে তা ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের শাসকগোষ্ঠীকে ‘বিব্রত’ করবে এবং এটি ভবিষ্যতে যে কোনো আলোচনায় ‘দরকষাকষির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার’ হবে, মত তার।
সাবেক এ কর্মকর্তার দৃষ্টিতে, মার্কিন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, কোনো ভূখণ্ড দখল করার পর তার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা।
“খার্ক দ্বীপে থাকা লোকজনকে সুরক্ষা দিতে হবে আপনার। এটা খুবই কঠিন কাজ। দখল খুব একটা কঠিন নয়। কঠিন হল, সেখানে আপনার লোক থাকাকালে তাদের সুরক্ষা দেওয়া,” বলেছেন তিনি।
ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ যে দ্বীপ দিয়ে হয়, সেই খার্ক মার্কিন সেনারা দখলের চেষ্টা করতে পারে—এমন গুঞ্জন আগে থেকেই ছিল। কিছুদিন আগেই মার্কিন বাহিনী সেখানে বিমান হামলাও চালিয়েছে। ট্রাম্প সেসময় দ্বীপটিকে তেহরানের ‘মুকুট মণি’ আখ্যা দিয়েছিলেন।
ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে তাদেরকে ‘কঠোর পরিণতির’ মুখোমুখি হতে হবে বলে তিনি বারবার হুঁশিয়ারিও দিয়ে যাচ্ছেন।
‘ট্রাম্প ভাঁওতা দেন না’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলা শুরু করার পর কয়েকদিন আগে ট্রাম্প ‘অভিযান শেষ করে আনার’ ইঙ্গিত দিলেও মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট হুমকি দিয়ে বলেন, ইরান যদি যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি মেনে নিতে রাহি না হয় তাহলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তেহরানের বিরুদ্ধে ‘নরক দরজা খুলে দিতে প্রস্তুত’।
“ইরান যদি বর্তমান অবস্থার বাস্তবতা মেনে নিতে ব্যর্থ হয়, যদি তারা বুঝতে না পারে যে তারা সামরিকভাবে পরাজিত হয়েছে এবং হতেই থাকবে, তাহলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগে কখনো হয়নি এমন আঘাত তাদের ওপর যেন হয় তা নিশ্চিত করবেন।
“প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভাঁওতা দেন না, তিনি নরকের দরজা খুলে দিতে প্রস্তুত। ইরানের উচিত হবে না ফের ভুল হিসাবে জড়ানো,” বলেছিলেন তিনি।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল অভিযান নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় লেভিট বলেছেন, “পেন্টাগনের কাজ হচ্ছে কমান্ডার ইন চিফের হাতে যেন সর্বোচ্চ বিকল্প থাকে তার প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। এর মানে এই নয় যে প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।”
এর আগে শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, “স্থলবাহিনী ছাড়াই ওয়াশিংটন তার সব লক্ষ্য পূরণ করতে পারে।”
ট্রাম্প সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বারবার ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে বলেও দাবি করে যাচ্ছেন। তবে তেহরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো যোগাযোগের কথা অস্বীকার করে আসছে।
দুই দশকের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ সামরিক উপস্থিতি
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তাদের আরও সাড়ে তিন হাজার মেরিন ও নাবিক মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এখনই ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি সবচেয়ে বড়, তার সঙ্গে নতুন এ মেরিন ও নাবিকরা যুক্ত হলেন।
উভচর আক্রমণকারী জাহাজ ইউএসএস ট্রিপলিতে চেপে এ সেনারা মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র স্থলসেনা পাঠাচ্ছে এমন গুঞ্জনের মধ্যেই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এ কথা জানায়।
ইউএসএস ট্রিপলি সাধারণত জাপানেই থাকে, শুক্রবার সেটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায়, এক্সে দেওয়া পোস্টে এমনটাই বলেছে সেন্টকম।
এই আক্রমণকারী নৌবহরে ‘পরিবহন ও আক্রমণকারী যুদ্ধবিমান, উভচর অভিযান ও কৌশলগত নানান সরঞ্জামও রয়েছে’, বলেছে তারা।
তাদের পোস্টের সঙ্গে দেওয়া চারটি ছবির একটিতে জাহাজের ডেকে বেশ কয়েকটি সিহক হেলিকপ্টার ও কয়েকটি অসপ্রে উড়োজাহাজ দেখা গেছে। এসব বিমান সাধারণত সেনা পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। আরেকটি ছবিতে দেখা গেছে একটি এফ-৩৫ জঙ্গিবিমান।