শনিবার ২৮ মার্চ ২০২৬, চৈত্র ১৪ ১৪৩২, ০৯ শাওয়াল ১৪৪৭

ব্রেকিং

ময়মনসিংহে অবৈধভাবে মজুদ করা ২৪ হাজার লিটার জ্বালানি জব্দ চব্বিশকে স্বাধীনতার সমান করলে ‘বিপর্যয় হবে’: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী জ্বালানি সরবরাহে ডিপোতে নতুন সময়সূচি দিল বিপিসি ঈদের পর প্রবাসীদের কর্মস্থলে ফেরা কঠিন, ফ্লাইট বিপর্যয়ে দুর্ভোগ শুধু খার্গ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নজর ইরানের আরও সাত দ্বীপে সংসদে শব্দযন্ত্রের বিভ্রাট ‘অন্তর্ঘাত’ কি না, তদন্তে কমিটি এই পোশাকে পুলিশ সন্তুষ্ট নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল হুতিরা ইরানিরা চার সপ্তাহ ধরে ‘ডিজিটাল অন্ধকারে’ সরকার বলছে সংকট নেই: পাম্প কোথাও বন্ধ, কোথাও লম্বা লাইন দেশের পেট্রল পাম্পে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত দৌলত‌দিয়ায় বাসডু‌বি: চতুর্থ দি‌নেও উদ্ধার অ‌ভিযান চলছে প্রায় ৪০ দিনের ছুটি শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে রোববার বেড়েছে সোনার দাম, প্রতিভরি ২৩৭০১২ টাকা সৌদি আরবে বিমানঘাঁটিতে ইরানি হামলায় ১২ মার্কিন সেনা আহত নেপালের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি গ্রেপ্তার

আন্তর্জাতিক

শুধু খার্গ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নজর ইরানের আরও সাত দ্বীপে

 প্রকাশিত: ১৮:৪০, ২৮ মার্চ ২০২৬

শুধু খার্গ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নজর ইরানের আরও সাত দ্বীপে

মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েনের প্রস্তুতির খবরে জল্পনা-কল্পনা আরও জোরদার হয়েছে। এসব সেনার সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলোর একটি হতে পারে ইরানের খার্গ দ্বীপ। উত্তর পারস্য উপসাগরে অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র থেকেই তেহরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়।

তবে খার্গ দ্বীপই যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র লক্ষ্য নয়।

উপসাগরে ইরানের আরও বহু দ্বীপ রয়েছে, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ ও নৌযানের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সাতটি দ্বীপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সেগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের নজরে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

হরমুজ প্রণালীর আবু মুসা, গ্রেটার তুনব, লেসার তুনব, হেঙ্গাম, কেশম, লারাক ও হরমুজ—এই সাতটি দ্বীপকে গবেষকরা ইরানের ‘আর্চ ডিফেন্স’ বা প্রতিরক্ষা বলয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। চীনের ঝুহাইয়ের সান ইয়াত-সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এ ধারণা তুলে ধরেন।

২০২২ সালে কানাডিয়ান সেন্টার অব সায়েন্স অ্যান্ড এডুকেশনের জন্য করা এক গবেষণায় ইরানি গবেষক এনায়াতোল্লাহ ইয়াজদানি এবং চীনা গবেষক মা ইয়ানঝে উল্লেখ করেন, এই দ্বীপগুলোকে যুক্ত করে একটি কল্পিত রেখা টানলে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে ইরানের কৌশলগত প্রাধান্য স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

তাদের মতে, এই সাতটির মধ্যে সবচেয়ে ছোট এবং পশ্চিম প্রান্তে থাকা আবু মুসা, গ্রেটার তুনব ও লেসার তুনব প্রণালী নিয়ন্ত্রণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের ‘আর্চ ডিফেন্স’

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীর আশপাশে অবস্থিত এই সাতটি দ্বীপ সামুদ্রিক চলাচল নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দ্বীপগুলোর পারস্পরিক দূরত্ব কম এবং উপসাগরের পানি তুলনামূলক অগভীর হওয়ায় বড় যুদ্ধজাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে বাধ্য হয়ে এই তিন দ্বীপের কাছ দিয়ে অতিক্রম করতে হয়।

ফলে এগুলো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর দ্রুতগতির আক্রমণকারী নৌকা, মাইন স্থাপনকারী ইউনিট বা ড্রোনের জন্য সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।

গবেষকদের ভাষায়, ইরানি কর্মকর্তারা এসব দ্বীপকে ‘স্থির ও অডুবো বিমানবাহী রণতরি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

গত বছর আইআরজিসি জানায়, তারা আবু মুসা, গ্রেটার তুনব ও লেসার তুনব দ্বীপে তাদের উপস্থিতি আরও জোরদার করছে। সে সময় আইআরজিসি নৌবাহিনীর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আলিরেজা তাংসিরি বলেন, ‘আমাদের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, এই দ্বীপগুলোকে সশস্ত্র ও কার্যকর করতে হবে। আমরা শত্রুর ঘাঁটি, যুদ্ধজাহাজ ও সম্পদে হামলা চালাতে সক্ষম।

’ (পরবর্তীতে এক ইসরায়েলি অভিযানে তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানায় ইসরায়েল ও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড।)

দ্বীপগুলো অডুবো হওয়ায় পারস্য উপসাগরের ভেতরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের নিরাপদ প্রবেশ নিশ্চিত করতে হলে এসব স্থানে থাকা ইরানি সামরিক অবস্থান ধ্বংস করা প্রয়োজন হবে—বিশেষ করে যদি খার্গ দ্বীপে কোনো অভিযান চালানো হয়।

হাওয়াইভিত্তিক বিশ্লেষক কার্ল শুস্টার বলেন, এসব দ্বীপ এমনভাবে অবস্থান করছে যে উপসাগরে প্রবেশ বা বের হওয়ার প্রায় সব জাহাজের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

তবে ইরানের এসব দ্বীপে সম্ভাব্য মার্কিন উভচর হামলার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো জানা যায়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার সময়সীমা ১০ দিন বাড়িয়ে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়েছে, যাতে তেহরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো যায়।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। তবে সামগ্রিক সামরিক অভিযানে কোনো বিরতি ঘোষণা করা হয়নি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘বোমা ফেলতে ফেলতেই আলোচনা চালিয়ে যাবে।’

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৪ হাজার সেনাসহ দুটি মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট (এমইইউ) মধ্যপ্রাচ্যের পথে রয়েছে। এ ছাড়া মার্কিন সেনাবাহিনীর ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় ১ হাজার সেনাকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

শুস্টারের মতে, এসব গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ দখলে নিতে এই বাহিনীর পূর্ণ শক্তি প্রয়োজন হতে পারে।

মার্কিন সেনারা আকাশপথ বা সমুদ্রপথ—দুইভাবেই দ্বীপগুলোতে প্রবেশ করতে পারে। নৌবাহিনীর জাহাজে থাকা ল্যান্ডিং ক্রাফট ও এলসিএসি হোভারক্রাফট সৈন্য ও সরঞ্জাম নিয়ে সরাসরি সৈকতে নামতে সক্ষম। তবে উপসাগরে প্রবেশের আগে তাদের হরমুজ, লারাক, কেশম ও হেঙ্গাম দ্বীপ এবং ইরানের মূল ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা অতিক্রম করতে হবে।

সামরিক বিশ্লেষক সেড্রিক লেইটন বলেন, প্রণালীর পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত লারাক দ্বীপ নৌযানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এখান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র বা ছোট আক্রমণকারী নৌযান ব্যবহার করে ইরান প্রণালী দিয়ে যাতায়াত কার্যত বন্ধ করে দিতে পারে।

বিমান থেকেও অভিযান চালানো সম্ভব, তবে এসব উড়োজাহাজ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঝুঁকিতে থাকবে। ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের সেনারা প্যারাশুটের মাধ্যমে নামতে পারলেও এতে তাদের সঙ্গে কম সরঞ্জাম থাকবে।

শুস্টারের মতে, এসব দ্বীপে অভিযান দুই দিন থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে এবং সফল হলে তা গুরুত্বপূর্ণ ফল বয়ে আনবে।

তবে দ্বীপ দখলের পরও সেখানে প্রায় ১,৮০০ থেকে ২,০০০ সেনার একটি বাহিনী রাখতে হবে, যাতে ইরান পুনরায় এগুলো ব্যবহার করতে না পারে।

এতে অবশ্য মার্কিন বাহিনী নতুন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। নিউইয়র্কভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সুফান সেন্টার জানিয়েছে, ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলন্দাজ হামলার ঝুঁকি থেকে যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে রূপ নিতে পারে। 

শুস্টারের মতে, এসব দ্বীপে অবস্থানরত বাহিনীর জন্য ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, উপসাগরের নিম্নাংশের দ্বীপগুলো দখল করা খার্গ দ্বীপের তুলনায় কম ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এতে ইরানের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ক্ষতি তুলনামূলক কম হবে। খার্গ দ্বীপের তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন ব্যাহত হতে পারে।

তবে এসব দ্বীপ দখলের রাজনৈতিক জটিলতাও কম নয়। ১৯৭১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত স্বাধীন হওয়ার সময় ইরান দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর থেকে আমিরাত জাতিসংঘে এ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে এবং বিরোধ নিষ্পত্তির প্রস্তাব দিয়েছে।

ইরান দাবি করে, ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকভাবে দ্বীপগুলোর ওপর তাদের অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে আমিরাত বিষয়টি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে নেওয়ার কথাও বলেছে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্বীপগুলো দখল করে, তাহলে তা তাদের জন্য ‘রাজনৈতিক দ্বিধা’ তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেন শুস্টার।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ভবিষ্যতে দ্বীপগুলো ইরানকে ফেরত দেয়, তাহলে আমিরাত ক্ষুব্ধ হতে পারে। আবার আমিরাতকে দিলে নতুন ইরানি সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

সব মিলিয়ে আধুনিক সামরিক পরিকল্পনা অত্যন্ত জটিল—এ কথা উল্লেখ করে শুস্টার বলেন, ‘প্রতিটি বিকল্পেরই নেতিবাচক প্রভাব আছে। কোনো নিখুঁত পরিকল্পনা নেই; আছে শুধু ব্যয়, ঝুঁকি ও প্রভাবের মধ্যে ভারসাম্য।’

সূত্র: সিএনএন