মঙ্গলবার ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মাঘ ২৮ ১৪৩২, ২২ শা'বান ১৪৪৭

ব্রেকিং

দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশের সামান্য উন্নতি হাদির পরিবার পেল ফ্ল্যাটের দলিল ও চাবি ৫০তম বিসিএস প্রিলিমিনারির ফল প্রকাশ, উত্তীর্ণ ১২৩৮৫ জন আমি সরে দাঁড়াতে চাই: ঢাবি উপাচার্য নেত্রকোণায় রাতের আঁধারে ৪ ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নেওয়া যাবে, ব্যবহার নয় গোপন কক্ষে প্রচার পর্ব শেষ, নিরাপত্তার চাদরে দেশ শনিবার পর্যন্ত জনসভা-শোভাযাত্রা-মিছিলে ইসির নিষেধাজ্ঞা জাতীয় নির্বাচন: আজ রাত থেকে ৭২ ঘণ্টা মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ ‘ঝলমলে’ ভোটের দিনের ইশতেহার আবহাওয়া অফিসের ময়মনসিংহে দোকানে ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা, নামিয়ে রাখা হয় শাটার স্কুল-কলেজের এমপিওভুক্তি কার্যক্রম স্থগিত

জাতীয়

দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশের সামান্য উন্নতি

 প্রকাশিত: ১৬:১৪, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশের সামান্য উন্নতি

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বিচারে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশে দুর্নীতি পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে। তাতে তাদের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি ঘটেছে এক ধাপ।

দুর্নীতির এই ধারণা সূচকের (সিপিআই) ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) বিশ্বের ১৮২টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এবার ১৫০ নম্বরে। গতবার এ তালিকায় বাংলাদেশ ১৫১ নম্বরে ছিল।

আবার অধঃক্রম অনুযায়ী (খারাপ থেকে ভালো) বিবেচনা করলে বাংলাদেশ অবস্থান এবার ১৮২ দেশের মধ্যে ত্রয়োদশ, যেখানে গতবছর ছিল চতুর্দশ অবস্থানে।

১০০ ভিত্তিতে এই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর এক বছরে এক পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে ২৪।

এই স্কেলে শূন্য স্কোরকে দুর্নীতির ব্যাপকতার ধারণায় সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ১০০ স্কোরকে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত বা সর্বোচ্চ সুশাসনের দেশ হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

বিশ্বের ১৮২টি দেশ ও অঞ্চলের ২০২৫ সালের দুর্নীতির পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বার্লিনভিত্তিক সংস্থা টিআই মঙ্গলবার তাদের এই বার্ষিক সূচক প্রকাশ করেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এবারের প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক এবং বাংলাদেশের দুর্নীতির পরিস্থিতি তুলে ধরেন।

টিআইবি মনে করছে, এ বছর বাংলাদেশের এক পয়েন্ট স্কোর বৃদ্ধির পেছনে “জুলাই অভ্যুত্থানের ফলে সূচিত গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন অর্জনে অব্যবহিত ইতিবাচক সম্ভাবনার প্রভাব” কাজ করেছে।

“তবে রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ার পরবর্তী বাস্তবতার প্রতিফলন-সংশ্লিষ্ট তথ্যসূত্রের মেয়াদভুক্ত ছিল না। তাই রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি না হওয়ায় আদতে বাংলাদেশের স্কোর ও অবস্থানের খুব একটা ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি।”

গতবারের মতই এ সূচকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে বাজে অবস্থায় আছে কেবল মিয়ানমার ও আফগানিস্তান। ১৬ স্কোর নিয়ে দুটি দেশই ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভাল থেকে খারাপ) রয়েছে তালিকার ১৬৯ নম্বরে।

গতবারের মতই এ সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে ভুটান। ৭১ স্কোর নিয়ে ভুটানের অবস্থান সূচকের ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী ১৮ নম্বরে। এরপর ভারত ও মালদ্বীপ ৯১ (স্কোর ৩৯), শ্রীলঙ্কা ১০৭ (স্কোর ৩৫), নেপাল ১০৯ (স্কোর ৩৪) ও পাকিস্তান ১৩৬তম (স্কোর ২৮) ।

২৪ স্কোরে বাংলাদেশের সঙ্গে সূচকের একই অবস্থানের রয়েছে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও প্যারাগুয়ে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সাল থেকে এই সূচকে বাংলাদেশের সবচেয়ে কম স্কোর ছিল ২০২৪ সালে, ২৩। অর্থাৎ, দুর্নীতি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান এক যুগের মধ্যে তখনই সবচেয়ে বাজে ছিল।

এই সময়ের মধ্যে ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৬, এরপর প্রতিবছর স্কোর কমেছে ১ পয়েন্ট করে। ২০১৭ সালের ২৮ ছিল এই সময়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্কোর।

টিআই এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের সূচকে ১৮২টি দেশের গড় স্কোর গতবারের মতই ৪২। তালিকায় এবার সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে আফ্রিকার দেশ সাউথ সুদান; তাদের স্কোর ৯।

এরপরে রয়েছে যথাক্রমে সোমালিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইয়েমেন, লিবিয়া, ইরিত্রিয়া, সুদান, নিকারাগুয়া, সিরিয়া, উত্তর কোরিয়া ও ইকুয়েটোরিয়াল গিনি

অন্যদিকে সর্বোচ্চ ৮৯ স্কোর নিয়ে গতবারের মতই তালিকায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ডেনমার্ক। এর পরে রয়েছে ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, নিউ জিল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, লুক্সেমবুর্গ, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানি।

টিআইবির সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টাদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও দুর্নীতির বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সাংবাদিকরা। জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক এ সরকারের ‘ব্যর্থতার’ নানা বিষয়ে কথা বলেন।

দুর্নীতি কমাতে না পারার ব্যর্থতার দায় অন্তর্বর্তী সরকারকে দেবেন কিনা–এই প্রশ্নে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের এই প্রত্যাশা ছিল যে এই মেয়াদে তারা একটা ভিত্তি তৈরি করবে। সেখানে অন্তর্বর্তী সরকার অবশ্যই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তারা রাষ্ট্র সংস্কার করে ফেলবে এই প্রত্যাশা কিন্তু আমাদের ছিল না।"

অন্তর্বর্তী সরকারের এই ‘ব্যর্থতার’ সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘পুরনো সংস্কৃতিতে ফিরে আসার’ বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলেন, "সারাদেশে দলবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য, গ্রেপ্তার বাণিজ্য–এগুলো কারা করেছে? আমলাতন্ত্রের মব কারা করেছে?"

রাজনৈতিক মন্ত্রী নন, অরাজনৈতিক উপদেষ্টারাই যে এখন মন্ত্রণালয় চালান, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে একজন সাংবাদিক জানতে চান, আমলাদের দুর্নীতির সঙ্গে উপদেষ্টাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো যোগ পাওয়া গেছে কি না।

ইফতেখারুজ্জামান তখন বলেন, "মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাদের কারো কারো দুর্নীতি আলোচিত হয়েছে। ... সরকার কোনো অবস্থান নেয়নি, প্রকাশ্যে বলেইনি যে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন কিছু টানাহেঁচড়া করেছে, ‘অনুসন্ধান করছি বা করব’ এরকম বলেছে। কিন্তু বাস্তবে কিছু হয়নি।"

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, "জুলাই আন্দোলনের মৌলিক চাহিদাটা কী ছিল? তারা এমন একটা সরকার চেয়েছিল যারা জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে। জনগণের কাছে জবাবদিহিতার জন্য যে প্রস্তাবগুলো বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উত্থাপিত হয়েছিল, সেগুলোর প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে বড় রাজনৈতিক দলগুলো। এবং শেষ পর্যন্ত নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে।

“অর্থাৎ তারা কিন্তু চায় না জনগণের কাছে একটা জবাবদিহিতামূলক সরকার। এই যে দুইটা শক্তির ব্যর্থতা, এসব কারণে কিন্তু আমরা প্রত্যাশিত জায়গায় যেতে পারিনি।"

এক প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার অবশ্যই স্বচ্ছতার চর্চা করতে ব্যর্থ হয়েছে।"

এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, এ সরকার আসার পরপর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের পাঁচটির মত সংস্থা ‘নানা সুবিধা ও লাইসেন্স’ পেয়েছে। কর মাফ, ডিজিটাল ওয়ালেট, জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্সের অনুমোদন, গ্রামীণ ইউনিভারসিটির অনুমোদন- এসবের সঙ্গে ‘কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্টের’ বিষয় আছে। আরো কয়েকজন উপদেষ্টার দুর্নীতির কথা আসছে। এসবের কারণেই সুযোগের উন্নতি ঘটেনি কিনা জানতে চান ওই সাংবাদিক।

জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "এই সরকার স্বার্থের দ্বন্দ্বের জায়গায় আরেকটা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। কোনটা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ আর কোনটা ব্যক্তিগত স্বার্থ–সেই বিভাজন করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। এই দুইটা স্বার্থের মধ্যে বিভাজন করতে না পারলে দায়িত্বই নেওয়া উচিত না।

“আপনারা দায়িত্ব নিয়েছেন, কিন্তু এই বিভাজন করতে পারেননি। ব্যক্তি স্বার্থকে সরকারি স্বার্থের সাথে একাকার করেছেন। ব্যক্তি স্বার্থকে প্রমোট করার জন্য সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।"

তিনি বলেন, "আমাদের এই সরকারের কাছে এমন কোনো প্রত্যাশা ছিল না যে তারা একেবারে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়বে, একেবারে একটা স্বর্গরাজ্য গড়বে। কিন্তু একটা ভিত্তি স্থাপন করার, একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করার সুযোগ ছিল তাদের। দায়িত্ব ছিল এটা‌। সেখানে আসলে তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।"

ইফতেখারুজ্জামান মনে করছেন, “তারা নিজেদের অদক্ষতার কারণে বা নিজেদের কৌশলগত চিন্তাভাবনার কারণে বা সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়ন হবে সেগুলোর বিষয়ে তারা সুনির্দিষ্ট কোনো চিন্তা ভাবনা করে নাই। কাজ করেছে অ্যাডহক ভিত্তিতে। একজন এসে বলেছে যে এটা করতে হবে, আরেকজন আবার যখন বলেছে এটা করা যাবে না, তখন তারা বাদ দিয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, "রাজনৈতিক দলগুলো এখন ভোটের আগে যেসব অঙ্গীকার করছে সেগুলো যদি তারা বাস্তবায়ন করতে পারে তাহলে বাংলাদেশের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ তেমন কোনো কঠিন কাজ নয়।"