মঙ্গলবার ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মাঘ ২১ ১৪৩২, ১৫ শা'বান ১৪৪৭

ব্রেকিং

তীব্র শীতে কিয়েভে আবারও রাশিয়ার হামলা জাতীয় স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা র‌্যাব নাম বদলে হচ্ছে এসআইএফ ভোট: বিটিভিতে দলীয় প্রধানের ভাষণ ফিরছে রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করবে ভারত, মার্কিন শুল্ক কমে ১৮ শতাংশ হচ্ছে কাইয়ুমের প্রার্থিতা নিয়ে নাহিদের রিট খারিজ শবে বরাতে ঢাকায় আতশবাজি-পটকা নিষিদ্ধ ‘এনসিটি’ নিয়ে আন্দোলন: চতুর্থ দিনের কর্মবিরতিতে ‘অচল’ চট্টগ্রাম বন্দর পবিত্র শবে বরাত আজ সারোয়ার আলমগীরের নির্বাচনে বাধা নেই খাগড়াছড়ি: ১৭ বছর নিষ্ক্রিয় সমীরণকে ঘিরে ‘বিতর্ক’ টানা ছয় মাস পতনের ধারায় রপ্তানি আয় রিজার্ভ বেড়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলার ভোরে ভূমিকম্পে কাঁপল দেশ শবে বরাত: অন্যায়-অবিচার পরিহারের আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

জাতীয়

কক্সবাজারে ফুরোচ্ছে ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানি, বাড়ছে পানির বাজার

 প্রকাশিত: ১৪:০৫, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

কক্সবাজারে ফুরোচ্ছে ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানি, বাড়ছে পানির বাজার

কক্সবাজারে ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির স্তর দ্রুত হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশেষ করে পৌরসভা, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় সংকটের চাপ এতটাই বেড়েছে মানুষ বোতলজাত পানির ওপর নির্ভরতা বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।

অনিয়ন্ত্রিত পানি উত্তোলন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও পর্যাপ্ত পুনঃভরাট ব্যবস্থার অভাবে সুপেয় পানির এ সংকট তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)।

ডিপিএইচইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজার পৌর এলাকায় ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির স্তর প্রতি বছর গড়ে ৬ থেকে ১৪ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে। শহরের কলাতলী ও টেকপাড়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এখন ৯০ থেকে ১১০ ফুট গভীরে গিয়ে স্বাদু পানি পাওয়া যাচ্ছে, যা এক দশক আগেও ছিল অনেক কম গভীরে।

পৌরসভার ৩, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমানে তীব্র পানি সংকট চলছে। এসব এলাকার টিউবওয়েলের পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেশি হওয়ায় তা শুধু গোসল ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে।

অন্যদিকে পৌরসভার সরবরাহ করা পানির মান নিয়েও ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরবরাহকৃত পানিতে দুর্গন্ধ থাকে এবং তা পানযোগ্য নয়।

তাই অনেককে দূরবর্তী এলাকা থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে পানি কিনে ব্যবহার করছেন।

টেকপাড়া এলাকার একটি ভবনের মালিক মো. ফরহাদ বলেন, “৪০০ ফুট গভীরে নলকূপ বসিয়েও মিষ্টি পানি পাইনি। বাধ্য হয়ে পৌরসভার পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু সেই পানিতেও দুর্গন্ধ থাকে, এটা পান করার উপযোগী নয়।”

কক্সবাজার শহরে ভাড়াবাসায় থাকা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা নেপাল চন্দ্র বলেন, পানির সংকটের কারণেই তাকে গত এক বছরে তিনবার বাসা পরিবর্তন করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, “গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে শহরে ভাড়া বাসায় থাকি। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে পানির অবস্থা খুব খারাপ। খাবার পানি কিনে খেতে হয়। ব্যবহারের পানিও কোথাও লবণাক্ত হয়ে গেছে, কোথাও আবার আয়রনের সমস্যা।”

শহরের গোলদিঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা সাগর দে বলেন, “১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকেই এখানকার ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এখন বিশুদ্ধ পানি পাওয়া আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুবেল বড়ুয়া বলেন, “২০১১–১২ সালে যখন আমাদের নয়টি পাম্প হাউস স্থাপন করা হয়, তখন ১৫০ থেকে ২০০ ফুট গভীরেই পানি পাওয়া যেত। এখন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ ফুট গভীরেও সুপেয় পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।”

তিনি বলেন, “যে পানি পাওয়া যাচ্ছে তার মান খুব খারাপ ও দুর্গন্ধযুক্ত। অধিকাংশ ব্যক্তিগত নলকূপ অচল হয়ে পড়ায় পৌরসভার ওপর চাপ অনেক বেড়েছে। আমরা সীমিত সংখ্যক কার্যকর পাম্প দিয়ে দিনে দুবার পানি সরবরাহের চেষ্টা করছি।”

কোন উপজেলায় কত গভীরে

ডিপিএইচই কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইবনে মায়াজ প্রামাণিক বলেন, সদর উপজেলার ঝিলংজা ও ভারুয়াখালীতে ৪০-৬০ ফুট, ঈদগাঁওয়ে ২৫-৪৫ ফুট, রামুতে ২০-২৮ ফুট, চকরিয়ায় ২০-৪০ ফুট, পেকুয়ায় ১২-৪০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যাচ্ছে।

এসব এলাকায় প্রতিবছর গড়ে ২ থেকে ৫ ফুট করে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।

মায়াজ প্রামাণিক বলেন, কক্সবাজারে এখনো স্থায়ী পর্যবেক্ষণ কূপ না থাকলেও বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত ইএমসিআরপি প্রকল্পের আওতায় উখিয়া ও টেকনাফে ২৮টি মনিটরিং কূপ স্থাপন করা হয়েছে।

এছাড়া ৩২টি মিনি পাইপ স্কিমে রিয়েল-টাইম ডেটা লগার বসানো হচ্ছে, যা আগামী শুষ্ক মৌসুম থেকে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিসেফের সহায়তায় কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফে ভূগর্ভস্থ পানি পর্যবেক্ষণ প্রকল্পও চলমান রয়েছে।

উখিয়া–টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চাপ

উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। এখানকার ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

মায়াজ প্রামাণিক বলেন, “উখিয়ার রাজাপালং ও পালংখালী ইউনিয়নের কিছু এলাকায় এখন ১০০ থেকে ১১০ ফুট গভীরে গিয়ে পানি পাওয়া যাচ্ছে। এসব এলাকায় প্রতিবছর পানির স্তর ৮ থেকে ১৪ ফুট করে নিচে নামছে।”

কেন নামছে পানি

বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট (বোরি)-এর সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার ও বিভাগীয় প্রধান মো. জাকারিয়া বলেন, কক্সবাজার একটি জটিল হাইড্রোজিওলজিক্যাল এলাকা।

তিনি বলেন, “এখানে আনকনফাইনড ও কনফাইনড-দুই ধরনের ইকুয়েফার রয়েছে। কনফাইনড ইকুয়েফার থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলন করলে পানির প্রবাহ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, ফলে স্তর দ্রুত নিচে নেমে যায়।”

লবণাক্ততা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মহেশখালী চ্যানেল ও বাঁকখালী নদীর পানিতে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। নদীপথে যেসব এলাকায় পানি প্রবাহিত হয়, সেখানে ভূগর্ভস্থ পানিতেও লবণাক্ততার প্রভাব পড়ছে।

ডিপিএইচই সূত্র জানায়, কক্সবাজার জেলায় বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার গভীর ও অগভীর নলকূপ চালু রয়েছে। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক নলকূপ থেকেই অনিয়ন্ত্রিতভাবে পানি উত্তোলনের ফলেও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বেড়েছে।

বাড়ছে বাণিজ্যিক পানি বাজার

ভূগর্ভস্থ পানির সংকটের সুযোগে কক্সবাজারে গত কয়েক বছরে বাণিজ্যিকভাবে পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। জেলায় বর্তমানে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান পরিশোধিত পানি বিক্রি করছে, যার মধ্যে কক্সবাজার শহরেই রয়েছে প্রায় ২০টি প্রতিষ্ঠান।

২০০২ সাল থেকে পানি বিক্রি করে আসা হিমছড়ি ড্রিংকিং ওয়াটারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ার কামাল যিসান বলেন, “২০১৭ সালে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর থেকেই পানির চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার লিটার পানি সরবরাহ করা হয়।”

“সব মিলিয়ে কক্সবাজার শহরে দৈনিক এক লাখ লিটারের বেশি পানি এখন বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হচ্ছে,” বলেন এই ব্যবসায়ী।

ভরসা বাঁকখালীর সারফেস ওয়াটার প্ল্যান্ট

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বাঁকখালী নদীর ওপর নির্মিত সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টকে প্রধান ভরসা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুবেল বড়ুয়া বলেন, প্ল্যান্টটির কমিশনিং কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরের শেষ অথবা জানুয়ারির শুরুতে এটি পুরোপুরি চালু হবে।

ডিপিএইচই কক্সবাজারের সহকারী প্রকৌশলী আবুল মনসুর বলেন, “এই প্ল্যান্টটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০ লাখ লিটার পানি শোধন করতে পারবে। চালু হলে এটি একাই পৌরসভার প্রায় ৫৫ শতাংশ পানির চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবে।”