আওয়ামী লীগকে জয়ী করতে গত ৩ নির্বাচনে গোয়েন্দা সংস্থার অনেকে ছিলেন ‘স্বপ্রণোদিত’: প্রতিবেদন
আওয়ামী লীগের আমলে বিতর্ক তৈরি কেরা তিন নির্বাচনে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনেক কর্মকর্তা ‘স্বপ্রণোদিত হয়ে’ ক্ষমতাসীন দলকে জয়ী করতে কাজ করেছে বলে এ বিষয়ক কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সংস্থাগুলোর অনেকে নির্বাচনে ‘কারচুপির পরিকল্পনার’ পাশাপাশি তা ‘বাস্তবায়নেও অংশ নিয়েছেন’ বলেও এ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
দেশ-বিদেশে নানা কারণে আলোচনায় আসা ওই তিন নির্বাচনের ‘দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড’ তদন্তে গঠিত ‘জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন’ এর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরে নির্বাচনের সব ধরনের কাজে সব গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়।
তবে নির্বাচন কমিশন নিরাপত্তার কাজে যদি তাদের সহায়তা দরকার মনে করে তবে তা নিয়ে পারবে। এজন্য আলাদা বিধান করার পরামর্শ দিয়েছে কমিশন।
অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ, বক্তব্য ও তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনের নেতৃত্বাধীন কমিশন।
‘জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) তদন্ত কমিশন’ শীর্ষক ৩২৬ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আয়োজিত এসব নির্বাচনের ‘নীল নকশা’ বাস্তবায়নে মূলত দুটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে ‘অপব্যবহার করা হয়’ বলে তুলে ধরা হয়।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে’ ওই নির্বাচনের সব বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে ‘প্রশাসনই হয়ে ওঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি’।
প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করে ওই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল বলে কমিশনের প্রতিবেদন হস্তান্তরের দিন বিফ্রিংয়ে বলা হয়েছিল। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকার বিশদ বর্ণনা দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, “ডিজিএফআই এবং এনএসআই গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা সার্বিক নির্বাচনি পরিকল্পনায় মূল ভূমিকা পালন করেন। মাঠ পর্যায়ে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন সংস্থা দুটির আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা- বিভাগ, মহানগর ও জেলা পর্যায়ে কর্মরত পরিচালক, যুগ্ম পরিচালক, উপ-পরিচালক ও সহকারী পরিচালকরা। পরিকল্পনা মাফিক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য আওয়ামী লীগ বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করে। মূলত এই টাকা ব্যয় করা হয় নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের পেছনে।”
গোয়েন্দা সংস্থার কে কোথায় অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বে ছিলেন, সেটির একটি তালিকাও তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে।
এ দুটি সংস্থার সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠিত করতে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদার আদালতে দেওয়া জবানবন্দিও উদ্ধৃত করা হয় প্রতিবেদনে।
বলা হয়, “নুরুল হুদা আদালতে প্রদত্ত জবানবন্দিতে বলেন, তৎকালীন সময়ে গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই এবং ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাটা নিয়ন্ত্রণ করেছিল বলে আমি পরে বুঝতে পারি।”
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে সোমবার (১২ জানুয়ারি) এ প্রতিবেদন হস্তান্তরের দুদিন পর বুধবার এটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর।
বির্তক তৈরি হওয়া সেই তিন নির্বাচনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলা হয়, “২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনেক কর্মকর্তা স্বপ্রণোদিত হয়ে এবং/অথবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে কাজ করেছে।
“তদন্তাধীন তিনটি নির্বাচনেই পুলিশ প্রশাসন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে কাজ করেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নির্বাচনে কারচুপির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করেছেন।”
প্রতিবেদনের নবম অধ্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে লেখা হয়। সেখানে বলা হয়, “২০১৪ সালের নির্বাচনে সরকার তার ইচ্ছমত ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের সহায়তা পায়নি বিধায় ২০১৮ সালের নির্বাচন থেকেই প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগে আওয়ামী লীগ সরকার ডিজিএফআই এবং এনএসআইয়ের কর্মকর্তাদের ব্যবহার করতে শুরু করে।
“পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে এই ভূমিকা আরো জোরালো ও স্পষ্ট হতে শুরু করে।”
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আয়োজিত আলোচিত এ তিন নির্বাচনের মধ্যে বিএনপি ও তার মিত্ররা ২০১৪ ও ১০২৪ সালের ভোট বর্জন করে। এর মধ্যে ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অর্ধেকের বেশি আসনে জিতে যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা।
সবশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে ‘ডামি প্রার্থীর’ ভোট দেখে বাংলাদেশ। আর ২০১৮ সালে বিএনপি নির্বাচনে এলেও তা ‘রাতের ভোট’ হিসেবে অভিযোগের মুখে পড়ে। এ নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা হয়। তিনটি নির্বাচনই ভোটারবিহীন এবং অংশগ্রহণমূলক না হওয়ার আলোচনা ছিল সর্বত্র।
চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এ তিন সংসদ নির্বাচন ঘিরে ওঠা অভিযোগ পর্যালোচনা এবং নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা বিশ্লেষণে পাঁচ সদস্যের কমিটি করে সরকার। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যালোচনায় গত ২৬ জুন এ কমিটি করা হয়।
পরে ক্ষমতা বাড়িয়ে এটিকে কমিশনে রূপান্তর করে অন্তর্বর্তী সরকার। তখন কমিশনকে আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিবেদন ও সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়। পরে কয়েক দফা সময় বাড়ানো হয়।
হাই কোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন কমিশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তদন্ত কমিটিতে ছিলেন সচিব পদমর্যাদার সাবেক কর্মকর্তা শামীম আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক (সুপণ), ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী তাজরিয়ান আকরাম হোসাইন ও নির্বাচন বিশ্লেষক মো. আব্দুল আলীম।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে’ এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনের বিষয়ে ওইদিন বিফ্রিংয় করতে এসে শামীম হাসনাইন বলেন, “২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ এর তিনটা ইলেকশন বটে, কিন্তু এটার মাস্টারপ্লান একটা। এই মাস্টারপ্লানটা হয়েছে ২০০৮ সালের পরে। ওই নির্বাচনের পরে, ওখান থেকে একটা পরিকল্পনা ছিল যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারটা বাতিল করা। পরে ২০১১ সালে ওটা বাতিল করা হয়।
“ওই সময়ে ওটা বাতিল করার পেছনে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছিল। ইভেনচুয়ালি রুলিং পার্টি যতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে যেকোনো স্ট্রাটেজিতে যেকোনোভাবে তার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটা বাধা ছিল। পদ্ধতিটা বাতিল করার পরে যে নির্বাচনটা হল তার সমস্তকিছু স্বচ্ছভাবে আমাদের প্রতিবেদনে এসেছে।”
সুপারিশে কী বলছে কমিশন
‘জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন’ এর দীর্ঘ প্রতিবেদনে অর্ধশত সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।
এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন গঠনে নতুন আইনসহ, সংস্কার কমিশনের একগুচ্ছ সুপারিশ রাখা হয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার কাজে স্বচ্ছতা আনতে বলা হয়েছে, ডিজিএফআই, এনএসআইসহ সকল গোয়েন্দা সংস্থার কাজে স্বচ্ছতা আনা জরুরি যাতে ভবিষ্যতে এসব সংস্থা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হতে পারে।
এ দুটি সংস্থায় নিয়োগ, পদোন্নতি এবং পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন প্ৰণয়ন প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
বেসামরিক প্রশাসনে এ দুই গোয়েন্দা সংস্থার অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে বলে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, সময় স্বল্পতার কারণে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের স্বার্থে ভবিষ্যতে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্ত করে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন সালের নির্বাচনগুলোর অনিয়মের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত এবং দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।