বুধবার ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, মাঘ ১ ১৪৩২, ২৫ রজব ১৪৪৭

আন্তর্জাতিক

তুমুল বিক্ষোভের পরও ইরানের শাসকরা কেন টিকে আছে?

 প্রকাশিত: ১২:০১, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬

তুমুল বিক্ষোভের পরও ইরানের শাসকরা কেন টিকে আছে?

ইরানজুড়ে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা তুমুল বিক্ষোভ আর অনেক বছরের বাইরের চাপ সত্ত্বেও ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটির প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রকগোষ্ঠীর মধ্যে এমন কোনো ফাটলের লক্ষণ নেই, যাতে মনে করা যায় যে দেশটির শাসনব্যবস্থারু পতন ঘটতে যাচ্ছে।

শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির শাসকদের ওপর চার আরও বাড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর দমনাভিযানের পাল্টায় ইরানে সামরিক পদক্ষেপের ধারাবাহিক হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের নিশানা বানিয়েছিল।

এবারও ইরান পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্পের কাছে ‘সব বিকল্পই’ খোলা রয়েছে বলে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন।

তবে রাস্তায় আন্দোলন এবং অন্য দেশের চাপও যদি নেতৃত্বের একটি অংশকে পক্ষ বদলাতে বাধ্য না করে তাহলে ব্যাপক দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও ইরানের এ শাসনব্যবস্থা টিকে যাবে বলেই মনে করছেন মধ্য প্রাচ্যের দুটি সরকারি সূত্র ও দুই বিশ্লেষক।

বিক্ষোভে প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে এক ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন। তিনি বেসামরিক লোকজন ও নিরাপত্তা কর্মীদের মৃত্যুর জন্য ‘সন্ত্রাসীদের’ দায় দিয়েছেন। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এর আগে ইরানে এবারের বিক্ষোভে ৬০০-র মতো মানুষের নিহত হওয়ার খবর দিয়েছিল।

বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী ও বাসজি আধাসামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে ইরানের যে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা কাঠামো, তার কারণে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ছাড়া কেবল বাইরের শক্তিগুলোর চাপ তেহরানকে দমাতে পারবে না বলেই মনে করেন ইরানি-আমেরিকান পণ্ডিত ও আঞ্চলিক সংঘাত এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ভালি নাসর।

বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী ও বাসজি আধাসামরিক বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যাও প্রায় ১০ লাখের কাছাকাছি।

“এ ধরনের ক্ষেত্রে সফলতার জন্য আপনাকে দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় লোকজনের ভিড় রাখতে হবে। আপনাকে রাষ্ট্রের ভেতর ভাঙন ধরাতে হবে। রাষ্ট্রের কিছু অংশ, বিশেষ করে নিরাপত্তাবাহিনীর কিছু অংশকে পক্ষত্যাগ করাতে হবে,” বলেছেন তিনি।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা, ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি অতীতে বেশ কয়েকবারই এমন অস্থিরতার ঢেউ পার করেছেন। ২০০৯ সালের পর দেশটিতে এটি পঞ্চম বড় দাঙ্গা-বিক্ষোভ। যাতে প্রমাণ হচ্ছে, দেশটির সরকার গভীর ও অমীমাংসিত অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখেও স্থিতিশীলতা ও ঐক্য বজায় রাখতে পারছে, বলেছেন মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের পল সালেম।

এর পরিবর্তন ঘটাতে হলে, বিক্ষোভকারীদের আন্দোলনের জোর এমন থাকতে হবে যেন তা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা অনেক কিছুকে অতিক্রম করে যেতে পারে। তাদেরকে শক্তিশালী সব প্রতিষ্ঠান, মোল্লাতন্ত্রের প্রতি অনুগত বিপুল জনগোষ্ঠী এবং ৯ কোটি জনসংখ্যার দেশটির বিস্তৃত ভূখণ্ড ও জনসংখ্যার বৈচিত্র্য বিবেচনায় নিতে হবে, বলেছেন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আয়ার।

তবে টিকে থাকার অর্থ এই নয় যে মোল্লাতন্ত্র স্থিতিশীল হতে পারবে, বলছেন বিশ্লেষকরা।

ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি এখন ১৯৭৯ সাল পরবর্তী সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের একটির মুখোমুখি। বহুমাত্রিক নিষেধাজ্ঞায় তাদের অর্থনীতি এতটাই চাপে আছে যে উদ্ধারের কোনো পথও দেখা যাচ্ছে না। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপের জন্য মুখিয়ে আছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিও এখন তথৈবচ, লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় তাদের ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ মিত্ররাও বেশ দুর্বল।

নাসর বলছেন, তিনি মনে করেন না ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি এখনই ‘পতনের মুখে’ পৌঁছে গেছে তবে তারা এখন এমন এক পরিস্থিতিতে ঢুকে পড়েছে, যেখান থেকে ‘সামনে অগ্রসর হওয়া হবে বেশ কষ্টসাধ্য’।

জিনিসপত্রের বাড়তি দামকে ঘিরে গত ২৮ ডিসেম্বর শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে এবারের বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল, পরে তা মোল্লাতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। বিক্ষোভ দমনে শাসকগোষ্ঠীর ব্যাপক দমনাভিযান রাজনৈতিকভাবে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটির বৈধতা যতটুকু ছিল, তাও মুছে দিয়েছে, বলছেন বিশ্লেষকরা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অধিকারগোষ্ঠী এইচআরএএনএ বলছে, তারা এখন পর্যন্ত বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তাকর্মী মিলিয়ে ৫৭৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হতে পেরেছে। গ্রেপ্তার হয়েছে ১০ হাজারের বেশি।

ইরান এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্ষোভে হতাহত বা গ্রেপ্তারের কোনো তথ্য দেয়নি, রয়টার্সও স্বতন্ত্রভাবে এ সংক্রান্ত কোনো সংখ্যাই যাচাই করতে পারেনি।

সবার চোখ ট্রাম্পের দিকে

বিক্ষোভকারীরা মারা পড়লে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে, ট্রাম্পের এমন হুমকি পরিস্থিতির গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।

মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানি বিক্ষোভকারীদেরকে প্রতিষ্ঠান দখলের তাগাদা দিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘সাহায্য পথে রয়েছে’। ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক বাতিলের কথাও জানিয়েছেন তিনি। এর আগে তিনি শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর শুল্ক চাপানোরও হুমকি দিয়েছেন। চীন তেহরানের শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার।

শনিবার এক ফোনালাপে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন বলে ওই আলাপের সময় উপস্থিত এক ইসরায়েলি সূত্র রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে।

তবে বিশ্লেষক সালেম বলছেন, বিক্ষোভ নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ যতটা না আদর্শিক, তার চেয়ে বেশি কৌশলগত।

লক্ষ্য হতে পারে, রাষ্ট্রকে এতটাই দুর্বল করা যার সুযোগ নিয়ে তাদের কাছ থেকে পরমাণু কর্মসূচিতে লাগাম টানার মতো ছাড় আদায় করা যায়, বলছেন তিনি।

ইরানে ট্রাম্পের লক্ষ্য কি এ প্রসঙ্গে মন্তব্য চেয়ে রয়টার্সের অনুরোধে হোয়াইট হাউস সাড়া দেয়নি। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ কার্যালয় বলেছে, ট্রাম্প ‘যা বলেন তা যে করতে পারেন’ তা তিনি ইরান ও ভেনেজুয়েলায় সামরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেখিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কোনো কোনো রাজনৈতিক মহলে ইরানেও ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’ কার্যকরে আগ্রহ বাড়তে দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন এক কূটনীতিক ও তিন বিশ্লেষক। ওই মহলগুলোর চাওয়া হচ্ছে, ভেনেজুয়েলার মতোই ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রের বাকি স্তরগুলোকে এ ইঙ্গিত দেওয়া যে, তোমরা চাইলে ক্ষমতায় থাকতে পারো তবে আমাদেরকে সহযোগিতা করতে হবে।

তবে ইরানের ক্ষেত্রে এমন মডেলের বাস্তবায়ন যে কষ্টসাধ্য হবে তা অনেকেই মানছেন। দশকের পর দশক ধরে বিস্তার লাভ করা নিরাপত্তা কাঠামো, গভীর প্রতিষ্ঠানগত ঐক্য এবং বিস্তৃত ভূখণ্ড ও জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশটি এসবের জন্য বড় বাধা।

দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা ও দুই বিশ্লেষক রয়টার্সকে বলেছেন, বিদেশি সামরিক পদক্ষেপ ইরানের জাতিগত ও সম্প্রদায়গত বিভাজনও আরও তীব্র করে তুলতে পারে, বিশেষ করে কুর্দি ও সুন্নি বালুশ অঞ্চলে, যেখানে প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

আরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মার্কিন সামরিক শক্তি এখন অন্য জায়গায় ব্যস্ত, তবে চাইলে তা দ্রুত সরিয়ে নিয়ে আসা যাবে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।

থিংক ট্যাঙ্ক ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ডেভিড ম্যাকোভস্কি বলছেন, ট্রাম্প যদি কোনো পদক্ষেপ নেন, তাহলে সেটা দীর্ঘ সামরিক অভিযান না হয়ে দ্রুত, আচমকা কোনো পদক্ষেপ হবে বলেই তার ধারণা। সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতেও দেখা গেছে, রিপাবলিকান এ প্রেসিডেন্ট স্থলে সেনা না পাঠিয়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতেই বেশি আগ্রহী যা পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

“তিনি এমন কিছু খুঁজছেন যা গেম চেঞ্জার হতে পারে, কিন্তু সেটা কী?,” বলেন ম্যাকোভস্কি।

ট্রাম্পের হাতে যেসব বিকল্প রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তার মধ্যে আছে সমুদ্রে ইরানি তেল পরিবহনে বাধা সৃষ্টি থেকে শুরু করে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে সামরিক বা সাইবার আক্রমণ চালানো। কিন্তু এ সব পদক্ষেপেই গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে।

বল প্রয়োগ ছাড়াও কিছু পদক্ষেপের কথা ট্রাম্প ভাবতে পারেন। যেমন, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বহাল রাখতে স্টারলিংকের মাধ্যমে ইরানে ইন্টারনেট পুনরায় চালু করা।

ট্রাম্প যদি কোনো পদক্ষেপ নেন, তাহলে তা কী হতে পারে—রয়টার্সের এমন প্রশ্নের জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউস ও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

“ট্রাম্প কখনো কখনো হুমকিকে কাজে লাগান সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে, কখনো প্রতিপক্ষদের দূরে রাখতে, আবার কখনো এ সঙ্কেত দিতে যে তিনি সত্যিই হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এখানে যে কোনটা খাটবে, তা আমরা জানি না,” বলেছেন ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ম্যাকোভস্কি।