পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক জোরদার হবে, আশা জয়শঙ্করের
বাংলাদেশে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি ‘স্বাভাবিক’ হলে এ অঞ্চলে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক ‘আরও জোরদার হবে’ বলে আশা প্রকাশ করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
গত ২ জানুয়ারি চেন্নাইয়ে এক অনুষ্ঠানে সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
‘ভালো প্রতিবেশী’ ও ‘খারাপ প্রতিবেশী’র মধ্যে পার্থক্য টেনে জয়শঙ্কর বলেন, যেসব দেশ সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখে, ভারত তাদের সমর্থন ও সহায়তা দেয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি মহামারীর সময় টিকা কূটনীতি এবং পরে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সঙ্কটে সহায়তা করার কথা মনে করিয়ে দেন।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, যেসব প্রতিবেশী দেশ ‘সন্ত্রাসবাদ’ চালিয়ে যায়, তাদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার ভারতের রয়েছে।
জয়শঙ্করের ভাষায়, এসব বিষয়ে নয়া দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গি পরিচালিত হয় ‘সাধারণ বুদ্ধি ও জাতীয় স্বার্থের’ ভিত্তিতে।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভারত সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় এসেছিলেন জয়শঙ্কর।
চেন্নাইয়ের অনুষ্ঠানে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “বাংলাদেশে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে, হস্তক্ষেপ না করার অবস্থান বজায় রেখে এবং ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করে ভারত কীভাবে তার ‘প্রতিবেশী-প্রথম’ নীতি পুনর্গঠন করছে?”
জবাব দিতে গিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, “মাত্র দুই দিন আগে বাংলাদেশে ছিলাম। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। তবে আপনার প্রশ্নটি আমি একটু বৃহত্তর পরিসরে নিতে চাই—শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো প্রতিবেশী অঞ্চলকে সামনে রেখে।
“আমাদের নানান ধরনের অনেক প্রতিবেশী আছে—এটা আমাদের সৌভাগ্য। আর আমি বিষয়টি খুব সাধারণ বুদ্ধির ভাষায় ব্যাখ্যা করতে চাই। কারণ দিন শেষে কূটনীতি কোনো রকেট সায়েন্স নয়; এটি পরিশীলিত ভাষায় বলা সাধারণ বুদ্ধির কথাই।”
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সাধারণ বুদ্ধিতে আপনি একজন প্রতিবেশীর সঙ্গে কী করেন? যে কোনো প্রতিবেশীর কথাই ধরুন। ধরুন, আপনি কোনো হোস্টেলে থাকেন, সেখানেও আপনার প্রতিবেশী আছে। যদি আপনার প্রতিবেশী আপনার প্রতি ভালো হয়, বা অন্তত আপনার জন্য ক্ষতিকর না হয়, তাহলে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো সদয় হওয়া, তাকে সাহায্য করা। তার কোনো সমস্যা হলে আপনি কিছুটা হলেও সহযোগিতা করতে চান। কিছু না পারলেও অন্তত ‘হ্যালো’ বলেন। বন্ধুত্ব, সম্পর্ক, যোগাযোগ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। একটি দেশ হিসেবেও আমরা ঠিক সেটাই করি।
“তাই আমাদের আশপাশের দিকে তাকালে দেখবেন, যেখানে প্রকৃত অর্থে সুপ্রতিবেশীর অনুভূতি রয়েছে, সেখানে ভারত বিনিয়োগ করেছে, সহায়তা দিয়েছে, ভাগাভাগি করেছে। আপনি কোভিডের কথা বললেন, আমাদের অনেক প্রতিবেশী দেশই প্রথম টিকা পেয়েছিল ভারত থেকে, তখনও আমাদের নিজস্ব টিকাদান কর্মসূচি চলমান ছিল “
এরপর ইউক্রেন যুদ্ধের উদাহরণ টেনে জয়শঙ্কর বলেন, “এই যুদ্ধের কারণে খাদ্যসঙ্কট, জ্বালানি সঙ্কট, আর্থিক সঙ্কট তৈরি হয়েছিল। সে সময়ও আমরা অনেক প্রতিবেশীকে জ্বালানি সরবরাহ করেছি, খাদ্য সহায়তা দিয়েছি, সার দিয়েছি। অর্থাৎ, আমাদের যা ছিল, তা আমরা ভাগ করে নিয়েছি।
“কিছু প্রতিবেশী খুব ব্যতিক্রমী চাপের মধ্য দিয়ে গেছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ শ্রীলঙ্কা। শ্রীলঙ্কা তখন তীব্র আর্থিক সঙ্কটে পড়েছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে তাদের আলোচনা যখন খুব ধীরগতিতে চলছিল, ঠিক তখনই আমরা চার বিলিয়ন ডলারের একটি সহায়তা প্যাকেজ নিয়ে এগিয়ে এসেছিলাম। এটাই একজন ভালো প্রতিবেশী করতে পারে।”
শ্রীলঙ্কা সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়লে ভারত কীভাবে সহায়তা করেছে, সেই তথ্য তুলে ধরে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “যেদিন ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে, সেদিন বিকেলেই আমরা সেখানে ছিলাম। আমাদের জাহাজ তখন বন্দরেই ছিল। আর এক দিনের মধ্যে আমাদের হেলিকপ্টার, উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছে যায়।
“কয়েক দিন পর আমি নিজেও সেখানে গিয়েছিলাম পুনর্গঠন কাজে সহায়তার একটি প্যাকেজ নিয়ে। বিশ্বাস করুন, সাধারণ মানুষ বলে যে তাদের একটি অনুভূতি আছে, ‘ভারতের মত একজন প্রতিবেশী আছে বলেই খারাপ সময়ে আমরা ভরসা পাই।’
“আর এটি সব সময় সঙ্কটের বিষয়ও নয়। বিদ্যুৎ গ্রিড, নৌপথ, সড়ক, বন্দর—এসবের মাধ্যমে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কাজ করা যায়। বাণিজ্য বাড়ানো যায়, পর্যটন সহায়তা করা যায়, চিকিৎসার জন্য মানুষের যাতায়াত সহজ করা যায়। এটাই ইতিবাচক দৃশ্যপট।”
এরপর পাকিস্তানের নাম না নিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, “তবে খারাপ প্রতিবেশীও থাকতে পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের তেমন প্রতিবেশীও আছে। পশ্চিমের দিকে তাকালে দেখবেন—যদি কোনো দেশ ইচ্ছাকৃতভাবে, ধারাবাহিকভাবে এবং অনুশোচনাহীনভাবে সন্ত্রাসবাদ চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের জনগণকে রক্ষা করার অধিকার আমাদের আছে।
“আমরা সেই অধিকার প্রয়োগ করব। কীভাবে করব, তা আমাদের বিষয়। কেউ আমাদের বলে দিতে পারে না, কী করা উচিত বা উচিত নয়। আত্মরক্ষার জন্য যা প্রয়োজন, আমরা সেটাই করব। এটা একেবারেই সাধারণ বুদ্ধির কথা।”
বিষয়গুলো ‘সদিচ্ছার ওপর’ নির্ভর করে মন্তব্য করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বহু বছর আগে আমরা একটি পানি বণ্টন চুক্তিতে (সিন্ধু চুক্তি) সম্মত হয়েছিলাম। এর ভিত্তি ছিল সদিচ্ছার একটি অঙ্গীকার; ভালো প্রতিবেশীর সম্পর্ক বজায় রাখার জন্যই তা করা হয়েছিল।
“কিন্তু যদি দশকের পর দশক ধরে সন্ত্রাসবাদ চলতে থাকে, তাহলে সেখানে আর ভালো প্রতিবেশীর সম্পর্ক থাকে না। আর ভালো প্রতিবেশীর সম্পর্ক না থাকলে তার সুফলও পাওয়া যায় না। আপনি একদিকে বলবেন, ‘আমার সঙ্গে পানি ভাগ করুন’, আবার অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদ চালিয়ে যাবেন—এই দুটো একসঙ্গে চলে না।”
জয়শঙ্কর বলেন, “ভালো প্রতিবেশী ও খারাপ প্রতিবেশীর পার্থক্য থাকলেও একটি সামগ্রিক প্রতিবেশী নীতি রয়েছে। তবে আমার মনে হয়, আমাদের অধিকাংশ প্রতিবেশীই এখন উপলব্ধি করছে যে ভারতের প্রবৃদ্ধি আজ একটি জোয়ারের মত; ভারত এগোলে প্রতিবেশীরাও আমাদের সঙ্গে এগোবে। এতে তাদের সামনে আরও অনেক সুযোগ তৈরি হবে।
“এই বার্তাটিই আমি বাংলাদেশে নিয়ে গিয়েছিলাম। তারা এখন নির্বাচনের পথে এগোচ্ছে—আমরা তাদের জন্য শুভকামনা জানাই। আর আশা করি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এই অঞ্চলে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক আরও জোরদার হবে।”