রোববার ২৯ মার্চ ২০২৬, চৈত্র ১৪ ১৪৩২, ১০ শাওয়াল ১৪৪৭

ব্রেকিং

ময়মনসিংহে অবৈধভাবে মজুদ করা ২৪ হাজার লিটার জ্বালানি জব্দ চব্বিশকে স্বাধীনতার সমান করলে ‘বিপর্যয় হবে’: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী জ্বালানি সরবরাহে ডিপোতে নতুন সময়সূচি দিল বিপিসি ঈদের পর প্রবাসীদের কর্মস্থলে ফেরা কঠিন, ফ্লাইট বিপর্যয়ে দুর্ভোগ শুধু খার্গ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নজর ইরানের আরও সাত দ্বীপে সংসদে শব্দযন্ত্রের বিভ্রাট ‘অন্তর্ঘাত’ কি না, তদন্তে কমিটি এই পোশাকে পুলিশ সন্তুষ্ট নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল হুতিরা ইরানিরা চার সপ্তাহ ধরে ‘ডিজিটাল অন্ধকারে’ সরকার বলছে সংকট নেই: পাম্প কোথাও বন্ধ, কোথাও লম্বা লাইন দেশের পেট্রল পাম্পে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত দৌলত‌দিয়ায় বাসডু‌বি: চতুর্থ দি‌নেও উদ্ধার অ‌ভিযান চলছে প্রায় ৪০ দিনের ছুটি শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে রোববার বেড়েছে সোনার দাম, প্রতিভরি ২৩৭০১২ টাকা সৌদি আরবে বিমানঘাঁটিতে ইরানি হামলায় ১২ মার্কিন সেনা আহত নেপালের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি গ্রেপ্তার

ইসলাম

শত্রু যখন হেদায়েতের পথ দেখায়

 প্রকাশিত: ১২:০৯, ২৮ মার্চ ২০২৬

শত্রু যখন হেদায়েতের পথ দেখায়

ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা একসময় ছিলেন ইসলামের কঠিন শত্রু, কিন্তু পরে আল্লাহ তাদের হূদয় খুলে দিয়েছেন। আরবের বিখ্যাত কূটনীতিক, মিসর-বিজয়ী আমর ইবনুল আস (রা.) তাদের মধ্যে অন্যতম। আসলে আল্লাহ যখন কারো হেদায়াত চান, তখন শত্রুতাও পথ দেখায়। নিয়ে যায় হেদায়েতের সবুজ আঙ্গিনায়। 

খন্দকের যুদ্ধ শেষ হয়েছে মাত্র। কুরাইশদের তাবুগুলোতে তখন পরাজয়ের বিষাদ। কিন্তু আমর ইবনুল আস তখন অন্য কিছু ভাবছিলেন। তীক্ষ বুদ্ধিসম্পন্ন এই মানুষটি বুঝতে পারছিলেন, সময় বদলে যাচ্ছে। আরবের মরুঝড় এখন মদিনার দিকেই বইছে। আমর তাঁর অনুগত কয়েকজনকে ডেকে বললেন, ‘দেখো, মুহাম্মাদের প্রভাব এখন আসমান ছুঁইছুঁই। আমার মাথায় একটা পরিকল্পনা আছে।’

সবাই উত্সুক হয়ে তাকাল। আমর বললেন, ‘আমরা আবিসিনিয়ায় নাজ্জাশির দরবারে চলে যাব। যদি মুহাম্মাদ আরবে জিতে যায়, তবে আমরা রাজার আশ্রয়ে শান্তিতে থাকব। আর যদি কুরাইশরা জেতে, তবে আমরা তো তাদের আপন লোকই। তখন ফিরে আসব।’

বুদ্ধিটা সবার মনে ধরল। উপহার হিসেবে মরুভূমির সেরা চামড়া নিয়ে তারা নাজ্জাশির দরবারে পৌঁছালেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে আমরের চোখ ছানাবড়া! দেখলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দূত আমর ইবন উমাইয়া আদ-দামরি নাজ্জাশির কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসছেন। আমরের ভেতরে তখনো পুরনো শত্রুতার আগুন। তিনি ভাবলেন, ‘এই তো সুযোগ! নাজ্জাশির কাছ থেকে একে চেয়ে নিয়ে যদি হত্যা করতে পারি, তবে কুরাইশদের কাছে বীর হয়ে ফিরব।’

রাজার সামনে গিয়ে আমর কুর্নিশ করলেন। উপহারের চামড়া দেখে রাজা খুশি হলেন। আমর নিচু স্বরে বললেন, ‘মহারাজ, আপনার দরবার থেকে যে লোকটা বেরিয়ে গেল, সে আমাদের চরম শত্রুর দূত। ওকে আমার হাতে তুলে দিন, আমি ওকে শেষ করে দিতে চাই।’

কথাটা শেষ হতেই ঘটল এক অভাবনীয় কাণ্ড। শান্ত নাজ্জাশি রাগে ফেটে পড়লেন। ঠিক আগ্নেয়গিরির মতো। রাগে-ক্ষোভে তিনি নিজের নাকে এক জোরালো আঘাত করে বসলেন। আমরের মনে হল, রাজার নাক বুঝি ভেঙ্গেই গেল। তার বুকের ভেতর তখন রীতিমতো কাঁপুনি শুরু হয়েছে। রাজা গর্জে উঠে বললেন, ‘আমর, তোমার সাহস তো কম নয়! তুমি আমার কাছে সেই মহামানবের দূতকে চাচ্ছ, যাঁর কাছে সেই ‘নামুসুল আকবার’ (জিবরাঈল আ.) আসেন, যিনি মুসা (আ.)-এর কাছে আসতেন? তুমি তাঁকে হত্যা করতে চাও?’

নাজ্জাশির সেই গর্জন আর চেহারা দেখে আমরের মনে হলো মাটি দুই ভাগ হয়ে গেলে তিনি তাতে লুকিয়ে যেতেন। ভয়ে কাঁপতে কাঁদতে বললেন, ‘মহারাজ, আপনি কি সত্যিই বলছেন যে তিনি আল্লাহর নবী?’

নাজ্জাশি পরম মমতায় বললেন, ‘আফসোস আমর! আমার কথা শোনো। তাঁর অনুসরণ করো। আল্লাহর কসম, তিনি সত্যের পথেই আছেন। মুসা (আ.) যেমন ফেরাউনের ওপর বিজয়ী হয়েছিলেন, মুহাম্মাদও তেমনি সবার ওপর বিজয়ী হবেন।’

সেই এক মুহূর্ত। নাজ্জাশির দরবারে বসেই আমরের হূদয়ের সব অন্ধকার কেটে গেল। তিনি বললেন, ‘মহারাজ, আপনি কি আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে ইসলামের উপর বাইয়াত করাবেন?’

নাজ্জাশি হাত বাড়িয়ে দিলেন। আবিসিনিয়ার রাজদরবারে এক বিজাতীয় রাজার হাতেই ইসলামের বাইআত নিলেন আরবের তুখোড় কূটনীতিবিদ আমর ইবনুল আস। এরপর সোজা মদিনার পথ। পথিমধ্যে দেখা হলো মহাবীর খালিদ বিন ওয়ালিদের সাথে। আমর জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় চললে আবু সুলাইমান’

খালিদ বললেন, ‘আর কতকাল সত্যকে অস্বীকার করব আমর? পথ তো এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। আমি ইসলাম গ্রহণ করতে যাচ্ছি।’

আমর মুচকি হেসে বললেন, ‘বন্ধু, আমিও তো সেই একই পথের যাত্রী!’

মদিনায় যখন তাঁরা পৌঁছালেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চেহারা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আমর এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমি এই শর্তে বাইআত হতে চাই যে আমার অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) এক চিলতে হাসি দিয়ে বললেন, ‘আমর, তুমি কি জানো না, ইসলাম গ্রহণ করলে পেছনের সব গুনাহ মুছে যায়? তুমি কি জানো না, হিজরত করলে আগের সব পঙ্কিলতা ধুয়ে সাফ হয়ে যায়?’

ব্যস! এভাবেই একজন চরম শত্রু হয়ে গেলেন ইসলামের অতন্দ্র প্রহরী। অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফেরার এক মহাকাব্যিক যাত্রা।

প্রিয় পাঠক, আমর ইবনুল আস (রা.)-এর এই জীবন-বদল কি আপনাকেও ভাবাচ্ছে? সত্যকে চেনার জন্য কখনো কখনো শুধু একটি সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়?!

কে সেই আমর ইবনুল আস (রা.)? যারা জানেন না, তাদের খুব জানতে ইচ্ছে করে—তাই না?

ইতিহাসের পাতা উল্টালে এমন কিছু মানুষের দেখা মেলে, যাঁদের মেধা আর প্রজ্ঞা যেন মরুভূমির তপ্ত বালুর চেয়েও প্রখর। আমর ইবনুল আস (রা.) ছিলেন তেমনই একজন। তিনি কেবল একজন মানুষ ছিলেন না, ছিলেন আরবের এক অনন্য ধাঁধা, সেরা কূটনীতিক, তুখোড় বক্তা আর এক কুশলী রাজনীতিক।

আমর (রা.) ছিলেন কুরাইশ বংশের বুনিয়াদ। একটা সময় তিনি ইসলামের ঘোর বিরোধী থাকলেও মহান আল্লাহ তাঁর জন্য লিখে রেখেছিলেন এক ভিন্ন মহাকাব্য। হুদাইবিয়ার সন্ধি যখন আরবে শান্তির সুবাতাস ছড়িয়ে দিচ্ছে, ঠিক তখনই এই তীক্ষ্ণ ধীসম্পন্ন মানুষটি সত্যের শীতল ছায়া খুঁজে পান এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।

তিনি ছিলেন বিজয়ের মহানায়ক। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় তো বটেই, এমনকি খলিফাদের যুগেও তিনি ছিলেন সমরকৌশলের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সেনাপতি হিসেবে তাঁর দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। ইতিহাসের অন্যতম মহিমান্বিত অধ্যায় ‘মিসর বিজয়’ তাঁর হাত ধরেই পূর্ণতা পেয়েছিল খলিফা ওমর (রা.)-এর শাসনকালে। যে কায়রো শহর আজ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে আজও তাঁর বীরত্বের ঘ্রাণ পাওয়া যায়।

বছরের পর বছর ইসলামের ঝাণ্ডা হাতে ছুটে চলা এই মহান ব্যক্তিত্ব হিজরি ৪৩ সালে (৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে) কায়রোতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে তিনি চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু রেখে গেছেন এক অদম্য সাহসের গল্প।