শনিবার ২৮ মার্চ ২০২৬, চৈত্র ১৪ ১৪৩২, ০৯ শাওয়াল ১৪৪৭

ব্রেকিং

ময়মনসিংহে অবৈধভাবে মজুদ করা ২৪ হাজার লিটার জ্বালানি জব্দ চব্বিশকে স্বাধীনতার সমান করলে ‘বিপর্যয় হবে’: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী জ্বালানি সরবরাহে ডিপোতে নতুন সময়সূচি দিল বিপিসি ঈদের পর প্রবাসীদের কর্মস্থলে ফেরা কঠিন, ফ্লাইট বিপর্যয়ে দুর্ভোগ শুধু খার্গ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নজর ইরানের আরও সাত দ্বীপে সংসদে শব্দযন্ত্রের বিভ্রাট ‘অন্তর্ঘাত’ কি না, তদন্তে কমিটি এই পোশাকে পুলিশ সন্তুষ্ট নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল হুতিরা ইরানিরা চার সপ্তাহ ধরে ‘ডিজিটাল অন্ধকারে’ সরকার বলছে সংকট নেই: পাম্প কোথাও বন্ধ, কোথাও লম্বা লাইন দেশের পেট্রল পাম্পে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত দৌলত‌দিয়ায় বাসডু‌বি: চতুর্থ দি‌নেও উদ্ধার অ‌ভিযান চলছে প্রায় ৪০ দিনের ছুটি শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে রোববার বেড়েছে সোনার দাম, প্রতিভরি ২৩৭০১২ টাকা সৌদি আরবে বিমানঘাঁটিতে ইরানি হামলায় ১২ মার্কিন সেনা আহত নেপালের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি গ্রেপ্তার

জাতীয়

ঈদের পর প্রবাসীদের কর্মস্থলে ফেরা কঠিন, ফ্লাইট বিপর্যয়ে দুর্ভোগ

 প্রকাশিত: ১৮:৪৭, ২৮ মার্চ ২০২৬

ঈদের পর প্রবাসীদের কর্মস্থলে ফেরা কঠিন, ফ্লাইট বিপর্যয়ে দুর্ভোগ

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইটের শিডিউল বিপর্যয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বিদেশগামী প্রবাসী যাত্রীরা। যুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বিত হওয়ায় অনেক যাত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকে সকালে এসে গভীর রাত পর্যন্তও নিশ্চিত হতে পারছেন না আদৌ সেদিন তাদের ফ্লাইট ছাড়বে কি না।

বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের অভিযোগ, শুধু ফ্লাইট বিলম্ব নয়— সঠিক তথ্যের অভাব, বসার অপ্রতুল ব্যবস্থা, প্রচণ্ড গরম, মশার উপদ্রব এবং স্বজনদের নিয়ে দীর্ঘসময় অনিশ্চয়তায় থাকার কারণে তাদের ভোগান্তি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার (২৬ ও ২৭ মার্চ) সরেজমিনে দেখা যায়, বিমানবন্দরের বিভিন্ন অংশে বিদেশগামী যাত্রী ও তাদের স্বজনরা উদ্বিগ্নভাবে অপেক্ষা করছেন। কারো হাতে লাগেজ, কারো চোখে মুখে ক্লান্তি, কারো কণ্ঠে ক্ষোভ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যগামী শ্রমজীবী প্রবাসীদের মধ্যে উৎকণ্ঠা ছিল বেশি। তাদের অনেকেই কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্ধারিত সময় সামনে রেখে দেশে পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটিয়ে ফিরছিলেন।

কিন্তু বিমানবন্দরে এসে পড়েছেন নতুন অনিশ্চয়তায়।

সকাল থেকে রাত, তবুও ফ্লাইটের নিশ্চয়তা নেই
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে আসা জহির মিয়া নামের একজন যাত্রী জানান, তার নির্ধারিত ফ্লাইট ছিল সন্ধ্যা ৭টায়। বিকেল ৪টার মধ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছাতে বলা হলেও তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিকেল ৩টার মধ্যেই এসেছেন। কিন্তু রাত গড়ালেও ফ্লাইটের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু জানাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ফ্লাইট ছিল কিন্তু যুদ্ধের কারণে সেটি কয়েক দফা পরিবর্তন হয়েছে। বিকেল ৪টায় আসতে বলা হয়েছিল, আমরা ৩টার মধ্যেই চলে আসি। এখন বলা হচ্ছে দাম্মাম থেকে যে বিশেষ ফ্লাইটটি আসার কথা ছিল, সেটি এখনো ছাড়েনি। তাই তারা আমাদের মালামালও নিতে পারছে না। এখন রাত ১২টা ৫০ মিনিটে ফ্লাইটের কথা বলা হচ্ছে।

কিন্তু কিছুই নিশ্চিত নয়।’

 

ক্ষোভ প্রকাশ করে এই প্রবাসী বলেন, বিমানবন্দরের কর্মকর্তারাও স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না। আমাদের বলা হচ্ছে, থাকলে থাকেন, না হলে চলে যান। কিন্তু আমরা যাব কোথায়? সকাল থেকে আমরা এ অবস্থায় আছি।

যাত্রীদের একটি বড় অভিযোগ, ফ্লাইট বিলম্ব বা বাতিলের বিষয়ে তাদের সময়মতো স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। কেউ কাউন্টার থেকে এক ধরনের তথ্য পাচ্ছেন, আবার কিছুক্ষণ পর সেটি বদলে যাচ্ছে। এতে করে অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ আরও বাড়ছে।

খোলা জায়গায় অপেক্ষা, গরম ও মশায় অতিষ্ঠ যাত্রীরা
অপেক্ষমাণ যাত্রীদের অনেকে জানান, দীর্ঘসময় বসে থাকার মতো পর্যাপ্ত আরামদায়ক জায়গা নেই। কেউ মেঝেতে বসে, কেউ দাঁড়িয়ে, কেউবা লাগেজে হেলান দিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। যাত্রীদের সঙ্গে আসা স্বজনদেরও একইভাবে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

রফিকুল ইসলাম নামের এক প্রবাসী বলেন, ‘খোলা জায়গায় বসে আছি। প্রচণ্ড গরম, তার সঙ্গে মশার উপদ্রব। সবমিলিয়ে খুব কষ্টে আছি। সকাল ১০টায় বাড়ি থেকে বের হয়েছি আর বিকেল ৩টা থেকে বিমানবন্দরে বসে আছি। এখনো জানি না কখন ফ্লাইট ছাড়বে।’

এ ধরনের অনিশ্চয়তা শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, মানসিক চাপও বাড়িয়ে দেয় বলে তিনি জানান। এই প্রবাসী আরও যোগ করেন, বিদেশে কাজে ফেরার আগেই এত দুশ্চিন্তা নিতে হচ্ছে। আমরা নিজেরাও কষ্টে আছি, সঙ্গে যারা এগিয়ে দিতে এসেছে, তারাও চরম ভোগান্তিতে আছে।

দাম্মাম থেকে ফ্লাইট না আসায় বাতিল বিশেষ ফ্লাইট
বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ আরেক যাত্রী জানান, তার গালফ এয়ারের বিশেষ ফ্লাইটটি সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত ফ্লাইটটি দাম্মাম থেকে না আসায় সেটি বাতিল হয়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লাইট ছাড়বে। কিন্তু পরে জানানো হলো, দাম্মাম থেকে ফ্লাইটটি না আসায় আর উড্ডয়ন সম্ভব হচ্ছে না। এখন পরবর্তী সময় সম্পর্কেও তারা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না।’

এই প্রবাসী আরও বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে আত্মীয়-স্বজনরা এসেছেন। তারা অনেক দূর থেকে এসেছেন। এখন যদি রাত ১২টা বা তারও পরে ফ্লাইট হয়, তাহলে তাদের বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভোর হয়ে যাবে।’

তার কণ্ঠে ক্ষোভ ও হতাশা ছিল স্পষ্ট, ‘একজন প্রবাসী দেশ ছাড়ার আগেই যদি এমন হয়রানির মধ্যে পড়ে, তাহলে তার মানসিক চাপ কতটা বাড়ে— সেটা বুঝতে হবে।’

‘প্রবাসীরা রেমিট্যান্স যোদ্ধা, তাদের দিকে নজর দিন’
অপেক্ষমাণ যাত্রীদের অনেকে ভোগান্তি কমাতে সরকারের প্রতি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের দাবি, যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইটে সমস্যা তৈরি হতেই পারে, কিন্তু যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ, বসার ব্যবস্থা, অপেক্ষার পরিবেশ এবং তথ্য সরবরাহে সংশ্লিষ্টদের আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।

একজন যাত্রী বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করব, প্রবাসীদের দিকে একটু নজর দিন। আমরা রেমিট্যান্স যোদ্ধা, দেশের জন্য কাজ করি। অন্তত আমাদের বসার জন্য ভালো ব্যবস্থা, সঠিক তথ্য আর মানবিক ব্যবহারটা নিশ্চিত করা হোক।’

আরেকজন বলেন, ‘এই বিষয়গুলো কঠোরভাবে দেখা উচিত। শুধু টিকিট কেটে বিমানবন্দরে এলেই দায়িত্ব শেষ না। যাত্রীদের প্রতি কর্তৃপক্ষের আরও দায়িত্ব আছে।’

রফিকুল ইসলাম নামের এক প্রবাসী বলেন, খোলা জায়গায় বসে আছি। প্রচণ্ড গরম, তার সঙ্গে মশার উপদ্রব। সবমিলিয়ে খুব কষ্টে আছি। সকাল ১০টায় বাড়ি থেকে বের হয়েছি আর বিকেল ৩টা থেকে বিমানবন্দরে বসে আছি। এখনো জানি না কখন ফ্লাইট ছাড়বে।

বাতিল ৭৯৭টি ফ্লাইট
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলমান যুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক রুটে বড় ধরনের শিডিউল বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮টি ফ্লাইটের মধ্যে ৭৯৭টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। অর্থাৎ, নির্ধারিত ফ্লাইটের বড় একটি অংশই পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।

ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বের পেছনে মূলত তিনটি কারণকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে– যুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাতজনিত অনিশ্চয়তা, বিশেষ ফ্লাইটের আগমন বিলম্ব বা বাতিল হওয়া এবং আন্তর্জাতিক রুটে সার্বিক শিডিউল বিপর্যয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যগামী কিছু ফ্লাইটের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অন্য গন্তব্য থেকে উড়োজাহাজ সময়মতো না পৌঁছানোয় ঢাকায় নির্ধারিত ফ্লাইটও পিছিয়ে যাচ্ছে বা বাতিল হচ্ছে।

সঠিক তথ্য না পাওয়ায় বাড়ছে ক্ষোভ
যাত্রীদের একটি বড় অভিযোগ, ফ্লাইট বিলম্ব বা বাতিলের বিষয়ে তাদের সময়মতো স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। কেউ কাউন্টার থেকে এক ধরনের তথ্য পাচ্ছেন, আবার কিছুক্ষণ পর সেটি বদলে যাচ্ছে। এতে করে অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ আরও বাড়ছে।

একজন যাত্রী বলেন, ‘যদি শুরুতেই বলা হতো ফ্লাইট হবে না বা দেরি হবে, তাহলে আমরা অন্তত আত্মীয়-স্বজনদের কষ্ট দিতাম না। কেউ কেউ ছোট বাচ্চা নিয়ে এসেছে, কেউ বৃদ্ধ মা-বাবাকে সঙ্গে করে এনেছেন। এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা খুবই কষ্টকর।’

যাত্রীদের দাবিগুলো কী
ভুক্তভোগী যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সরকারের কাছে এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপ চান। সেগুলো হলো– ফ্লাইটের সময়সূচি যতটা সম্ভব নিয়মিত ও পূর্বনির্ধারিত রাখা, বিলম্ব বা বাতিল হলে এসএমএস বা ঘোষণার মাধ্যমে দ্রুত ও সঠিক তথ্য দেওয়া, দীর্ঘসময় অপেক্ষমাণ যাত্রীদের জন্য বসার উপযুক্ত ব্যবস্থা করা, গরম ও মশার উপদ্রব কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া, প্রবাসী ও তাদের পরিবারের জন্য মানবিক সহায়তা ডেস্ক চালু করা এবং শিডিউল বিপর্যয় পরিস্থিতি মোকাবিলায় কঠোর তদারকি ও সমন্বয় জোরদার করা।

প্রবাসীদের যাত্রার আগে নতুন দুশ্চিন্তা
ঈদ শেষে অনেক প্রবাসী পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দেখা করে কর্মস্থলে ফেরার জন্য বিমানবন্দরে আসেন ভারাক্রান্ত মন নিয়ে। কিন্তু সেই বিদায়ের মুহূর্ত আরও কঠিন হয়ে উঠছে, যখন ফ্লাইটের অনিশ্চয়তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমানবন্দরে বসে থাকতে হয়।

অনেক যাত্রী মনে করেন, পরিবারকে বিদায় দেওয়া এমনিতেই কঠিন। তার ওপর যদি ফ্লাইট নিয়ে এমন দুশ্চিন্তা থাকে, তাহলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে হয়।