হুমকির মুখে মধ্যপ্রাচ্যের হাজার বছরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন
প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি মধ্যপ্রাচ্য। হাজার বছর ধরে এখানে বহু সভ্যতার উত্থান ও পতন হয়েছে। সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয়, আসেরীয়, আখেমেনীয়, সাসানীয়, ফিনিশীয়, কানানীয়,উগারিত, দিলমুন, মাগান, গেরহা, দাদান, নাবাতীয় আরো কত সভ্যতার স্মৃতি ধারণ করে আছে এই ভূমি। কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত বেশির ভাগ নবী-রাসুলের আগমনও হয়েছিল এই অঞ্চলে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের সাংস্কৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু অবিরাম যুদ্ধ ও সংঘাত এই অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোকে বার বার হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ সেই হুমকিকে বহু মাত্রায় বৃদ্ধি করেছে। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তেহরানের গুলিস্তান প্যালেস থেকে লেবাননের তিন হাজার বছরের প্রাচীন টাইর (আরবি সুর) নগরীর রোমান খিলান, ইরাকের ব্যাবিলনের ভেঙ্গে পড়া প্রাচীর, ইসরায়েল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নবী-রাসুলদের অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন এখন সরাসরি যুদ্ধাঞ্চলের মধ্যে পড়ে গেছে। ফলে ইতিহাসের এসব অমূল্য সম্পদ স্থায়ী ক্ষতির মধ্যে পড়তে পারে।
ইরানের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানজুড়ে অন্তত ৫৬টি জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘গুরুতর কাঠামোগত ক্ষতির’ শিকার হয়েছে। শুধু তেহরানেই ১৯টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের বুকে আছে বিশ্বের অসংখ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। যার মধ্যে ইউনেস্কো স্বীকৃত পারসেপোলিস, পাসারগাদে ও ইস্পাহানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। হাজার বছরের প্রাচীন এসব নিদর্শন শুধু ইরানের নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির সম্পদ। অথচ সম্প্রতি ইসরায়েলি বিমান হামলায় তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ গুলিস্তান রাজপ্রাসাদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত ভবনটি কাজার আমলের রাজপ্রাসাদ এবং বর্তমানে তা জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃ ত হয়।
ইরানের প্রাচীন নগরী ইস্পাহানের একাধিক স্থাপনা ইসরায়েল ও মার্কিন বাহিনীর বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। যার মধ্যে আছে ১৭ শতকে নির্মিত চেহেল সুতুন নামক একটি সাফাভি আমলের প্যাভিলিয়ন, যা ইউনেস্কো তালিকাভুক্ত পারস্য বাগানের অংশ। এছাড়াও প্রাচীন মসজিদে জামেহ, নকশে জাহান স্কয়ার ও আলী কাপু প্যালেসও ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইসফাহানের গভর্নর মেহদি জামালিনেজাদ সামাজিক মাধ্যমে বলেন, ‘ইসফাহান কোনো সাধারণ শহর নয়, এটি ছাদবিহীন একটি জাদুঘর। আফগান যুদ্ধ, মুঘল আক্রমণ বা এমনকি ইরান-ইরাক যুদ্ধ কোনো সময়েই এমন কিছু ঘটেনি। এটি সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। যে শত্রুর নিজস্ব সংস্কৃতি নেই, সে সংস্কৃতির প্রতীকগুলোর মূল্য বোঝে না। যে দেশের ইতিহাস নেই, তারা ইতিহাসের নিদর্শনের প্রতি সম্মান দেখায় না।’
এছাড়াও চলমান যুদ্ধে খুররামাবাদ ভ্যালির ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকার কাছাকাছি ভবনগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই এলাকায় পাঁচটি প্রাগৈতিহাসিক গুহা ও একটি শিলা আশ্রয়স্থল রয়েছে, যা খ্রিস্টপূর্ব ৬৩,০০০ বছর আগের মানব বসতির প্রমাণ দেয়। সানানদাজ ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম কুর্দি শহর। এই শহরের ১৯শ শতকের বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক প্রাসাদ, যেমন সালার সাঈদ ম্যানশন ও আসেফ ভাজিরি ম্যানশনের দরজা, রঙিন কাঁচের জানালা এবং অন্যান্য স্থাপত্য উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই প্রাসাদগুলো বর্তমানে কুর্দি জাদুঘর ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
গত ৬ মার্চ ইসরায়েল লেবাননের প্রাচীন নগরী টাইরে হামলা চালায়। অথচ এর মাত্র দুই দিন আগে লেবাননের সাংস্কৃতিক মন্ত্রী গাসসান সালামি ইউনেস্কোর মহাপরিচালক খালিদ এল-ইনানিকে ফোন করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ থেকে লেবাননের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় হস্তক্ষেপের অনুরোধ করেন। টাইর পৃথিবীর প্রাচীনতম মানব বসতি ও নগরীগুলোর একটি। এই শহরটি একাধিক প্রাচীন সভ্যতার সাক্ষ্য ধারণ করে আছে।
এই যুদ্ধে শুধু ইসরায়েলের প্রতিপক্ষ দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, বরং ইসরায়েলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও হুমকির মুখে পড়েছে। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত ইসরায়েলের দুটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েলের ভেতর সংবাদ সংগ্রহে নানা ধরনের বিধি-নিষেধ থাকায় ঠিক কতগুলো স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার সঠিক হিসাব জানা কঠিন।
দ্য নিউ আরব অবলম্বনে