দায়িত্বের জবাবদিহিতায় ইসলামী নীতমালা
মানুষের জীবন কেবল ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া, স্বপ্ন কিংবা সাফল্যের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি অবস্থান আর প্রতিটি দায়িত্ব ইসলামের দৃষ্টিতে এক একটি আমানত। পিতা হওয়া, সন্তান হওয়া, স্বামী বা স্ত্রী হওয়া, এমনকি সমাজে প্রভাব বিস্তারকারী একজন সাধারণ মানুষ হওয়াও দায়িত্বের আওতার বাইরে নয়। ইসলাম মানুষের এই দায়িত্ববোধকে কেবল নৈতিক উপদেশ দিয়ে শেষ করেনি; বরং একে আখিরাতের জবাবদিহির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত করে দিয়েছে।
এই জবাবদিহির দর্শন সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই হাদিসে, যেখানে তিনি গোটা মানবসমাজকে এক বাক্যে দায়িত্বশীল ঘোষণা করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক। আর প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। নেতা (ইমাম) একজন রক্ষক; সে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। পুরুষ তার পরিবারের রক্ষক; সে তার পরিবারের লোকজন সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের রক্ষক; তাকে তার রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। ৃ অতএব, তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে প্রশ্নের সম্মুখীন হবে।’ (বুখারি, হাদিস: ২৪০৯)
পবিত্র কোরআনের আলোকে দায়িত্ব ও জবাবদিহি
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দেন; আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দিতে ‘ (সুরা আন-নিসা, আয়াত : ৫৮)
উপরের বর্ণিত হাদিস এই আয়াতের মর্মার্থেরই বিস্তৃত রূপ। অন্য আয়াতে দায়িত্বের জবাবদিহির চূড়ান্ত বাস্তবতা তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘সেদিন অবশ্যই তোমাদেরকে নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা আত-তাকাসুর, আয়াত : ৮)
ইমাম কুরতুিব (রহ.) বলেন, ‘এই আয়াতের নিয়ামত শব্দে কেবল ধন-সম্পদ অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারের সকল সুযোগও এর অন্তর্ভুক্ত।’ (তাফসির আল-কুরতুবি)
‘রক্ষক’ শব্দের গভীর তাত্পর্য
হাদিসে ব্যবহূত আরবি শব্দ ‘রাঈ’ বা রক্ষক শব্দটি সাধারণ পাহারাদার অর্থে নয়। ইমাম নববি (রহ.) তাঁর শরহে মুসলিমে বলেন, ‘রাঈ’ বলতে বোঝানো হয়েছে; যিনি অধীনস্থদের কল্যাণ, ন্যায়বিচার, শিক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব বহন করেন এবং অবহেলার জন্য দায়ী হন ‘ অর্থাত্ ইসলাম দায়িত্বকে কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়; বরং নৈতিক, আত্মিক ও মানবিক দায়িত্ব হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
শাসক থেকে পরিবার: দায়িত্বের পরিধি
এই হাদিসে রাসুল (সা.) দায়িত্বকে চারটি স্তরে ভাগ করে বুঝিয়েছেন, প্রথমত, শাসক বা নেতা। তার দায়িত্ব কেবল শাসন নয়; বরং ন্যায়বিচার, জুলুম প্রতিরোধ এবং জনগণের অধিকার রক্ষা। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো বান্দাকে যদি আল্লাহ জনগণের নেতৃত্ব প্রদান করেন, আর সে কল্যাণ কামনার সঙ্গে তাদের তত্ত্বাবধান না করে, তাহলে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।’ (বুখারি, হাদিস : ৭১৫০)
দ্বিতীয়ত, পরিবারের অভিভাবক। পুরুষকে পরিবারের রক্ষক হিসেবে ঘোষণা করে ইসলাম তাকে আর্থিক উপার্জনের পাশাপাশি ঈমানি ও নৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা আত-তাহরিম, আয়াত : ৬)
তৃতীয়ত, স্ত্রী ও নারী। স্ত্রীকে ঘরের রক্ষক ঘোষণা করে রাসুল (সা.) নারীকে পরিবার গঠনের কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন। ইবনে হাজর আল-আসকালানি (রহ.) বলেন, ‘এই হাদিস প্রমাণ করে, নারীর ওপর অর্পিত দায়িত্ব ইসলামে সম্মানজনক আমানত।’ (ফাতহুল বারি)
চতুর্থত, সন্তান ও উত্তরাধিকারী। সম্পদের রক্ষক হিসেবে সন্তানকে উল্লেখ করে ইসলাম শিখিয়েছে, আমানতদারিতা বয়স বা পদমর্যাদার বিষয় নয়; বরং বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়।