বৃহস্পতিবার ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, মাঘ ১৬ ১৪৩২, ১০ শা'বান ১৪৪৭

ব্রেকিং

গ্রামের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চাই: তারেক রহমান জামায়াতে ইসলামীর নারী সমাবেশ স্থগিত বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের বেড়া: পশ্চিমবঙ্গকে জমি ছাড়ার আদেশ আদালতের শেরপুরের ঘটনায় ওসি-ইউএনও প্রত্যাহার আমের জন্য হিমাগার হবে: রাজশাহীতে তারেক আগে একাত্তর নিয়ে মাফ চান, পরে ভোট চান: মির্জা ফখরুল তারা কেন আগে থেকেই লাঠিসোঁটা জড়ো করল: শেরপুরের সংঘাত নিয়ে বিএনপি হাদি হত্যা: ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ নির্বাচন: রিটার্ন জমার সময় বাড়ল আরও এক মাস শেরপুরের ঘটনায় উদ্বেগ, সংযমের আহ্বান অন্তর্বর্তী সরকারের শেরপুরে সংঘর্ষে জামায়াত নেতার মৃত্যু: থমথমে ঝিনাইগাতী-শ্রীবরদী জামায়াতের আমিরের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বৈঠক প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সংকটের কার্যকর সমাধান: প্রধান উপদেষ্টা ভোটের পোস্টার মুদ্রণ নয়: ছাপাখানাকে ইসি সোনা-রুপার দামে টানা রেকর্ড, ভরিতে বাড়ল ১৬ হাজার

রাজনীতি

আল জাজিরার সাক্ষাৎকারে নারীদের নিয়ে যা বলেছেন জামায়াত আমির

 প্রকাশিত: ২১:১৩, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬

আল জাজিরার সাক্ষাৎকারে নারীদের নিয়ে যা বলেছেন জামায়াত আমির

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, কোনো নারী কখনো তার দলের আমির হতে পারবেন না, কেননা তার ভাষায়, আল্লাহ নারীদের ‘সেভাবে’ সৃষ্টি করেননি এবং এটা ‘পরিবর্তনযোগ্য নয়’।

তার দাবি, আসন্ন নির্বাচনে কোনো দলই ‘উল্লেখযোগ্য সংখ্যক’ নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি, কারণ এটা ‘বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক বাস্তবতা’ এবং বেশিরভাগ দেশই নারী নেতৃত্বকে ‘বাস্তবসম্মত মনে করে না’।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তার এমন বক্তব্য আসে। সাক্ষাৎকারটি বৃহস্পতিবার সম্প্রচার করা হয়।

ঢাকায় জামায়াত আমিরের বাসায় বসে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন। প্রায় আধা ঘণ্টার সাক্ষাৎকারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে জামায়াতের নারী নীতি নিয়ে নানা প্রশ্ন করেন তিনি।

জবাব দিতে গিয়ে নারীদের বিষয়ে তাদের পুরনো অবস্থানই তুলে ধরেন শফিকুর রহমান।

প্রশ্ন করতে গিয়ে শ্রীনিবাসন জৈন বলেন, “আপনি নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কারণ কোরআনের নীতিমালা অনুযায়ী তারা সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ২১ শতকে কেন আপনি এমন একটি প্রস্তাব দেবেন?

উত্তর দিতে গিয়ে শফিকুর রহমান দাবি করেন, এরকম কোনো কথা তিনি বলেননি।

শ্রীনিবাসন তখন বলেন, জামায়াত আমিরের দেওয়া ওই প্রস্তাব নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।

শফিকুর রহমান তখন বলেন, “আমি বলেছি—একজন মা, একই সঙ্গে যখন তিনি শিশুর দেখভাল করেন, শিশুর যত্ন নেন এবং একই সময়ে যদি তাকে একজন পুরুষের মত একই দায়িত্ব, একই সময় ধরে কাজ করতে হয়, তাহলে সেটা ন্যায়সঙ্গত হয় না।

“অন্তত স্তন্যদানকালীন সময়ের জন্য। যখন তিনি সন্তান ধারণ করছেন বা সন্তানের যত্ন নিচ্ছেন—এই সময়ে তাদের সম্মান দেখানো উচিত। আমরা আসলে দেখেছি, কিছু বোন, কিছু নারী যখন মনে করেন, যে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তখন তারা চাকরি ছেড়ে দেন। কিন্তু যদি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর্মঘণ্টা কমানো হয়… এটা সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। এটা একটি ঐচ্ছিক সুযোগ।”

শ্রীনিবাসন তখন বলেন, “আপনি বলতে চাইছেন, আপনি কেবল স্তন্যদানকালীন সময়ের জন্যই কর্মঘণ্টা কমানোর কথা বলছেন?”

জামায়াত আমির তখন বলেন, “মূলত সেটাই। তবে যদি কোনো নারী সিদ্ধান্ত নেন, ‘না, আমি আট ঘণ্টাই কাজ করব’, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। এটা তার জন্য একটি বিকল্প।”

কিন্তু বাংলাদেশের আইনে ছয় মাতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ যে আগে থেকেই আছে, সে কথা মনে করিয়ে দেওয়া হলে শফিকুর রহমান বলেন, ছয় মাস সময় যথেষ্ট বলে তারা মনে করেন না, কেননা একটি শিশু ছয় মাসে বড় হয়ে যায় না।

শ্রীনিবাসন বলেন, “আপনি নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, আপনার এই প্রস্তাবটি মানুষ খুব ভিন্নভাবে নিয়েছে। এ নিয়ে প্রতিবাদও হয়েছে। বাংলাদেশের নারীরা রাস্তায় নেমেছেন। তারা বলছেন, কাজ করবেন নাকি ঘরে থাকবেন—এটা তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত…।”

শফিকুর তখন বলেন, “তারা বিষয়টি ভুল বুঝেছেন। ভাই, আমি… আমি তাদের সম্মান করি।”

প্রশ্ন শেষ হয়নি জানিয়ে শ্রীনিবাসন তখন বলেন, “তারা বলছেন, কাজ করবেন নাকি ঘরে থাকবেন—এটা তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ। তাদের মতে, আপনার প্রস্তাব নারীদের আবার অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে এবং তাদের স্বাধীনতা সীমিত করবে।”

জামায়াত আমির উত্তরে বলেন, “না, না, অন্ধকারের কোনো প্রশ্নই নেই। এটা তাদের প্রতি সম্মান দেখানোর বিষয়। অন্ধকারের কোনো প্রশ্ন নেই। আমরা কখনো এমন কথা বলিনি, এমনটা ভাবিও না।

“বিষয়টা কী? হ্যাঁ, কিছু অ্যাক্টিভিস্ট আছেন, যাদের আদর্শ আমাদের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। তারা রাস্তায় নামতে পারেন। আমরাও তাদের সম্মান করি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে আমরা শ্রদ্ধা করি। তারা আসতে পারেন, কিন্তু তারা সমাজের খুবই নগণ্য একটি অংশ।”

বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে নারীর অবদানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে শ্রীনিবাসন জৈন বলেন, “সেখানে ৫০ শতাংশের বেশি নারী। এই জায়গায় পৌঁছাতে তাদের দশকের পর দশক সংগ্রাম করতে হয়েছে। নারীরা কেবল মা হবেন, সন্তান লালন-পালন করবেন—এই ধারণার বিরুদ্ধে তারা লড়েছেন। পুরুষেরাও সেই দায়িত্ব নিতে পারেন। আশঙ্কা হচ্ছে, আপনার এই প্রস্তাব সময়কে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। এখন নিয়োগকর্তারা নারীদের নিয়োগ দিতে চাইবেন না, কারণ তাদের কর্মঘণ্টার ওপর বিধিনিষেধ থাকবে।”

শফিকুর উত্তরে বলেন, “এটা আপনার আশঙ্কা, কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। আমার বক্তব্য দেওয়ার পর আমি কয়েকটি পোশাক কারখানা পরিদর্শন করেছি।

“আমি কোথাও এমন কিছু দেখিনি। কোথাও না। বরং তারা স্বস্তি বোধ করছে। তারা বলছে, ‘হ্যাঁ, আমরা দুই বছর বা আড়াই বছর পর আবার চাকরিতে ফিরতে পারব।’ কিন্তু যখন তারা এখান থেকে বাদ পড়ে যান, তখন আর ফিরে আসতে পারেন না।“

আল জাজিরার সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, যারা প্রতিবাদ করেছেন, তারা সংখ্যায় কম বলে তাদের বক্তব্য জামায়াত আমির নাকচ করে দিচ্ছেন কি না।

জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, “জি। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।”

শ্রীনিবাসন জৈন তখন বলেন, “আপনি বললেন, আপনি নারীদের সম্মান করেন। এবং আপনি বিশ্বাস করেন, নারীরা নেতৃত্বের জায়গায় যেতে পারেন। আমি কি জানতে চাইতে পারি, এই সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী কতজন নারী প্রার্থী দিয়েছে?”

জামায়াত আমির বলেন, “না। একজনও না। তবে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়েছি, যেখানে আমাদের বোনেরা প্রার্থী হয়েছেন এবং বিজয়ীও হয়েছেন। ভবিষ্যতে আমরা সংসদ নির্বাচনেও এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।”

তাহলে এই নির্বাচনে একজন নারী প্রার্থীও কেন নেই, সেই প্রশ্ন রাখা হয় শফিকুর রহমানের সামনে।

জবাবে তিনি বলেন, “আপনি দেখবেন, অন্য কোনো দলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী প্রার্থী নেই। কারণ এটা বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। আমরা এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।”

একদিন কোনো নারী জামায়াতের আমির হতে পারেন কি না, সেই প্রশ্ন রাখা হয় শফিকুর রহমানের সামনে।

জবাবে তিনি বলেন, “এটা সম্ভব না। এটা সম্ভব না। কারণ আল্লাহ প্রত্যেককে নিজস্ব সত্তা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আপনি কখনো সন্তান ধারণ করতে পারবেন না, আর আমরা কখনো শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারব না। এটা সৃষ্টিকর্তার দেওয়া পার্থক্য। নারী ও পুরুষের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে, যা আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। সেগুলো আমরা পরিবর্তন করতে পারি না।”

শ্রীনিবাসন জৈন তখন বলেন, কেউ যদি মা হন, সন্তান লালন-পালন করেন, তবু কেন তিনি জামায়াতের মত একটি সংগঠনের প্রধান হতে পারবেন না, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।

শফিকুর রহমান বলেন, “এটা পরিবর্তনযোগ্য নয়। তাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। কিছু ক্ষেত্রে তারা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। শারীরিক অসুবিধা থাকে, আপনি জানেন।”

এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, “বুঝছেন না কেন? একজন মা যখন সন্তান জন্ম দেন, তখন কীভাবে তিনি দায়িত্ব পালন করবেন? এটা কি সম্ভব? কখনোই না। আল্লাহ সবকিছু সবচেয়ে ভালো জানেন।”

আল জাজিরার সাংবাদিক তখন মনে করিয়ে দেন, জামায়াত আমির এমন কথা বলছেন এমন এক দেশে, যেখানে গত তিন দশকে নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

শফিকুর রহমান তখন বলেন, “আমরা তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করিনি। আগেই বলেছি, আমরা অসম্মান করি না।

“কিন্তু আপনি যদি বিশ্বকে দেখেন, যেসব দেশ উন্নত হয়েছে, সেখানে কতজন নারী সামনে এসেছেন?”

শ্রীনিবাসন তখন প্রশ্ন করেন, “আপনি বলছেন, নারীরা একটি সংগঠনের প্রধান হতে পারবেন না, অথচ তারা ১৬–১৭ কোটি মানুষের দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন? তাহলে স্পষ্টতই নারীরা নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা রাখেন।”

এ প্রশ্নের উত্তরে জামায়াত আমির দাবি করেন, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই নারী নেতৃত্বকে “বাস্তবসম্মত মনে করে না” এবং এটাই “বিশ্বের বাস্তবতা।”

শফিকুর রহমান এও দাবি করেন, নারী নেতা ছিলেন–এমন দেশের সংখ্যা “অল্প”।

শ্রীনিবাসন তখন মনে করিয়ে দেন, এই জামায়াতই ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপির সঙ্গে জোট সরকারে ছিল। একজন নারী, খালেদা জিয়া তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভালো করেছিলেন কি না, শফিকুর রহমানের কাছে তা জানতে চাওয়া হয়।

জবাবে তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে নেতা বানানো বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্ত, জামায়াতের নয়।

“আমাদের দলীয় সিদ্ধান্তকে সম্মান করা উচিত। আমরা কারও ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে পারি না।”