আলেমদের রাজনীতি কতদূর এগিয়েছে
বাংলাদেশের আলেমসমাজের রাজনীতি আজ এক গভীর আত্মপর্যালোচনার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
অনিবার্যভাবে প্রশ্ন উঠছে—এই রাজনীতি কি সত্যিই নিজের শক্তি, আদর্শ, দর্শন ও সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর ভর করে একটি স্বতন্ত্র, কার্যকর ও মর্যাদাসম্পন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নিতে সক্ষম হবে?!
নাকি আলেমরা একটি আদর্শিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভের পরিবর্তে বারবার ব্যবহূতই হতে থাকবে? কখনো অন্যের তোষামোদে, কখনো লেজুড়বৃত্তির করুণ বাস্তবতায়?!
বিদ্যমান বাস্তবতা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।
আলেমদের রাজনৈতিক তত্পরতা এখনো গঠনমূলক, সুসংহত ও সুপরিকল্পিত চরিত্র অর্জন করতে পারেনি।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই রাজনীতি আবর্তিত হয় তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, মৌসুমি উত্তেজনা ও খণ্ডিত আবেগকে কেন্দ্র করে; যেখানে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি, কৌশলগত চিন্তা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সুস্পষ্ট পরিকল্পনার ঘাটতি প্রকট।
অনেক সময় তা জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক সংকীর্ণ বৃত্তে আবদ্ধ থাকে—যেখানে গঠনমূলক কর্মসূচি বা নীতিগত স্পষ্টতার চেয়ে আবেগী স্লোগান ও সাময়িক উত্তেজনাই প্রাধান্য পায়।
আলেমসমাজের অভ্যন্তরে আছে নানামুখী বিভাজন, বহুবিধ মতধারা এবং বহু রাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু এই বহুত্বের মাঝেও বিস্ময়করভাবে অনুপস্থিত একটি অভিন্ন ন্যূনতম রাজনৈতিক কর্মসূচি, সুস্পষ্ট ও পর্যায়ভিত্তিক রোডম্যাপ এবং সময়োপযোগী নীতিমালা।
ইসলাম কায়েম ও শরিয়া বাস্তবায়নের স্লোগান সর্বত্র উচ্চারিত হলেও, এই মহত্ লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য জাতির সামনে এখনো উপস্থাপিত হয়নি কোনো কার্যকর কাঠামো, বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ কিংবা বাস্তবায়নযোগ্য কৌশল—যা রাষ্ট্রয় বাস্তবতা, সামাজিক কাঠামো ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাস্তব অভিজ্ঞতা আরও একটি বেদনাদায়ক সত্য উন্মোচন করে—
আলেমদের রাজনীতির বৃহত্ অংশ আজও গঠনমূলক রাষ্ট্রচিন্তার পরিবর্তে সমালোচনাকেন্দ্রিক মানসিকতায় আচ্ছন্ন।
নিজেদের ভেতরেই চলে পারস্পরিক দোষারোপ, খিস্তিখেউড়, মতানৈক্যকে শত্রুতায় রূপান্তর এবং ফতোয়াভিত্তিক অবস্থানযুদ্ধ; আবার অন্যদিকে বৃহত্ সেক্যুলার রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতি অতিরিক্ত আপস, তোষামোদ কিংবা লেজুড়বৃত্তির অভিযোগও উপেক্ষা করা যায় না।
এর ফলে নীতিনিষ্ঠতা, আত্মমর্যাদা ও নেতৃত্বের নৈতিক উচ্চতা—যা আলেমসমাজের রাজনীতির স্বাতন্ত্র্য হওয়ার কথা—ক্রমশই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয়ে যায়—আলেমদের রাজনীতি যদি আবেগ, স্লোগান ও প্রতিক্রিয়াশীলতার সীমা অতিক্রম করে সুপরিকল্পিত, জবাবদিহিমূলক ও ভবিষ্যত্-সংবেদী রাষ্ট্রচিন্তায় রূপান্তরিত না হয়,
তবে স্বনির্ভর ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা তার জন্য অত্যন্ত দুরূহই থেকে যাবে।
আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনার সাহস, কাঠামোগত সংস্কারের দৃঢ় সংকল্প এবং কেবল অতীতের গৌরবচর্চা নয়—ভবিষ্যত্ নির্মাণের যোগ্যতা অর্জনের দৃপ্ত অঙ্গীকার।
লেখক : অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।