স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ লাগানো মহাপাপ
ইসলামে স্বামী স্ত্রী সম্পর্ক পারস্পরিক পরিপূরক, প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্যে পাষ্পরিক ভালোবাসা ও অনুগ্রহ।’ (সুরা রূম, আয়াত: ২১)
এ মেলবন্ধনের তত্পর্য
‘কোনো কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারী
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।’
(কাজী নজরুল ইসলাম)
পবিত্র কোরআনের শিক্ষায় স্বামী স্ত্রী পরষ্পর ‘ভূষণতুল্য’। পোশক যেমন লজ্জা নিবারণের উপায়, তেমনি আকর্ষণের অবলম্বন। পারষ্পরিক অনুভূতি, মনের কথা মুখে প্রকাশ, প্রিয়তমাকে রোমান্টিক কথকতায় আকৃষ্ট করা প্রিয়নবী (সা.)-এর আদর্শ। সংসারের ঘানিটেনে ক্লান্ত দম্পতি নিজের যত্ন, নিজের সৌন্দর্য সম্পর্কে বেখেয়াল হয়ে পড়েন। অথচ প্রিয়নবীর (সা.) শিক্ষা- ‘আমি আমার স্ত্রীদের জন্য এমনই পরিপাটি থাকা পছন্দ করি, যেমন আমি তাদের ক্ষেত্রে সাজগোজ করে থাকা পছন্দ করি।’ (বাইহাকি)
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে নারীর প্রতি সহিংসতায় বাংলাদেশের অবস্থান উর্ধ্বমুখী। ঘটনার ৮০% হয় পরিবারের মধ্যে এবং এর ৮৪% শাশুড়ি, ৬৩% ননদের হাতে। মুসলিম পরিবার দর্শন হলো প্রীতিময় সহাবস্থান। কিন্তু এতে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ান অপনজনেরাই! এখানেই স্পষ্ট অব্যক্ত হাহাকার
‘আমার শিয়রে শাশুড়ি ঘুমায় জ্বলন্ত নাগিনী
হায়রে জ্বলন্ত নাগিনী
আমার পৈথানে ননদী শুয়ে দুরন্ত ডাকিনী...
...বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে নলের বেড়া
ওরে হাত বাড়ায়া দিতে পান
কপাল দেখি পোড়া’!
মহান আল্লাহর কাছে চরম অপছন্দনীয় বিষয় এবং জঘন্যতম কবিরা গুনাহ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ লাগানো। জাদুর ক্ষতিকর দিক প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আছে, ‘তাদের (হারুত মারুত)-এর কাছে তারা এমন জাদু শিখতো যা দিয়ে স্বামী স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো যায়...।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১০২)
খারাপ কাজে উত্সাহ না দেওয়া ইসলামের বিঘোষিত নীতি- ‘...মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না’। (সুরা মায়িদা, আয়াত: ০২)
কিন্তু স্বার্থান্বেষী জঘন্য মানুষ স্বামী স্ত্রী বিরোধ লাগানোকে পৌঁছিয়েছে শিল্পের পর্যায়ে। এদের সম্পর্কে প্রিয়নবী (স.)-এর সতর্কবার্তা, ‘কোনো নারী যেন নিজ স্বার্থের জন্য এবং বিয়ে বসার জন্য তার বোনের তালাক না চায়...।’ (বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ)
শয়তানের দৌরাত্ম বোঝাতে প্রিয়নবী (সা.) বলেন, ‘ফিতনা ফাসাদ ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য শয়তান তার বাহিনী পাঠায়। ...শয়তানের বাহিনী যখন ফিরে আসে প্রত্যেকে সরদারের কাছে নিজ নিজ রির্পোট পেশ করে... এরই মাঝে এক সৈন্য সরদারের সামনে গিয়ে তার রির্পোট পেশ করে ‘এভাবে—আমি সুকৌশলে সূক্ষ্মভাবে আমার দায়িত্ব পালন করেছি। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হইনি’। তিনি (সা.) বলেন, শয়তান এ রির্পোট শুনে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে উদ্বেলিত স্বরে বললো, ‘তুমিই আসল কাজ করেছো’! (মুসলিম)
দু’টি প্রাণ ও পরিবারের মেলবন্ধনে সংসার সুখেরস্বর্গ। সংসারধর্ম বজায় রাখা ইবাদততুল্য পূণ্যময় সাধনা। কিন্তু একেবারেই যদি তা অসম্ভব হয়ে ওঠে, তবে তো আফসোস! ভিন্নকথা। বিরুদ্ধ পরিবেশে পারিবারিক শান্তি-স্বস্তির নির্দেশনায় মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যে সব নারীর অবাধ্যতা আশঙ্কা করো, তবে তাদেরকে উপদেশ দাও; শয্যাসঙ্গী হতে বিরত রাখো এবং তাদেরকে শাসন করো (সামান্য প্রহার)। যদি তারা অনুগত হয়ে যায় তবে তাদের জন্য অন্যকোনো বিকল্প খুঁজবে না... আর যদি উভয়ের মধ্যে বিরুদ্ধভাব প্রবল মনে করো তবে পুরুষ ও নারীর পক্ষে একজন করে স্বজনকে মিমাংসাকারী মেনে সমাধানে উদ্দ্যোগী হও। যদি তারা সমাধানে ইচ্ছুক হয়, তবে আল্লাহও তাদের প্রতি অনুকূল হবেন...। (সুরা নিসা, আয়াত: ৩৪, ৩৫ ভাবানুবাদ)
বিচ্ছেদের চরম সিদ্ধান্তের আগে চারটি উপায় অনুসরণের নির্দেশের পাশাপাশি মহান আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যেন দু’পক্ষই আন্তরিক হয়ে সমঝোতায় পৌঁছায়। কেননা, প্রিয়নবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তালাকের চেয়ে অধিক ঘৃণ্য কোনো জিনিস বৈধ করেননি।’ (আবুদাউদ)
বস্তুতঃ পুরুষমানুষ সময়মতো ঘরে না ফিরলে ‘বউ গরম ভাতঠাণ্ডা’-এর ঘটনা ঘটে! বিরোধের কারণ আরও অনেক:
১. অসম দৃষ্টিভঙ্গি- ব্যক্তিত্বের সংঘাত,
২. প্রবাসজীবন এবং পরকীয়া,
৩. জৈবিক আর্থিক অসাম্য,
৪. অবহেলা- সময় না দেওয়া,
৫. পারিবারিক অশিড়্গা, তৃতীয়পক্ষ।
প্রেমময় সম্পর্কের একজন ছাড়া, আরেকজনের জীবন একেবারে শেষ; এমনও নয়। শরত্চন্দ্রের ভাষায় ‘দেবদাস ভাবিয়াছিল তাহাকে ছাড়া পার্বতী মরিয়া যাইবে, অথচ তাহার জ্বরটুকু অব্দি আসিল না!’