যেভাবে বুঝবেন আপনি নবীজি (সা.)-কে ভালোবাসেন
হাদিসে এসেছে, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অন্য সবার চেয়ে প্রিয় হবে।’ হাদিসের উদ্দেশ্য হলো বিবেক-বুদ্ধি অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বাপেক্ষা অধিক প্রিয় হবেন। এর মাপকাঠি এই যে যাবতীয় আদেশ-নিষেধ পালনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ করা এবং বিভিন্ন বিধান পরস্পর বিরোধী হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদেশকে সব বিধানের ওপর প্রাধান্য দেওয়া, যদিও তাঁর প্রতি স্বাভাবিক মহব্বত কম হোক।
অবশ্য চিন্তা করলে বোঝা যায়, নবীজি (সা.)-এর প্রতি প্রত্যেক মুসলমানের স্বাভাবিক ভালোবাসা নিজের মা-বাবা, সন্তান-সন্তুতি এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন সবার চেয়ে অধিকই আছে। কিন্তু তা সর্বদা প্রকাশ পায় না, বিশেষ বিশেষ স্থানেই তা প্রকাশ পেয়ে থাকে। একজন ধনী ব্যক্তি মাওলানা মুজাফফর হুসাইন (রহ.)-এর কাছে বলল, হজরত! আমার সন্দেহ হয়, রাসুলুল্লাহ (সা.) অপেক্ষা আমার পিতার প্রতি আমার ভালোবাসা অধিক। মাওলানা তখন শুধু এতটুকু বললেন, হতে পারে। অতঃপর ব্যক্তির সন্দেহের উত্তর কার্যত এভাবে প্রদান করলেন যে, কথায় কথায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘটনাবলী বর্ণনা করতে আরম্ভ করলেন। উপস্থিত সবাই বেশ আনন্দ উপভোগ করছিল। আর উক্ত ধনী ব্যক্তিও খুব মত্ত হয়ে তা শুনছিলেন। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আলোচনা সব মুসলমানের জন্যই আনন্দদায়ক হয়ে থাকে। কোনো অবিবেচক যদি বলে যে, এই মুসলমান নবীজি (সা.)-এর আলোচনা করতে নিষেধ করেছেন, তবে তার চেয়ে মিথ্যাবাদী আর কেউ নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আলোচনা থেকে কেউ নিষেধ করতে পারে? তবে হ্যাঁ, মুমিনরা মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধাচরণ থেকে নিষেধ করতে পারেন, যেন তার আলোচনা এমন না হয় যাতে তাঁর বিরোধিতা প্রকাশ পায়।
মাওলানা সাহেব দেখলেন, উক্ত ধনী ব্যক্তি খুব আনন্দের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আলোচনা শুনছেন। অতএব আলোচনার মাঝে হঠাত্ বলে উঠলেন, আচ্ছা, এই আলোচনা বন্ধ করে এখন আপনার পিতার কিছু গুণগান ও প্রশংসা করা হোক। কেননা তিনিও একজন গুণধর লোক ছিলেন। এই শুনতেই ধনী ব্যক্তির চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে গেল এবং বলল, মাওলানা! তাওবা, নবীজি (সা.)-এর সামনে আমার পিতার কি অস্তিত্ব আছে যে, তাঁর আলোচনা করার জন্য নবীজি (সা.)-এর আলোচনা বন্ধ করা হবে? না, তা কখনো হতে পারে না। আপনি নবীজি (সা.)-এর আলোচনাই করতে থাকুন। তখন মাওলানা সাহেব বললেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আলোচনার মাঝে আপনার পিতার আলোচনা আপনার কাছে কেন অপছন্দনীয় হলো? অথচ আপনি বললেন, আমার মনে নবী (সা.)-এর চেয়ে পিতার ভালোবাসা অধিক বলে অনুভব করি! তখন ধনী ব্যক্তি বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলেন এবং বললেন, মাওলানা! আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আজ আমার একটি বড় সন্দেহ দূর করে দিলেন। প্রকৃতপক্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিই আমার ভালোবাসা অধিক। তাঁর তুলনায় পিতার প্রতি আমার ভালোবাসা অতি সামান্যই।
স্বাভাবিক ভালোবাসাও প্রত্যেক মুসলমানের অন্তরে নবীজি (সা.)-এর জন্যই বেশি। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার এই যে, স্বাভাবিক ভালোবাসা কম হলেও কোনো ক্ষতি নেই। জ্ঞানানুগ ভালোবাসা নবী কারিম (সা.)-এর জন্য সবচেয়ে বেশি হওয়া আবশ্যক। যেমন কোনো কোনো লোক স্বভাবত মহানবী (সা.)-এর প্রতি যথেষ্ট মহব্বত লালন করে, তাঁর প্রশংসায় রচিত কবিতা পাঠ করে, মিলাদ অনুষ্ঠান করে, নবীজি (সা.)-এর নাম ও আলোচনায় বেশ স্বাদও পায়। কিন্তু বিবেকসম্মত ভালোবাসা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। সে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদেশের বিরোধিতা করে। এরূপ ব্যক্তির অবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়, তার অবস্থার সংশোধন হওয়া জরুরি।
মাওয়ায়িজে আশরাফিয়া থেকে মো. আবদুল মজিদ মোল্লার ভাষান্তর