বৃহস্পতিবার ০৪ জুন ২০২৬, জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪৩৩

জাতীয়

আদ-দ্বীনে ৬ শিশুর মৃত্যু

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ‘অবহেলা’ ছিল, বলছে তদন্ত কমিটি

 প্রকাশিত: ১৮:৩১, ৪ জুন ২০২৬

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ‘অবহেলা’ ছিল, বলছে তদন্ত কমিটি

রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ‘অবহেলার’ প্রমাণ পাওয়ার কথা বলেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি; দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকা; বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াই শিশুগুলোর মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বৃহস্পতিবার দুপুরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ভিকটিমদের পরিবারবর্গ, চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফদের বক্তব্য পর্যালোচনা এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় তদন্ত কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে গত ২৭ মে ২০২৬ তারিখে ভোর রাত আনুমানিক ৫টা হতে সকাল ৯টার মধ্যে ছয় জন নবজাতকের আকস্মিক মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় উক্ত সময়ে দায়িত্বরত চিকিৎসক না থাকা, নার্স/স্টাফ এবং সর্বোপরি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের অবহেলাজনিত বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।”

কোরবানির ঈদের আগের দিন বুধবার ভোরের দিকে আদ-দ্বীন হাসপাতালের ‘পোস্ট অপারেটিভ’ ওয়ার্ডে থাকা ছয় শিশুর সবাই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং একে একে তাদের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় দেশব্যাপী ‘গভীর উদ্বেগ, শোক ও ক্ষোভের’ সৃষ্টি হয়।

ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই কমিটি বুধবার তাদের প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কমিটির প্রতিবেদনের সারমর্ম সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, তদন্ত কমিটি হাসপাতালটি পরিদর্শন করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে।

  • ভবনের অনুপযুক্ততা: তদন্ত কমিটি হাসপাতালটি পরিদর্শন করে একমত হয়েছে যে, ভবনটি হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয়।
  • ভেন্টিলেশন ও অক্সিজেনের ঘাটতি: সংশ্লিষ্ট পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষ ২ পরিদর্শন শেষে কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, কক্ষটিতে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকায় এবং স্বাভাবিক ভেন্টিলেশন না থাকায় অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল।
  • দায়িত্বে চরম অবহেলা: কমিটি বলছে, কক্ষের দায়িত্বরত সেবিকা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মৃত নবজাতকদের অভিভাবকদের বক্তব্যে প্রমাণিত হয়েছে যে, সেবিকাদের দায়িত্বে ‘চরম অবহেলা ও অসহযোগিতা’ ছিল। নবজাতকের আকস্মিক শারীরিক অবনতির সময় হাসপাতালে সক্রিয় ইমার্জেন্সি মেডিকেল রেসপন্স ছিল না।
  • চিকিৎসায় গাফিলতি: প্রতিবেদনে বলা হয় অভিভাবকদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে সংশ্লিষ্ট নার্স কোনো চিকিৎসককে বিষয়টি অবহিত না করে কালক্ষেপণ করতে থাকেন। এমনকি নবজাতকদের মৃত্যু রোধে প্রয়োজনীয় বা উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়নি।
  • অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি: প্রায় ৯০০ বর্গফুটের ওই কক্ষে সে সময় ১১ জন রোগী, নবজাতক এবং রোগীর স্বজনসহ প্রায় ৫০ জন উপস্থিত ছিলেন, যা ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি।
  • প্রশাসনিক ব্যর্থতা: তদন্ত কমিটি বলছে, হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা হাসপাতাল পরিচালনার প্রাথমিক শর্তাবলি পালনে ‘সক্ষম ছিলেন না’।

মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ

প্রতিবেদন থেকে উদ্ধৃত করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, যদিও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত ছাড়া সুনির্দিষ্ট কারণ বের করা সম্ভব নয়, তথাপি পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও জবানবন্দি থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়–

  • ছোট বদ্ধ কক্ষে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি।
  • দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকা।
  • বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, যা নবজাতক শিশুর দীর্ঘ সময় টিকে থাকার পক্ষে অসম্ভব করে পড়েছিল।

হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষ কোন কোন প্রাথমিক শর্ত লঙ্ঘন করেছে, তদন্ত প্রতিবেদনে তা তুলে ধরা হয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে, ওই পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীদের দেখাশোনার জন্য কোনো চিকিৎসক ছিলেন না।

জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দায়িত্বরত সেবিকাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।

আলো-বাতাস চলাচলের (ভেন্টিলেশন) জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

রোগী, নবজাতক এবং অ্যাটেনডেন্টসহ অতিরিক্ত জনবলের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি।

হাসপাতালটির ভিতরে যত্রতত্রভাবে কাচের ছোট ছোট কক্ষ নির্মাণের ফলে হাসপাতালটি যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে তদন্ত কমিটির কাছে।

তদন্ত কমিটি সুপারিশ করেছে, ভবিষ্যতে বেসরকারি হাসপাতালের নতুন লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভবন পরিদর্শন করে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।

কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? সিদ্ধান্ত রোববার

সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্নোত্তর পর্বে একজন সাংবাদিক জানতে চান, তদন্ত কমিটি কোনা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করেছে কি না, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন দিয়েছে, আপনাদের সামনে পড়ে শোনানো হয়েছে। এখন আমরা কর্তৃপক্ষ এই প্রতিবেদন নিয়ে বসব। বসে বিদ্যমান আইনে যে শাস্তি দেওয়া যায়, আমরা সেটাই করব ইনশাআল্লাহ। আমরা আইন দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।”

আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করার কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘আইন দেখে’ তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন।

একজন সাংবাদিক এ সময় বলেন, “অতীতে দেখেছি মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে আলামত যেন নষ্ট করতে না পারে সেজন্য হাসপাতাল সিলগালা করা হয়। কিন্তু এখানে এতগুলো বাচ্চা মারা গেল, সিলগালা করা হলো না কেন? অনেক আলামত তো লোপাট হয়ে গেছে।”

উত্তর দিতে গিয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “আপনাদেরকে বলি, যে পোস্ট-অপারেটিভ রুমটা নন-ভেন্টিলেটেড ছিল, অক্সিজেনের চাইতে বেশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছিল, ওটা আমরা সিলগালা করে রেখেছি। পুরা হাসপাতালে দুইশর উপরে রোগী আছে। পুরা হাসপাতালটা হঠাৎ আমরা বন্ধ করতে পারি না।

“দুই নম্বর, সেটা আইন বহির্ভূত কাজ। আইন যা বলেছে তদন্ত করতে হবে। তদন্তের পরে বসে শাস্তির বিধান কী আছে, সেটা আমরা নিশ্চিত করব।”

এই প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বিষয়ে নতুন কোনো নির্দেশনা দেবে কি না, সেই প্রশ্ন রাখেন একজন সাংবাদিক।

জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা কন্টিনিউয়াসলি পরিদর্শনে আছি। এই ঘটনার পরে উই আর মোর সিরিয়াস। আমরা আরো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রাখছি। এর মধ্যে গত তিনটি দিন আমরা জুম মিটিং করেছি সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় পরিচালক প্রত্যেকের সাথে এবং এসব ব্যাপারে কড়া নির্দেশ দিচ্ছি। স্বাস্থ্য সেবাকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমাদের ব্যবস্থাপনা কঠোর থেকে কঠোরতর হবে।”

একজন সাংবাদিক মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “আমরা যতটুকু আইন জানি, এটি প্রমাণিত হলে ৫ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা রেজিস্ট্রেশন বাতিলের সুযোগ আছে।”

জবাবে মন্ত্রী বলেন, “প্রথমটা একেবারেই সঠিক না। আমাদের আইনে প্রমাণিত হলে জেল দিতে পারব, কিন্তু জেল দেওয়ার মালিক তো আমরা না। ইট ইজ দ্য কোর্ট, ওইটার জন্য ফৌজদারি একটা মামলা হয়েছে।”

আরেকজন সাংবাদিক বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদনে যেটি প্রমাণিত হয়েছে, তাতে তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত হচ্ছে এই হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়া। এর জন্য আইন নতুন করে দেখার কিছু নাই।”

স্বাস্থ্যমন্ত্রী তখন বলেন, “আপনারা অনেক সময় খুব তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচয় দেন, প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন করলে কর্তৃপক্ষ হুঁশিয়ার হয়ে যায়। আমি ওইটা বলতে চাই না, তবে হোয়াট উই হ্যাভ ডান ইজ দ্য কারেক্ট থিং। আপনি যে প্রশ্নটা করেছেন, এই উত্তরটা আমি দেব না আমাদের সবার স্বার্থে।”

ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্ত হয়নি। তাহলে ময়নাতদন্ত ছাড়া ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ কীভাবে আদালতে প্রমাণ করা সম্ভব হবে, তা জানতে চান একজন সাংবাদিক।

উত্তরে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “ময়নাতদন্ত না হলে বিবাদীরা একটা বেনিফিট পায়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে নবজাতক শিশুদের মায়েদের আবেগঘন মুহূর্ত থাকায় বহু চেষ্টা করেও ময়নাতদন্তে নেওয়া যায় নাই। সিআইডি, পুলিশ বহু চেষ্টা করেছে।

“তবে এটা যে ধরনের সেনসিটিভ কেস, রাতের অন্ধকারের মৃত্যু না। ইট ইজ হাইলি প্রুভেন। কাজেই সম্মানিত আদালত আসামিকে কোনো বেনিফিট দেবেন না, এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।”

আদ-দ্বীন হাসপাতালের যথাযথ অনুমোদন ছিল কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, “পারমিশন ছিল। হাসপাতাল পারমিশনের সময় ঠিকই ছিল। আমাদের কাছে রাজউকের একটা প্রতিবেদন আছে, তারা পরবর্তীতে এগুলি (ভবন কাঠামো) অনেক চেইঞ্জ করেছে। রাজউক তাদের মত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”

ঢাকাসহ সারা দেশে এরকম অনেক হাসপাতাল আছে, সেগুলোর ব্যাপারে সরকার কী করবে জানতে চান একজন সাংবাদিক।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা প্রত্যেকটা হাসপাতালই এটাকে সামনে রেখে পরিদর্শন করব এবং এই ধরনের ঘটনা পেলে আমরা ওগুলি সংশোধন করার চেষ্টা করব, না হলে বন্ধ করে দেব।”

এই হাসপাতালগুলো যারা পরিদর্শন করার কথা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সেই কর্মকর্তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন কি না, সেই প্রশ্নও রাখা হয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সামনে।

আরেকজন সাংবাদিক এ সময় বলেন, “এত বড় হাসপাতালে নয় তলার ওপরে বেকারি! এগুলো যারা প্যাট্রোনাইজ করেছেন, তাদের বিষয়ে কী বলবেন?”

জবাবে মন্ত্রী বলেন, “দেখুন এখানে শুধু আমরা দায়ী না। বেকারির কথা বলেছেন, পারমিশন দিয়েছে বিএসটিআই এবং পরিবেশ অধিদপ্তর। এখানে অনেকগুলি জিনিস জড়িত আছে।”

আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা দেখার জন্য রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষ করতে বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।