সোমবার ০৯ মার্চ ২০২৬, ফাল্গুন ২৫ ১৪৩২, ২০ রমজান ১৪৪৭

ইসলাম

ইন্দোনেশিয়ায় আনন্দময় ইফতারের আয়োজন নাগাবুবুরিত

 প্রকাশিত: ১৪:৫৩, ৯ মার্চ ২০২৬

ইন্দোনেশিয়ায় আনন্দময় ইফতারের আয়োজন নাগাবুবুরিত

ইন্দোনেশিয়ার জনপ্রিয় রমজান সংস্কৃতি নাগাবুবুরিত। সারা দিন রোজা রাখার পর বিকেলে দেহ-মনে যে ক্লান্তি আসে নানা ইতিবাচক কাজের মাধ্যমে তা দূর করার চেষ্টাকে নাগাবুবুরিত বলা হয়। ইন্দোনেশিয়ার মুসলিম আসরের নামাজের পর বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমে অংশ নিয়ে থাকে। যেমন ধর্মীয় আলোচনা শোনা, তিলাওয়াত শোনা, ইসলামী সংগিত পরিবেশন, মানুষের ভেতর ইফতার বিতরণ ও ইফতার কেনা ইত্যাদি। এই সময় শিশুরা খেলাধুলা করে এবং তাকজিল (উপহারের ইফতার সামগ্রি) সংগ্রহ করে থাকে। সুন্দানিজ শব্দ নাগাবুবুরিতের অর্থ হলো বিকেলের জন্য অপেক্ষা করার সময় আরাম করা। প্রচলিত অর্থে আসরের পর থেকে মাগরিগ পর্যন্ত ইফতারের জন্য অপেক্ষা করা।

নাগাবুবরিত ইন্দোনেশিয়ার তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও এর প্রচলন খুব বেশি দিন আগে হয়নি। ইন্দোনেশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট সুহার্তের সময় এই রীতির প্রচলন ঘটে। ২০১২ সালের দিকে দেশটি টেলিভিশনগুলো নাগাবুবুরিত নামে রমজান মাসে ইসলামী বিনোদনমূলক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করে। ধারণা করা হয়, ১৯৮০ সালে নাগাবুবুরিতের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

নাগাবুবুরিতের নানা আয়োজন

দলবদ্ধ নানা ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে নাগাবুবুরিত উদযাপন করা হয়। যার কয়েকটি হলো,

১. দলবদ্ধভাবে মসজিদে গমন: ইন্দোনেশিয়ার মুসলিমরা রমজান মাসে আসরের পর দলবদ্ধভাবে মসজিদে গমন করে। সেখানে ধর্মীয় আলোচনা, কোরআন তিলাওয়াত ও ধর্মীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। সেখানে তারা আনন্দমুখর পরিবেশে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা করে থাকে।

২. মিলেমিশে ইফতার তৈরি: ইন্দোনেশিয়ার মুসলিমরা বিকেলে সবাই মিলে বাজারে যায় এবং নিজেদের পছন্দের ইফতার সামগ্রি কিনে নিয়ে আসে এবং পরিবারের সবাই মিলেমিশে তা প্রস্তুত করে। পছন্দের খাবার ও মিষ্টান্নগুলোও সবার সহযোগিতায় প্রস্তুত হয়।

৩. তাকজিল সংগ্রহ: তাকজিল শব্দটি আরবি তাজিল শব্দ থেকে এসেছে। তার অর্থ তাড়াতাড়ি করা। ইন্দোনেশিয়ায় তাকজিল বলা হয় এমন হালকা খাবার যা ইফতারের সময় খাওয়া হয়। এসব খাবার যেমন বিক্রি করা হয়, তেমন তা সওয়াবের নিয়তে বিতরণও করা হয়। শিশুরা ইফতারের আগে তাকজিল সংগ্রহ করতে পছন্দ করে। তাকজিলের তালিকায় জনপ্রিয় কয়েকটি খাবার হলো কম্পোট (ফলের তৈরি গাড়ো শরবত), নুডুলস কেনটান, জোগিয়া কিচাক (ডিমের তৈরি মিষ্টি পিঠা), চায়নিজ পোরিজ (ফিরনি ধরনের চালের তৈরি মিষ্টান্ন), গেলোজর নুডুলস ইত্যাদি।

৪. ধর্মীয় টিভি অনুষ্ঠান দেখা: আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার টিভিগুলোতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়। এর মধ্যে জ্ঞানমূলক আলোচনার পাশাপাশি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানও থাকে। এই সময় দাতব্য কার্যক্রমকে উত্সাহিত করেও বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়।

৫. তাদারুস: আরবি তাদারুসের অর্থ পাঠচক্র। ইন্দোনেশিয়ার মুসলিম রমজানের বিকেলে সামাজিক পাঠচক্রের মাধ্যমে নিজেদের ধর্মীয় জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করার প্রয়াস পায়। তারা খোলা মাঠে, পার্কে, বাড়ির ছাদে, উঠোনে এসব উন্মুক্ত পাঠচক্রের আয়োজন করে থাকে। এতে প্রত্যেকে নিজের বন্ধুমহল, প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের আমন্ত্রণ জানায়। এসব পাঠচক্রে ধর্মীয় বিধি-বিধান ও আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়।

৬. ইফতার বুকবার: ইফতার বুকবার হলো বিশেষ শ্রেণির মানুষের সঙ্গে ইফতার করা। যেমন সহপাঠী, সহকর্মী, বন্ধুমহল বা ব্যবসায়ীরা মিলে এক সঙ্গে ইফতার করা। সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করতে ইফতার বুকবারের আয়োজন করা হয়ে থাকে। এসব আয়োজনে ইফতারের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

মোটকথা, মাহে রমজান পারিবারিক ও সামাজিক সম্প্রীতির যে বার্তা প্রদান করে তারই প্রতিফলন ঘটে নাগাবুবুরিতে।