জাকাতযোগ্য সম্পদ ও জাকাতের হিসাব
জাকাত ইসলামের অন্যতম মৌলিক আর্থিক ইবাদত। স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন ও সম্পদশালী মুসলিম নর-নারীর উপর বছরান্তে জাকাতযোগ্য সম্পদের ৪০ ভাগের একভাগ জাকাত আদায় করা ফরজ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো ও জাকাত আদায় করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১১০)
অন্যত্র বলেন, ‘দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্য; যারা জাকাত দেয় না এবং তারা আখিরাতে বিশ্বাস করেনা।’ (সুরা হা-মিম সাজদা, আয়াত : ৬-৭)
ইসলামে নির্দিষ্ট কিছু সম্পদের ওপর নির্দিষ্ট হারে জাকাত আরোপ করা হয়েছে। যেমন—সোনা-রুপা, নগদ অর্থ, ব্যবসায়িক সম্পদ ইত্যাদি। এসব সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া এবং তার ওপর এক চান্দ্র বছর অতিবাহিত হওয়া আবশ্যক। তাই জাকাতযোগ্য সম্পদ চিহ্নিত করা এবং তার সঠিক হিসাব নিরূপণ করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নে জাকাতযোগ্য সম্পদ ও জাকাত হিসাবের বিবরণ পেশ করা হলো—
১. সোনা ও রুপা : সোনা ও রুপার অলংকার, মুদ্রাকৃতি, তৈজসপত্র, খেলনা, শোপিস ব্যবহূত বা অব্যবহূত—সবই জাকাতযোগ্য সম্পদ। নিজ মালিকানায় এক বছর পূর্ণ হলে এবং সোনা সাড়ে সাত ভরি (প্রায় ৮৮ গ্রাম) এবং রুপা সাড়ে বায়ান্ন ভরি (প্রায় ৬১৩ গ্রাম) বা এর অধিক হলে ৪০ ভাগের এক ভাগ বা শতকরা আড়াই ভাগ জাকাত দিতে হবে। পরিধেয় অলংকারের জাকাতে বিষয়েও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। আমর ইবন শুআইব (রহ.) থেকে পর্যায়ক্রমে তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একজন নারী তার কন্যাসহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হন। তার কন্যার হাতে মোটা দুই গাছি সোনার কাঁকন ছিল। তিনি বলেন, ‘তোমরা কি জাকাত দাও?’ নারী বলেন, না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তুমি কি পছন্দ কর যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা এর পরিবর্তে তোমাকে এক জোড়া আগুনের কাঁকন পরিধান করান?’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৬৩; নাসাঈ, হাদিস: ২৪৮১)
২. নগদ অর্থ ও আর্থিক সম্পদ : প্রচলিত মুদ্রা যেমন— টাকা, ডলার, পাউন্ড ইত্যাদি বিনিময়ের জন্যেই নির্দিষ্ট এবং সোনা-রুপার পরিবর্তে এসব ব্যবহার করা হয়। কাজেই প্রচলিত মুদ্রারও ৪০ ভাগের এক ভাগ বা শতকরা আড়াই ভাগ জাকাত দিতে হবে। যদি তা সোনা বা রূপার নিসাবের মূল্যের সমান হয়। নগদ অর্থ (ব্যাংকে বা হাতে), ব্যাংক আমানত (ফিক্সড ডিপোজিট বা ডিপিএস), মোবাইল মানি, সঞ্চয়পত্র, প্রাইজ বন্ড, শেয়ার সার্টিফিকেট, সিকিউরিটি ইত্যাদি নগদ অর্থ বলে গণ্য হবে। এছাড়া আগের বকেয়া পাওনা ঋণ, চলতি বছরে দেয়া ঋণ, এসবকেও নগদ অর্থের মধ্যে ধরে জাকাত হিসাব করতে হবে। তবে, যেসব ঋণ ফেরত পাওয়ার আশা নেই—সেগুলো বাদ দেওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে ফেরত পাওয়া গেলে জাকাত দিতে হবে।
৩. ব্যবসায়িক সম্পদ : বিক্রয়ের জন্য প্রস্তুত পণ্য, পাইকারি বা খুচরা মালামাল, ব্যবসার জন্য মওজুদ কাঁচামাল, মালের স্টক ইত্যাদি হলো ব্যবসায়িক সম্পদ। ব্যবসায়ের মালামালের জাকাত নিরূপণকালে মালিকানার বছর সমাপ্তির দিনে যে সম্পদ থাকে, তাই সারা বছর ছিল ধরে নিয়ে তার ওপর জাকাত দিতে হবে। বছর শেষে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির যে স্থিতিপত্র তৈরি করা হয়, এতে সাকুল্য দেনা-পাওনা, যেমন—মূলধন সম্পদ, চলতি মূলধন, অর্জিত মুনাফা, ক্যাশে এবং ব্যাংকে রক্ষিত নগদ অর্থ, দোকানে ও গুদামে রক্ষিত মালামাল, কাঁচামাল, প্রক্রিয়ায় অবস্থিত মাল, প্রস্তুতকৃত মাল, ঋণ, দেনা ও পাওনা ইত্যাদি যাবতীয় হিসাব আনতে হবে। এসবের মধ্য থেকে স্থায়ী মূলধন সামগ্রী যেমন— মেশিন, দালান, জমিসহ ব্যাংক ঋণ, ক্রেডিটে ক্রয়কৃত মাল এবং অন্যান্য ঋণ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট সম্পদের ওপর জাকাত দিতে হবে। ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত জমি, মেশিন বা অন্যান্য সম্পদেরও জাকাত দিতে হবে। কোনো ব্যক্তির একাধিক ব্যবসা থাকলে এবং তার সাথে সোনা-রুপা, নগদ অর্থ, ব্যাংক ব্যালান্স ইত্যাদি থাকলে এই সব সম্পদের হিসাবের যোগফলের ভিত্তিতে জাকাত নিরূপণ করতে হবে। ব্যবসায়িক সম্পদে জাকাত বিষয়ে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সামুরা ইবন জুনদুব (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে খরিদকৃত পণ্যের জাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৬২)
পরিশেষে বলা যায়, জাকাত ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক ও কার্যকর বিধান। সোনা-রুপা, নগদ অর্থ ও ব্যবসায়িক সম্পদসহ বিভিন্ন জাকাতযোগ্য সম্পদের সঠিক হিসাব নিরূপণ করলে জাকাত যথাযথভাবে আদায় করা সম্ভব হয়। এর ফলে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত হয়।