বৃহস্পতিবার ০৫ মার্চ ২০২৬, ফাল্গুন ২১ ১৪৩২, ১৬ রমজান ১৪৪৭

ইসলাম

ফুরিয়ে যাচ্ছে আত্মশুদ্ধির মাস

 প্রকাশিত: ১৭:২৭, ৫ মার্চ ২০২৬

ফুরিয়ে যাচ্ছে আত্মশুদ্ধির মাস

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এই রমজান মাসের অর্ধেক সময় আমরা ইতোমধ্যে অতিক্রম করে এসেছি। যেই মাস আমাদের সামনে উপনিত হয়েছিল ফিরে আসার আহ্বান নিয়ে, শুদ্ধ হওয়ার আহ্বান নিয়ে, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক নবায়নের আহ্বান নিয়ে। প্রথম রোজার দিনে আমাদের অন্তরে যে আবেগ, যে সংকল্প, যে অশ্রুসিক্ত আবেদন ছিল; মধ্য রমজানে দাঁড়িয়ে কি আমরা সেই একই উষ্ণতা অনুভব করছি? নাকি ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর প্রাত্যহিক অভ্যাসের চাপে সেই উষ্ণতা কিছুটা ম্লান হয়ে গিয়েছে?

পবিত্র কোরআনে রোজার উদ্দেশ্য সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা আয়াত : ১৮৩)

এ আয়াতে রোজার মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন বলা হয়েছে। যার ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) লিখেছেন, রোজা মানুষের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করে এবং পাপ থেকে বিরত থাকার মানসিক শক্তি তৈরি করে। তিনি বলেন, রোজা শয়তানের প্রভাব দুর্বল করে, কারণ তা মানুষের কামনা-বাসনাকে সংযত করে। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ২/১৮৩)

ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন, তাকওয়া হলো আল্লাহর ভয়কে অন্তরে ধারণ করে তাঁর অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকা। রোজা যেহেতু গোপন ইবাদত, তাই এতে রিয়া বা লোকদেখানো প্রবণতা কম থাকে; ফলে এটি সরাসরি তাকওয়া গঠনে ভূমিকা রাখে। (আল-জামি‘ লি আহকামিল কুরআন : ২/১৮৩)

এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের রোজা কি সত্যিই তাকওয়া তৈরি করছে? রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই।’ (বুখারি, হাদিস : ১৯০৩)

এই হাদিস আমাদের সামনে আয়নার মতো সত্য তুলে ধরে। রোজা শুধু খাদ্য ত্যাগের নাম নয়; এটি জিহ্বা, চোখ, কান ও অন্তরের সংযমের নাম। যদি রমজানের মাঝপথে এসে আমরা দেখি যে, মিথ্যা, গীবত, হিংসা, দুর্নীতি বা অন্যায় আচরণ আমাদের জীবন থেকে কমেনি, তবে বুঝতে হবে রোজার আত্মিক ফল আমরা পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘কত রোজাদার আছে, যার রোজা থেকে প্রাপ্তি শুধু ক্ষুধা।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৬৯০)

এ হাদিস আমাদের ভাবিয়ে তোলে। রোজা যদি চরিত্র গঠন না করে, তাহলে তা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। তাই মাঝপথে এসে আত্মসমালোচনা অতীব জরুরি।

রমজান কোরআনের মাস। মহান আল্লাহ বলেন: ‘রমজান সেই মাস, যাতে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। (সুরা আল-বাকারা আয়াত : ১৮৫)

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) রমজানে অধিক কোরআন তিলাওয়াতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। ইমাম মালিক (রহ.) রমজান শুরু হলে হাদিস পাঠের আসর কমিয়ে কোরআন পাঠে মনোনিবেশ করতেন। (ইবন রজব, লাতায়িফুল মা‘আরিফ) 

এসব ঐতিহাসিক তথ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রমজান শুধু সামাজিক উত্সব নয়; এটি কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়নের সময়। মধ্য রমজানে আমারে হিসাব মিলানো দরকার আমরা কোরআনের সাথে কতোটুকু সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছি? মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের বাকি দিনগুলোতে ইবাদতে যত্নবান হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।