রোববার ২২ মে ২০২২, জ্যৈষ্ঠ ৭ ১৪২৯, ২০ শাওয়াল ১৪৪৩

ইসলাম

আসাম: এ যেন গণহত্যার এক লীলাভূমি

ওয়ালিউল্লাহ আব্দুল জলীল

 আপডেট: ১৮:২৮, ২২ জানুয়ারি ২০২২

আসাম: এ যেন গণহত্যার এক লীলাভূমি

ব্রহ্মপুত্র নদীর একটি শাখা হল, সুতা নদী। এই নদীরই একটি পাড়ে কিছু মুসলমানের বসবাস। গ্রামের নাম ধোলপুর, জেলার নাম দরং। ২৩ সেপ্টেম্বর এই ধোলপুরেই ঘটে যাওয়া বিভৎস হত্যাকা- সারা পৃথিবীকে হতভম্ব করে দেয়। একটি শিবমন্দিরকে সম্প্রসারণের কথা বলে আসাম সরকার এ গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছিল। উচ্ছেদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছিল। সেখানেই পুলিশ গুলি চালায়। এতে অন্তত দুজন নিহত হয়। আহত হয়েছে আরও অনেক।

এই পর্যন্ত ঘটনাটি পৃথিবীর মানুষের কাছে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। কারণ এখানে নিপীড়িত ও নিহত হয়েছে মুসলমানেরা। মুসলমানের রক্ত এখন পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যহীন, কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু ঘটনা এমনই অভিনব নৃশংস পন্থায় ঘটে যে, তা বিবেকবান মানুষকে নিশ্চুপ থাকতে দেয় না। সেদিন এমনই একটি ঘটনা ঘটে গেছে। আসামের দরং জোলার ধোলপুরে।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করা মুসলিমদেরকে উচ্ছেদের কারণ হিসেবে যদিও প্রচার পেয়েছিল শিবমন্দির সম্প্রসারণ। আদতে ব্যাপারটি তা ছিল না। শিবমন্দিরের ভূমির বিষয়টি মিটমাট হয়ে গিয়েছিল আরও চার মাস আগেই। যে দশ বারোটি পরিবারের বিরুদ্ধে মন্দিরের ভূমি দখলের অভিযোগ ছিল তারা জমি ছেড়ে দিয়েছিল। এখন উচ্ছেদের কারণ হল, সরকার এখানে বড় পরিসরে খামার করতে চায়। এই খামারে এখানকার বৈধ বাসিন্দাদের সরিয়ে ভূমিপুত্রদের কর্মসংস্থান করতে চায়। এজন্যই দশকের পর দশক ধরে বসবাস করা, সরকারের খাজনা পরিশোধ করা মানুষগুলোকে সরিয়ে দিচ্ছে। উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলোর কোথায় ঠাঁই হবে তা যেন ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। পুলিশের তাড়া খেয়ে তারা নদীর অপর পারে উঠে এসেছে। ভিটে-মাটি সহায়-সম্বল হারানো মানুষগুলো স্বেচ্ছাসেবীদের ত্রাণ অবলম্বন করে টিকে আছে। সে ত্রাণও কখনো জুটে কখনো জুটে না।

২৩ সেপ্টেম্বরে পুলিশ উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখে। সেদিন পুলিশ মুঈনুল হক নামক এক ব্যক্তির ভাতিজিকে বাড়ি দিয়ে হাত ভেঙ্গে ফেলে। ছোট্ট মেয়েটির ওপর বয়ে যাওয়া এ নির্মমতা আশপাশের মানুষকে সংক্ষুদ্ধ করে তোলে। কী হয়েছে ব্যাপারটি দেখার জন্য সবাই এগিয়ে যায়। সশস্ত্র পুলিশ তাদের দিকে তেড়ে আসে। পুলিশ দেখে সবাই যার যার মতো সরে গেলেও মুঈনুল হক লাঠি নিয়ে তেড়ে যায় পুলিশের দিকে। ভিটে-মাটি হারাতে যাওয়া মানুষটি জুলুমের ভার এমনিতেই সইতে পারছিল না। এর উপর নিষ্পাপ ভাতিজির উপর এ নির্মমতা তাকে আর স্থির থাকতে দেয়নি। প্রতিকার ও প্রতিবাদের শেষ সম্বলটুকু নিয়েই আক্রমণে উদ্যত হয়। যেমন মার খাওয়া বিড়াল ঝাঁপিয়ে পড়ে শক্তি ও হিংস্রতায় শতগুণ বেশি কুকুরের উপর। লাঠি হাতে এগিয়ে আসা গ্রামের একটি সাধারণ মানুষকে থামাতে পুলিশের খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু নিষ্ঠুর পুলিশ সোজা তার বুকে গুলি চালিয়ে দেয়। মুঈনুল হক মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এখন শুধু মৃত্যুর প্রহর গোনা। কিন্তু গুলি করেও পুলিশের আক্রোশ থামেনি। মৃত্যুন্মুখ মুঈনুল হকের উপর এলোপাথাড়ি লাঠির আঘাত করতে থাকে। এর মধ্যে দৌড়ে আসে সরকার নিয়োজিত ফটোগ্রাফার শঙ্কর বানিয়া। উন্মত্ত পশুর মতো মুঈনুল হকের মুখ ও দেহ পা দিয়ে থেতলে দিতে থাকে। পুলিশ তাকে টেনে নিয়ে গেলেও সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আবার দৌড়ে আসে। ভূপাতিত মানুষটিকে দলিত মথিত করতে থাকে। পশুত্বের স্বাদ মেটানোর পর সাদা পোশাকধারী একজনের সঙ্গে এ পশুত্ব উদযাপনও করে।

৩২ বছরের মুঈনুল হকের না হয় দোষ ছিল, সে লাঠি হাতে তেড়ে এসেছে, ক্ষুব্ধ হয়েছে, পুলিশের কাজে বাধা (?) দিয়েছে; কিন্তু ১২ বছরের ফরিদ শেখের কী দোষ ছিল? সবে মাত্র সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। আধার কার্ড আনতে পোস্ট অফিসে গিয়েছিল। যেখানে উচ্ছেদ অভিযান চলছিল সেখান থেকে তার বাড়ি দুই কিলোমিটার দূরে। তাদেরকে উচ্ছেদ নোটিশও দেওয়া হয়নি। আধার কার্ড নিয়ে তার বাড়ি ফিরে আসার কথা ছিল। সন্ধ্যায় সে বাড়ি ফিরে এসেছিল ঠিকই, তবে এসেছে লাশ হয়ে। তার পকেটে ঠিকই সদ্য তোলা আধার কার্ড ছিল। কিন্তু বুকের ডান পাশ ছিল গুলিবিদ্ধ। কেন কীভাবে গুলি করেছে তা জানা যায়নি। হয়তো জানা যাবে না কোনো দিনই। আহতদের কাতারে এমন অনেকেই আছে, যাদেরকে উচ্ছেদ নোটিশ দেওয়া হয়নি।

আসাম বহু কাল ধরেই বাংলাভাষাভাষি বিশেষত বাঙালী মুসলমানদের জন্য উত্তপ্ত কড়াই হয়ে আছে। অহমীয়রা১ সবসময়ই বাঙালীদের বাংলাদেশী তথা বিদেশী বলে আখ্যায়িত করে আসছে। বাঙালীরা সংখ্যায় বেশি হওয়ায় অহমীয়দের মধ্যে সবসময় একটি কাল্পনিক ভয় জাগ্রত হয়ে আছে। ভোটের লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার ভয় তাদেরকে সবসময় হিংস্র করে রাখে। অন্যান্য দেশের বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাশীল সমাজের অধিকাংশই সত্য ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলে থাকে। কিন্তু বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাশীল সমাজ বলতে আমরা যাদেরকে বুঝি, আসামের সেই শ্রেণিটা সর্বদাই উস্কানি ও দাঙ্গার পক্ষেই কাজ করে আসছে। যে জন্য আসামের অতীতে যে হিংস্রতা হয়েছে সেগুলো আবার নতুন  নতুন চেহারায় ফিরে আসছে। অহমীয়দের জাতিগতভাবে অন্যায়ের পক্ষে এমন নির্লজ্জ অবস্থান আমাদেরকে লূত আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। লূত আ. তাঁর জাতির সম্মিলিত অপকর্ম দেখে বলেছিলেন-

اَلَـیْسَ مِنْكُمْ رَجُلٌ رَّشِیْدٌ

তোমাদের মাঝে কি কোনো ভালো মানুষ নেই?!

রক্তের এ হোলি খেলা আসামে নতুন নয়। ১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আসামের নেলীসহ আশপাশের চৌদ্দটি গ্রামে ভয়াবহ এক গণহত্যা সংগঠিত হয়। স্থলভাগের তিন দিক দিয়ে আক্রমণ হয়। পালানোর একমাত্র পথ নদীতেও তারা নৌকা নিয়ে ওঁৎ পেতে ছিল। আক্রমণের প্রচ-তায় যারা পেরেছে তারা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। আগে থেকে  ওঁৎ পেতে থাকা দাঙ্গাবাজরা প্রাণ ভয়ে ছুটতে থাকা মানুষগুলোকেও পশুর মতো হত্যা করে। যারা সাঁতরে ভাগ্যক্রমে পার হতে পেরেছিল তারাই বাঁচতে পেরেছিল। সেদিন সরকারি হিসাব অনুযায়ী দুই হাজারের বেশি মুসলমান প্রাণ হারিয়েছিল। বেসরকারি হিসাবে এর সংখ্যা দশ হাজারেরও বেশি। এর অধিকাংশই ছিল নারী-শিশু। এরপর বিচার, ক্ষতিপূরণ ও তদন্তের প্রতিশ্রুতি সবই হয়েছে। ক্ষতিপূরণ যা ছিল তাও নামকা ওয়াস্তে। কিন্তু বিচার ও তদন্ত কখনো আলোর মুখ দেখেনি। এই ঘটনাও তো চাপা পড়ে যেত যেমন মুঈনুল হকের ঘটনা মেইনস্ট্রিম মিডিয়া চাপা দিয়েছে। ঘটনাটি চাপা পড়তে না পারার কারণ হল, ঘটনার সময় সেখানে তিনটি শীর্ষ পত্রিকার সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। বিবিসি বাংলার সংবাদে উঠে এসেছে, উচ্ছেদ হচ্ছে শুধু মুসলমান অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। হিন্দু এলাকাগুলো নিরুপদ্রব আছে।

ইতিপূর্বে বিদেশী আখ্যা দিয়ে হিন্দু-মুসলিম সবার ওপর খড়্গ নেমে আসত। অতীতের গণহত্যাগুলোর দিকে নজর দিলে বোঝা যায়, অহমীয়দের মূল আক্রোশ বাঙালীদের প্রতি। উইকিপিডিয়া অবলম্বনে কিছু গণহত্যার চিত্র তুলে ধরা হল-

গোরেশ্বর গণহত্যা : ১৯৬০ সালের চৌদ্দ জুলাই গোরেশ্বরের পঁচিশটি গ্রামে এ হত্যাকা- সংঘটিত হয়। তৎকালীন পুলিশ কমিশনারের মতে কমপক্ষে নয় জন নিহত ও অসংখ্য মানুষ আহত হয়। এক হাজারেরও বেশি বঙালী বাস্তুচ্যুত হয়। ঘটনার জেরে পরবর্তীতে আগস্টের শেষ পর্যন্ত পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার বাঙালী পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেয়।

মান্দাই গণহত্যা : ৮ই জুন ১৯৮০ সালে সংঘটিত এ গণহত্যায় ২৫৫ জন হিন্দুকে হত্যা করা হয়। বেসরকারি হিসাবে এর সংখ্যা সাড়ে তিন শ থেকে চার শ। খুনিরা হত্যার পর নিহতদের মাথা কেটে ফেলে।

খয়রাবাড়ি গণহত্যা : ৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৮৩ খয়রাবাড়িতে এ গণহত্যা সংঘটিত হয়। নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রাদেশিক রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে বাঙালী অধ্যুষিত গ্রাম চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে। মধ্যরাতের পর বন্দুক, বর্শা, তির, ধনুক, কাস্তে নিয়ে ঘুমন্ত মানুষগুলোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ধারণা করা হয়, প্রায় এক শ থেকে পাঁচ শ জন বাঙালী হিন্দু এতে নিহত হয়।

শিলাপাথর গণহত্যা : ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ সালে মিশিং ও অসমীয়দের হাতে এ গণহত্যা সংঘটিত হয়। নিহতের সংখ্যা পঞ্চাশ বলা হলেও অভিজ্ঞ সাংবাদিক সাবিয়া গোস্বামীর মতে, সরকারি হিসাবেই হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এখানেও মূল টার্গেট ছিল বাংলা ভাষাভাষীরা। হামলাকারীরা এতটাই বর্বর হয়ে উঠেছিল যে, মায়ের কোল থেকে শিশুদের ছিনিয়ে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারে।

হোজাই গণহত্যা : ১৯৯৩ সালের জুলাই মাসে হিন্দু বাঙালী শরণার্থীদের উপর এ হত্যাকা- সংঘটিত হয়। একজন স্টুডিও মালিক ও ক্রেতার মধ্যকার তর্কবিতর্ক কেন্দ্র করে এ হত্যাকা- ঘটে। এ ঘটনায় এক শরও বেশি হিন্দু বাঙালী নিহত হয়।

নিচলামারি গণহত্যা : ৩০ ডিসেম্বর ১৯৯৩ সালে রাষ্ট্রীয় বোরোল্যান্ড মোর্চার সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এ হত্যাকা- ঘটায়। দু দফায় তারা একুশ জনকে হত্যা করে।

বাগবেড় গণহত্যা : ২২ মে ২০০০ সালের এ গণহত্যাটি সংঘটিত হয় এনএলএফটি খ্রিস্টান জঙ্গিদের দ্বারা। সেদিন শরণার্থী শিবির থেকে পালানোর সময় ২৫ জন হিন্দু বাঙালী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।

কমলনগর গণহত্যা : ১৪ আগস্ট ২০০৩ সালে নিখিল ত্রিপুরা ব্যাঘ্রবাহিনী এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। সেদিন সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা চৌদ্দজন নিরস্ত্র বাঙালীকে হত্যা করে। আহত হয় বহু মানুষ। পরবর্তীতে এ ঘটনায় জড়িত তিন জনের যাবজ্জীবন করাদণ্ড হয়।

বোরোল্যাণ্ড গণহত্যা : ২০১৪ সালে পহেলা মে থেকে তেসরা মে পর্যন্ত ব্যাপ্ত এ হত্যাকাণ্ডটি ঘটায় রাষ্ট্রীয় বোরোল্যাণ্ড গণতান্ত্রিক মোর্চা। মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংঘটিত এ গণহত্যার কারণ ছিল, নির্বাচনে বোরো সদস্যদের নির্বাচিত না করা। তিন দফায় সংঘটিত এ গণহত্যায় তেত্রিশ জন নিরীহ মুসলমান নিহত হয়। পুলিশের গুলিতে নিহত হয় তিন জন আক্রমণকারী।

তিনসুকিয়ার গণহত্যা : ১ নভেম্বর ২০১৮ সালে এ গণহত্যা সংঘটিত হয়। সেদিন আলফা সন্ত্রাসীরা ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে পাঁচ জন বাঙালীকে হত্যা করে। গুরুতর আহত হয় দুজন।

খেয়াল করলে দেখবেন, এত কাল সংঘটিত সবগুলো গণহত্যার পেছনে বেশি কাজ করেছে ভাষা ও জাতিগত বিদ্বেষ। কিন্তু বিজেপির হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের এনআরসি তৈরি হওয়ার পর হিন্দুরা এদের হাত থেকে অনেকটাই নিরাপদ। হুমকি-ধমকি, নির্যাতন-নিপীড়নে এখন মুসলমানরাই টার্গেট। আসাম শাসনও করছে এখন বিজেপি সরকার। তাই মুসলিম নির্যাতনের ব্যাপারগুলো বেমালুম চেপে যাওয়া হচ্ছে। যদিও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মা এককালে কংগ্রেসের দুধ কলায় পোষা সাপ। আর পুলিশের এ ভূমিকা এমনই হওয়ার কথা ছিল। কারণ, দরং জেলার বর্তমান পুলিশ সুপার সুশান্ত বিশ্বশর্মা। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর ভাই। দম্ভভরে তিনি ঘোষণাও দিয়েছেন, ‘পুলিশের যা যা করা দরকার তা-ই করেছে।’ এমন কথা বলার পর আর কার কাছেই বা কী বলার থাকে?

নিহত মুঈনুল হকের মা শোকের বিহ্বলতায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথাই বলতে পারেননি। নিহতের স্ত্রী মমতাজ বেগম কিছুটা ধাতস্থ হয়ে বলেছিলেন, ‘সেদিন বেলা এগারোটার দিকে শেষবার দেখেছিলাম স্বামীকে। তারপর তো রাতে আবার দেখলাম।’ এইটুকু বলেই আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন তিনি।

কিছুক্ষণ পর বললেন, ‘ওর বুকে গুলি লেগেছিল, আর পায়ে। ওর ওপরে যেভাবে একটা লোক ঝাঁপিয়েছে, লাথি মেরেছে, ওর শরীরটা নীল হয়ে গিয়েছিল।’ আবারও কেঁদে ফেললেন তিনি।

এ লেখা যখন শেষ করছি তখন ত্রিপুরা থেকে মুসলিম নির্যাতনের সংবাদ আসছে। এপর্যন্ত সতেরোটি মসজিদ জ্বালিয়ে দেওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। যথারীতি মেইনস্ট্রিম মিডিয়া সেখানকার ঘটনা এড়িয়ে চলছে। কিছু কিছু মানুষ ঝুঁকি নিয়ে নিপীড়িত জনপদের ছবি, ভিডিও ও সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, ড. আসিফ নজরুল সাহেব তাঁর ফেইসবুক পেইজে ২৪ অক্টোবর ২০২১ তারিখে লেখেন, ‘ভারতের ত্রিপুরায় মুসলমানদের উপর হামলার তীব্র নিন্দা করছি। আমরা যারা এ দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলার নিন্দা করেছি তাদের সবার উচিত ভারতে সংঘটিত ঘটনারও প্রতিবাদ করা। যে কোনো সাম্প্রদায়িকতা জঘন্য ও পাশবিক।’

মুসলিম শাসকরা যেমন মুসলিম জনতাকে ভুলে গেছে তেমনি তাঁরা মুসলমানদেরকেও বাধ্য করছে  অন্য মুসলিম ভাইদের কথা ভুলে যেতে। যে জন্য নিপীড়করা দিন দিন আরো সুসংহত হচ্ছে। আর অসহায় হয়ে পড়ছে মুসলমানেরা। এমন পরিস্থিতিতে মজলুমের আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করা ছাড়া আর কী-ই বা করার আছে। চোখ-মুখ বুজে আল্লাহর কাছেই অসহায়ত্বের বেদনা তুলে ধরছে। কারণ, মজলুমের ফরিয়াদ আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কোনো ধরনের বাধা-বিঘ্নতা ছাড়াই পৌঁছে যায়। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। হ

 

১. ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে আহম জাতি আসাম দখল করে। এরা উত্তর ব্রহ্ম ও চীন সীমান্তবাসী সান বংশদ্ভূত। তারা প্রায় ছয়শ বছর আসাম শাসন করে। এদের উত্তরসূরীরাই অহমীয়।

মন্তব্য করুন: