যুদ্ধবিরতি চুক্তি: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল?
পশ্চিম এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের প্রচেষ্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতির চুক্তিটি এক দিন আগেই হয়ে গেল, যাতে ইরানের বড় অর্জন দেখছেন একজন সামরিক বিশ্লেষক।
তাহলে কী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল?
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা লিখেছে, এটি এক নতুন অধ্যায়। বিশেষ করে গত এক মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের মধ্যে যে নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ দেখা গেছে, তাতে এটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এক অধ্যায়।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে যুক্তরাষ্ট্রের যে অবরোধ চলছে, ইরান তার দ্রুত অবসান চায়। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভিসহ ইরানের সূত্রগুলো বলছে, ইরানের জাহাজের একটি অংশ অবরোধের মধ্যেও চলাচল করতে সক্ষম হচ্ছে। সূত্রগুলো আসলে বলছে, বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধের আংশিক প্রত্যাহার করেছে।
ইরানের সূত্রগুলোর বরাতে আল জাজিরা লিখেছে, ইরানের নৌযান, জাহাজ ও তেলের ট্যাংকার চলাচলে আরোপ করা অবরোধ তুলে নেওয়া চুক্তির অপরিহার্য অংশ।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে নিজ নিজ দেশের পক্ষে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বাক্ষর করেছেন। চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা ছিল শুক্রবার জেনিভায়।
এর পরবর্তী ৬০ দিনে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছতে আলোচনা শুরু করবেন মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা।
সই হওয়া সমঝোতা স্মারকে ১৪ টি দফা রয়েছে, তাতে বলা হয়েছে সমঝোতা স্মারক সইয়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে, যুক্তরাষ্ট্র ও এর আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করবে, ইরানের ওপর বর্তমান সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে।
ইরান তাদের ওপর আরোপিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং আটক সম্পদ ছাড়ের দাবি জানিয়ে আসছে। বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানে অর্থনৈতিক যে দুর্দশা তৈরি হয়েছে, এখন এ চুক্তির ফলে খুব কম সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক হিসাবগুলোতে ইরানের ১০০ থেকে ১২০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবরুদ্ধ অবস্থায় আছে। সেসব সম্পদ ছাড় করা হলে ইরানের অর্থনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্ব পরিবর্তন আসতে পারে। রাজনৈতিকভাবে যে বদল ঘটতে পারে, তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ ইরানের জনপরিসরে এই চুক্তিকে বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই চুক্তিতে ইরানি কর্মকর্তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার প্রতি সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবার আক্রমণ শুরু করবে ও এই কর্মকর্তাদের হত্যা করবে বলে হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানি নেতারা মুহূর্তটি উদযাপন করার সময় ট্রাম্পের এই নতুন হুমকি নিয়ে কিছু বলেননি। তারা চুক্তির ছবি প্রকাশ করেছেন।
এই চুক্তিকে ১৯৭৯ সালে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরিত প্রথম চুক্তি হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানি পক্ষের নেতৃত্ব দেওয়া পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবফ বলেন, “সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা যা কিছু অর্জন করতে চেয়েছিলাম, আলোচনার মাধ্যমে আমরা তার কয়েকগুণ বেশি পেয়েছি, এ নিয়ে কোনো তুলনাই চলে না।”
ব্রিটেনের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল সাইমন মেয়লও মনে করেন, ইরানের নতুন নেতৃত্ব তরুণ ও কট্টরপন্থি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তি লঙ্ঘন করে যুদ্ধে ফিরবেন না তারা।
তার ভাষায়, “কয়েক দশক ধরে পশ্চিম এশিয়ায় ‘ভয়ঙ্কর’ আচরণ সত্বেও ইরানের জন্য এই চুক্তি খুব ভালো অর্জন।
“ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরুর পর আমরা যেরকম আশা করেছিলাম, তার চেয়েও অবশ্যই অনেক বেশি পেয়েছে।”
তিনি বলেছেন, আগামী ৬০ দিনের আলোচনা পর্বে জটিলতা তৈরি হওয়ার প্রচুর সুযোগ রয়েছে। তবে ইরান যে চুক্তি লঙ্ঘন করবে না বলেই জেনারেল মেয়ল মনে করেন। কারণ তার মতে, ফের যুদ্ধে জড়ানোর ইচ্ছা নেই ইরানের।
জেনারেল মেয়ল বলছেন, “একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত ইরানের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে পরিবর্তন আসবে। ব্যক্তিগতভাবে যারা এখন ইরান শাসন করছেন, তারা নতুন স্তরের নেতৃত্ব। তারা আরও বেশি কট্টরপন্থি হতে পারেন।”
তিনি বলেন, “ইসরায়েলি ও নির্দিষ্টভাবে আমেরিকানদের সামরিক হামলার কারণে ইরানের বিপুল ক্ষতি হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি এখন একেবারেই ভিন্ন।

