পটিয়ায় প্রতিবেশীকে ফাঁসাতে খুন করা হয় শিশু জায়ানকে, ধারণা পুলিশের
চট্টগ্রামের পটিয়ায় পাঁচ বছরের শিশু জায়ানের লাশ উদ্ধার ও প্রতিবেশী এক তরুণীকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ বলছে, প্রতিবেশী অপর একটি পরিবারকে ফাঁসাতে শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন।
পুলিশ বলছে, প্রতিবেশী অপর একটি পরিবারের সঙ্গে গ্রেপ্তার তরুণীর পরিবারের জায়গা-জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। তাদের ফাঁসাতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হতে পারে।
ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার তিনজনের একজন সাদিয়া সুলতানা নিহা (১৯)। অপর দুজন হলেন নিহার বাবা মো. সাইফুদ্দীন (৩৯) ও মা শাহনুর আক্তার (৩৫)।
নিহা এবারের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী এবং তার বাবা রাজমিস্ত্রির কাজ করেন।
মঙ্গলবার দুপুরে পটিয়া উপজেলার পৌর সদরের দক্ষিণ গোবিন্দরখিল গ্রামে নিজ বাড়ির সামনে থেকে নিখোঁজ হয় পাঁচ বছরের জায়ান। সে ওই এলাকার গ্যারেজ মালিক শাহজাহানের ছেলে। নিখোঁজ হওয়ার পর মুক্তিপণ চেয়ে শিশুটির পরিবারকে চিরকুট দেওয়া হয়েছিল।
এরপর বুধবার রাত ৩টার দিকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
ওই ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তারের পর বৃহস্পতিবার বিকালে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মাসুদ আলম সাংবাদিকদের বলেন, গ্রেপ্তার নিহা সম্পর্কে জায়ানের প্রতিবেশী ফুফু। মঙ্গলবার দুপুরে শিশুটির সঙ্গে সে ফুটবল খেলেছিল। একপর্যায়ে বাড়িতে নিয়ে শিশুটিকে খুন করে।
পরে লাশ গুমের জন্য দুটি বস্তায় ভরে বাড়ির পেছনে ময়লায় ভেতরে ফেলে ঢেকে রাখা হয়।
পুলিশ সুপার বলেন, বুধবার নিহাকে তার বাবা, মা ও ভাইসহ আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে।
“শিশুটিকে অপহরণ করার ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই খুন করা হয়। আমাদের ধারণা শিশুটির মৃত্যুর বিষয়টি নিহার বাবা-মা জানত। তবে তারা সেটি গোপন করেছে। নিহার দেওয়া স্বীকারোক্তিতে তাদের বাড়ির পেছনে ময়লা স্থান থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়।”
যেভাবে রহস্য উদঘাটন
জায়ান হত্যার ঘটনা ‘অনেকটা ক্লু-লেস’ ছিল মন্তব্য করে পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, “চিরকুটের সূত্র ধরে জায়ানের প্রতিবেশী কয়েকটি ঘরে তল্লাশি করি। একপর্যায়ে নিহার বাসায় যে ধরনের প্যাডে চিরকুট লেখা হয়েছে একই ধরনের প্যাড ও চিরকুটের নমুনা পাওয়া যায়।
“রাতে নিহাকে থানায় নেওয়ার পর সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে চিরকুট লেখার কথা স্বীকার করে। তার হাতের লেখার সঙ্গে চিরকুটের লেখা পুরোপুরি মিলে যায়। তবে এসময় তিনি প্রতিবেশী এক ব্যক্তির জোরাজুরিতে চিরকুট লেখেন বলে দাবি করেন। পরে ওই ব্যক্তিকেও নিহার মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে একপর্যায়ে নিহা নিজে চিরকুট লেখা এবং শিশুটিকে খুন করার কথা স্বীকার করেন।”
জায়ানের বাবা শাহজাহান বুধবার স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মঙ্গলবার দুপুরে তার ছেলে নিখোঁজ হয় এবং সাড়ে ৩টার দিকে ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়ার একটি চিরকুট ঘরে পান। এরপর সন্ধ্যা পর্যন্ত ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে রাতে পটিয়া থানায় জিডি করেন।
টাকা না দিলে আর পুলিশের কাছে গেলে শিশুটিকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয় হাতে লেখা ওই চিরকুটে।
চিরকুটে লেখা হয়, “শাহজাহান, তোর ছেলে আমাদের কাছে আছে। ছেলেকে পেতে চাইলে যেটা বলছি সেটা শোন। যদি কোনো চালাকি করার চেষ্টা করস, তাহলে ছেলেকে আর খুঁজলেও পাবি না। পুলিশের কাছে না গেলে ভালো হয়, যদি যাস ছেলের লাশ পাবি।
“তোর পরিবারের উপর নজর আছে সবসময়। আধা ঘণ্টার মধ্যে ৩ লাখ টাকা আর তোর ফ্যামিলির যেকোনো একজনের মোবাইল আনলক করে একটা ব্যাগে করে তোর বাড়ির সামনের রাস্তার পাশে ভাঙা দোকানের ভেতর রেখে দিবি। রাখার পর তুই তোর ফ্যামিলির সবাই বাসার ভেতর ঢুকে যাবি। ঢুকে গিয়ে দরজা-জানালা বন্ধ করে দিবি। যদি কোনো চালাকি করস, তাহলে আমার কোনো ক্ষতি হবে না। তোর ছেলেকে জীবনে খুঁজে পাবি না।
“মোবাইলটা তোর ছেলেকে তোকে দেখানোর জন্য। যেটা বললাম সেটা শুনলে ভালো। আর মানুষের গায়ে হাত তোলা বন্ধ করে দিবি।”
পটিয়া থানার ওসি জিয়াউল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জায়ানকে অপহরণের অল্প সময়ের মধ্যে খুন করা হয়। আমাদের ধারণা শিশুটিকে হত্যার পর নিহা গিয়ে শিশুটির বাড়িতে চিরকুট রেখে আসেন।
“প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে প্রতিবেশী অপর এক ব্যক্তিকে ফাঁসানোর জন্য নিহা খুন করেছেন। কারণ জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি প্রতিবেশী ওই ব্যক্তির নাম বলেছেন এবং তাকে আটক করে থানায় আনা হয়। পরে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে ওই ব্যক্তির কোনো সম্পৃক্ততা মেলেনি।”