রোববার ০৮ মার্চ ২০২৬, ফাল্গুন ২৪ ১৪৩২, ১৯ রমজান ১৪৪৭

আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধে যেভাবে ভুগবে বিশ্ব অর্থনীতি

 প্রকাশিত: ১১:৩৬, ৮ মার্চ ২০২৬

ইরান যুদ্ধে যেভাবে ভুগবে বিশ্ব অর্থনীতি

ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে, যেখানে সবচেয়ে বড় খেসারতটা দিতে হচ্ছে প্রাণের বিনিময়ে।

এর বাইরে আরেকটি হিসাব কষতে হচ্ছে— অর্থনৈতিক ফলাফল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক প্রভাবটা সবার ক্ষেত্রে সমান হবে না। কোনো দেশ বড় ধরনের বিপদে পড়ে যাবে; কোনো দেশে প্রভাবটা হবে সীমিত। তবে সবচেয়ে ভারী বোঝাটা মধ্যপ্রাচ্যের ঘাড়েই যাবে।

আল জাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সবচেয়ে বড় প্রভাবটা গিয়ে পড়বে ‘পেট্রোল পাম্পে’। অর্থাৎ, এই সংঘাতে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ভয়টা জ্বালানি পণ্য নিয়ে।

শনিবার যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রেখেছে ইরান। এছাড়া মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার জবাব দিতে গিয়ে কাতার ও সৌদি আরবের অনেক জ্বালানি অবকাঠামো অচল করে দিয়েছে তারা।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বিভিন্ন দেশের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের একচেটিয়া শুল্কের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি আগেই থেকেই অস্থিরতার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে।

সেই অস্থিরতা কতদূর গড়াবে, কিংবা কত দিন ভোগাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে ইরান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতির উপর।

জ্বালানি পণ্যের দাম স্থায়ীভাবে বেড়ে গেলে তা নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। তখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে দিতে পারে, যা ভোক্তার ব্যয় কমালেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করে দেবে।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল এনার্জি পলিসি সেন্টারের বিশ্লেষক অ্যান-সোফি করবু বলেন, “হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কত দিন ব্যাহত হয় এবং কোনো অবকাঠামো ধ্বংস হয় কিনা— এটাই মূল প্রশ্ন।

“বাজার ব্যবস্থা আপাতত চিন্তা করছে যে, সংকট দীর্ঘ হবে না এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোও সুরক্ষিত থাকবে। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। এই সংকটের শেষ কোথায়, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।”

বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। তবে এখন পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের দাম খুব একটা বাড়েনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সময় অনুযায়ী শুক্রবার সকালে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৮৪ ডলারের মতো, যা ইরানে হামলা শুরুর আগের চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি।

অতীতের যুদ্ধ-সংঘাতের তুলনায় এই হার এখনও অনেক কম। ১৯৭৩-৭৪ সালে ওপেকভুক্ত আরব দেশগুলোর নেতৃত্বে তেল সরবরাহে অবরোধ আরোপ করলে তিন মাসে দাম চার গুণ বেড়ে গিয়েছিল।

ওই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর বিশ্বের নির্ভরতা অবশ্য অনেকাংশে কমে যায়।

‘ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের’ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যারা প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে।

ইরান, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত মিলেও প্রতিদিন এত তেল উৎপাদন করে না।

সংরক্ষণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা

‘জেপিমরগান চেইজ’-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদক দেশ— বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা এক মাসের কম সময়ে শেষ হয়ে যেতে পারে।

আর সংরক্ষণ সক্ষমতা ফুরিয়ে গেলে এসব দেশকে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে হবে।

হেলসিঙ্কির হ্যানকেন স্কুল অব ইকোনমিকসের সরবরাহব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ সারাহ শিফলিং বলেন, “এখানে-সেখানে আরও কিছু তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা হয়ত এসব দেশের আছে। বিকল্প হিসেবে পাইপলাইন ব্যবহারের সুযোগও আছে।

“কিন্তু প্রতিদিন গড়ে ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। এ বিপুল পরিমাণ সরবরাহ প্রতিস্থাপন করা অত্যন্ত কঠিন।”

তিনি বলেন, “গুরুত্বপূর্ণ এই সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলার ক্ষমতা রাখে।”

চলতি সপ্তাহে গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকরা অনুমান করেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনকার মতো টানা পাঁচ সপ্তাহ সীমিত থাকলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে ঠেকতে পারে। সবশেষ ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরুর পর ১০০ ডলারে ঠেকেছিল।

শুক্রবার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি সতর্ক করে বলেন, “উৎপাদক দেশগুলো কয়েক দিনের মধ্যেই তেল উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি দেড়শ ডলারে ঠেকতে পারে।”

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল— আইএমএফের অনুমান, তেলের দামে প্রতি ১০ শতাংশ বৃদ্ধিতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ কমে যায়।

তবে এর প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়বে না। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেলের প্রায় ৮০ শতাংশের গন্তব্য এশিয়া।

এশিয়ায় ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো আমদানি করা জ্বালানির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। এসব দেশে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে সবচেয়ে বেশি।

ডালাস ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ লুটজ কিলিয়ান বলেন, “এশিয়া ও ইউরোপে প্রভাবটা বোঝা যাবে সবচেয়ে বেশি।

“চীনের মতো কিছু দেশে পর্যাপ্ত তেল মজুত আছে, যা অস্থায়ী সংকট সামাল দিতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু অন্যদের সেই সক্ষমতা নেই।”

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির একটা বড় অংশও হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। এলএনজির ক্ষেত্রে বিকল্প পথ নেই বললেই চলে। ফলে অনেক দেশে এরই মধ্যে এলএনজির দাম বেড়ে গেছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে ২০ শতাংশ এলএনজি পাঠায় কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ‘কাতার এনার্জি’। ইরান হরমুজ প্রণালি আটকে দিলে সোমবার ইউরোপে এলএনজির দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

করবু বলেন, “গ্যাসের বাজারের প্রভাবটা আর তীব্র হবে। কারণ বাজার আগেই চড়া ছিল। আর ইউরোপে শীত শেষে মজুতও কমে এসেছে। সেখানে এলএনজির কোনো বিকল্প নেই।”

দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আভাস দিয়েছেন, তিনি ইরান যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ চালিয়ে যেতে চান। সেক্ষেত্রে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।

যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বা আশপাশে অন্তত নয়টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়েছে। যার ফলে একাধিক বীমা কোম্পানি উপসাগরীয় অঞ্চলের অনেক জাহাজের বীমা বাতিল করে দিয়েছে।

জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা মেরিনট্রাফিকের হিসাব বলছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে।

শিফলিং বলেন, “অনিশ্চয়তা নিয়েই ভয়টা সবচেয়ে বেশি। সরবরাহ শৃঙ্ক্ষলা অনিশ্চয়তা পছন্দ করে না।

“যেকোনো বিষয় নিয়েই পরিকল্পনা করা সম্ভব, কিন্তু কী ঘটবে, সেটা জানা না থাকলে কাজ এগিয়ে নেওয়াটা কঠিন।”

বুধবার ট্রাম্প জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশনকে’ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন বাণিজ্য সচল রাখতে এই অঞ্চলে জাহাজে বীমা কার্যক্রম শুরু করা হয়।

সঙ্গে তিনি এমন প্রস্তাবও দেন, প্রয়োজনে মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা সহায়তা দিতে পারে।

কিলিয়ান মনে করেন, “ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে পারলে এবং জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা ও বীমা সহায়তা মিললে বৈশ্বিক অর্থনীতি এই যুদ্ধের প্রভাব থেকে দূরে থাকতে পারবে।

“কিন্তু তেল পরিবহনে যদি গুরুতর বিঘ্ন ঘটে, তাহলে তা যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, অর্থনৈতিক ব্যয় তত বাড়তে থাকবে।”