ঈদযাত্রা: নৌপথে ১০ দিন ‘বাল্কহেড’ ও ডিঙি নৌকা চলাচল বন্ধ
এবারের ঈদযাত্রায় নৌ-দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নৌপথে দশ দিন বালুবাহী ‘বাল্ক হেড’ ও ডিঙি নৌকা চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।
পাশাপাশি, রাতের বেলায় স্পিডবোট চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং দিনের বেলায় স্পিডবোটে যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট পরা নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে ১৭ থেকে ২৪ মার্চ নিত্যপ্রয়োজনীয় ও দ্রুত পচনশীল পণ্যবাহী ট্রাক ছাড়া সাধারণ ট্রাক ও কভার্ড ভ্যান ফেরিতে পারাপার বন্ধ রাখা হবে, যাতে যাত্রী পরিবহন নির্বিঘ্ন থাকে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সভাপতিত্বে আয়োজিত প্রস্তুতিমূলক সভায় সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থাগুলোকে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পরে সংবাদ সম্মেলনে নৌপরিবহন মন্ত্রী বলেন, আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নৌপথে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার।
“ঈদকে কেন্দ্র করে নৌপথে যাত্রীচাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এ পরিস্থিতিতে যাত্রীদের নিরাপত্তা, নিরাপদ যাত্রা ও স্বস্তি নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার।”
মন্ত্রী বলেন, ঢাকার জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সড়ক ১৫ রোজা থেকে ঈদের পরে তৃতীয় দিন পর্যন্ত যানজটমুক্ত রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সদরঘাট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, যাত্রী নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ট্রাফিক পুলিশ, নৌপুলিশ, আনসার ও কমিউনিটি পুলিশ সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
শেখ রবিউল বলেন, “কোনো অবস্থাতেই অনুমোদিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা যাবে না এবং লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বা মালামাল বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। লঞ্চের ছাদে যাত্রী উঠানো যাবে না।
“বিআইডব্লিউটিএ অনুমোদিত ভাড়ার তালিকা সকল নদীবন্দর, টার্মিনাল, ঘাট ও নৌযানে দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট নৌযানের রুট পারমিট ও লাইসেন্স বাতিলসহ মালিক ও চালকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
অনিয়ম ঠেকানোর লক্ষ্যে ফেরিঘাট, লঞ্চঘাট ও স্পিডবোট ঘাটে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথাও মন্ত্রী বলেন।
তিনি বলেন, “অভ্যন্তরীণ নৌপথে ফিটনেসবিহীন নৌযান ও ফেরি চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সকল নৌযানকে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চলাচল নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে এবং সিরিয়াল ভঙ্গ বা অনিয়মের ক্ষেত্রে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
“নদীর মাঝপথ থেকে যাত্রী ওঠানো বন্ধে কঠোর নজরদারি থাকবে। নৌপথে ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও যাত্রী হয়রানি প্রতিরোধে বিশেষ করে রাতের বেলায় টহল জোরদার করা হবে।”
এছাড়া, যাত্রী নিরাপত্তা জোরদারে ১৫ রোজা থেকে ঈদের পর তৃতীয় দিন পর্যন্ত প্রতিটি লঞ্চে ন্যূনতম চারজন আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে বলে জানান তিনি।
পাশাপাশি জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে প্রত্যেক ঘাট এলাকায় ভিজিল্যান্স টিম গঠন করা হবে এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং টিম গঠন করে সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করার কথাও বলেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, “দুর্ঘটনা মোকাবেলায় উদ্ধারকারী নৌযান প্রস্তুত রাখা হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দরে অগ্নি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ভাসমান নৌ-ফায়ার স্টেশন স্থাপন করা হবে।
“চাঁদপুরের মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় ঘূর্ণাবর্ত এলাকা চিহ্নিতকরণসহ অন্যান্য নৌরুটে নাব্য চ্যানেল যথাযথভাবে মার্কিং নিশ্চিত করা হবে। সকল নৌচ্যানেল ও ফেরি রুট সার্বক্ষণিক সচল রাখতে প্রয়োজনীয় খনন, পন্টুন স্থাপন ও ঘাট উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা হবে।”
মন্ত্রী বলেন, যাত্রীসেবা উন্নয়নের অংশ হিসেবে নদীবন্দর ও টার্মিনালগুলোতে পানীয় জল, স্যানিটেশন, মোবাইল চার্জিং, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারসহ নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। সদরঘাটসহ সকল নদীবন্দর ও লঞ্চ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ধূমপান নিয়ন্ত্রণে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
“ঈদ উপলক্ষে ঢাকা ও গাজীপুর মহানগর এলাকায় গার্মেন্টস ও নিটওয়্যার খাতের শ্রমিকদের পর্যায়ক্রমে ছুটি দেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাতে একযোগে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ সৃষ্টি না হয়। লঞ্চ ও ফেরিঘাট থেকে দেশের অভ্যন্তরে যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করতে বিআরটিসির পর্যাপ্ত ফিডার বাস সার্ভিস চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং যাত্রীসেবা সংক্রান্ত বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর হটলাইন ১৬১১৩ নম্বরে যোগাযোগ করেত যাত্রীদের আহ্বান জানান মন্ত্রী।
নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ও মো. রাজিব আহসান, নৌপরিবহন সচিব নূরুন্নাহার চৌধুরী এ সময় উপস্থিত ছিলেন।