গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি ‘অগ্রহণযোগ্য’: ইউরোপীয় নেতারা
গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রস্তাবের বিরোধিতা করায় আটটি মিত্র দেশের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের যে হুমকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দিয়েছেন, তার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইউরোপীয় নেতারা।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, এ পদক্ষেপ ‘একেবারেই ভুল’। আর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ একে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে, যা পরে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং কোনো চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে।
ট্রাম্পের ভাষ্য, ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের বিষয়টি তিনি উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে শনিবার গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেন।
বিবিসি লিখেছে, গ্রিনল্যান্ডের জনসংখ্যা কম হলেও এটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিকের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং ওই অঞ্চলের জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, গ্রিনল্যান্ডকে ‘সহজ উপায়ে’ না পেলে ‘কঠিন উপায়ে’ই নেবে ওয়াশিংটন।
ইউরোপীয় দেশগুলো ডেনমার্কের পক্ষে একজোট হয়েছে। তাদের যুক্তি, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নেটোর যৌথ দায়িত্ব হওয়া উচিত।
ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য কথিত নজরদারি মিশনের অংশ হিসেবে সীমিত সংখ্যক সেনা গ্রিনল্যান্ডে পাঠিয়েছে।
শনিবার নিজের ‘ট্রুথ সোশাল’ প্লাটফর্মে নতুন শুল্কের ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, এসব দেশ একটি অত্যন্ত ‘বিপজ্জনক খেলা’ খেলছে। তার ভাষ্য, “এখানে আমাদের গ্রহের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও টিকে থাকার বিষয়টি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।”
তিনি বলেন, আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি পণ্যের ওপর আরোপিত ১০ শতাংশ শুল্ক জুনে বেড়ে ২৫ শতাংশ হবে এবং গ্রিনল্যান্ডের ক্রয়সংক্রান্ত কোনো চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত তা কার্যকর থাকবে।
জবাবে স্টারমার বলেছেন, “নেটো মিত্রদের সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মিত্র দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ করা একেবারেই ভুল। আমরা অবশ্যই এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করব।”
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ বলেন, “এমন প্রেক্ষাপটে শুল্কের হুমকি গ্রহণযোগ্য নয়… কোনো ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে আমাদের পথ থেকে সরানো যাবে না।”
সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন বলেন, “ব্ল্যাকমেইলের কাছে আমরা নতি শিকার করব না।”
তিনি বলেন, “হুমকির জবাব কীভাবে দেওয়া হবে, যৌথভাবে তা ঠিক করতে সুইডেন এখন অন্যান্য ইইউ দেশ, নরওয়ে ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।”
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা বলেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় সবসময় কঠোর অবস্থান নেবে—যা অবশ্যই ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভূখণ্ড থেকেই শুরু হয়।”
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন বলেন, এই হুমকি তার কাছে ‘অপ্রত্যাশিত’ ছিল।
এদিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে রক্ষণশীল ইপিপি গ্রুপের প্রধান, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের জার্মান সদস্য মানফ্রেড ওয়েবার বলেন, গত বছরের আলোচনার পর যে ইইউ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, ট্রাম্পের পদক্ষেপ তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
ব্রাসেলস ও ওয়াশিংটন এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছেছিল, যেখানে ইইউর পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে এবং ২৭ সদস্যের জোট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানিকারকদের জন্য বিনা শুল্কে বাজার খুলে দেবে।
ওয়েবার এক্স পোস্টে লেখেন, “ইপিপি ইইউ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির পক্ষে, কিন্তু গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির কারণে এই মুহূর্তে অনুমোদন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর শূন্য শতাংশ শুল্কের প্রস্তাব স্থগিত রাখতে হবে।”
তবে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, “ডেনমার্কের উত্তরাঞ্চলে যা করা প্রয়োজন, তা করার মত সম্পদ বা সক্ষমতা দেশটির নেই।”
ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের ছাতার নিচে গ্রিনল্যান্ডবাসীর জীবন হবে আরও নিরাপদ, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ।”
ট্রাম্প প্রায়ই বলেন, শুল্ক তার প্রিয় শব্দ। তিনি ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছেন যে, বিভিন্ন দেশের নীতিকে হোয়াইট হাউসের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে শুল্ককে তিনি শক্ত হাতিয়ার হিসেবে দেখেন।
তবে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ প্রশ্নে সম্প্রতি নতুন করে যে প্রচেষ্টা শুরু করেছেন ট্রাম্প, তা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিরোধিতায় বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
বিবিসি লিখেছে, কী কারণে তাৎক্ষণিকভাবে শুল্ক ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তা স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এ বিষয়ে প্রথম ইঙ্গিত দেন।
গত কয়েক সপ্তাহে তিনি বারবার বলেছেন, সামরিক শক্তি ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিকল্প তিনি বিবেচনা করছেন। তবে শুল্কের ঘোষণা এমন সময়ে এল, যার কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের কর্মকর্তারা গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে সম্মত হন।