বসরা নগরীর স্থপতি উতবা ইবনে গাজওয়ান (রা.)
উতবা ইবনে গাজওয়ান (রা.) একজন প্রবীণ মুসলমান। তিনি দুটি হিজরতের অধিকারী। বদর, উহুদ, খন্দক-সহ সকল যুদ্ধে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে শরিক ছিলেন। ১২ হিজরি সনে সংঘটিত ইয়ামামার যুদ্ধেও বীরত্বের সাথে লড়েছেন।
১৪ হিজরি সনে দ্বিতীয় খলীফা উমার (রা.) ইরাকের সামুদ্রিক বন্দর ‘উবুল্লা’, ‘মায়সান’ ও তত্পার্শ্ববর্তী এলাকায় অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দেন উতবা ইবনে গাজওয়ান (রা.)-কে। খলিফা তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নসিহত করে তিন শ সৈন্যের একটি বাহিনী-সহ তাঁকে রওয়ানা করে দেন এবং পশ্চাতে আরও কিছু সৈন্য দিয়ে সাহায্য করা প্রতিশ্রুতিও দেন। সেই বাহিনীর সাথে তাঁর স্ত্রী-সহ অন সৈন্যের আরও পনেরজন মহিলাও ছিলেন।
নতুন অত্যন্ত সুকৌশল অবলম্বন করে উবুল্লায় অভিজান চালান। উবুল্লার কাছাকাছি পৌঁছলে তিনি সৈন্যদের নির্দেশ দেন যে তোমরা ধুলা উড়িয়ে চতুর্দিকে অন্ধকার ছড়িয়ে দাও, যাতে শত্রুরা শঙ্কিত হয়ে আক্রমণের সাহস হারিয়ে ফেলে। অপরদিকে অনেকগুলো পতাকা বর্শার মাথায় বেঁধে দিয়ে মহিলাদের হাতে দিলেন এবং সেগুলোকে মুজাহিদদের পেছনে উঁচু করে ধারণ করতে বলেন।
এভাবে উতবা (রা.) আপন সৈন্যদের নিয়ে উবুল্লায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন। পারস্য-বাহিনী শহর থেকে বেরিয়ে যখন দেখতে পেল দিগন্তজুড়ে ধুলি-অন্ধকার আর অসংখ্য পতাকার উঠানামা, তারা ভাবল এই তো অগ্রবর্তী দল, না-জানি এদের পেছনে কত সৈন্য! ভীত-সন্ত্রন্ত হয়ে তারা পালাতে লাগল। দজলা নদীর তীরে নোঙ্গর করা নৌকাগুলোর উপর লাফিয়ে-লাফিয়ে উঠে পালিয়ে গেল তারা।
অবশেষে তাঁর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে।
বসরা নগরীর স্থাপনা
এরপর সেখানে অবস্থানকালে তিনি দেখলেন, উবুল্লার স্থানীয় বেসামরিক লোকজনের কৃষ্টি-কালচার ছিল বিজাতিদের অনুকূলে। তাদের সাথে মুসলমানদের সহ-অবস্থান ছিল ইসলামী কালচার ও সংস্কৃতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। মুসলমানরা তাদের আচার-আচরণ ও ধ্যান-ধারণার সাথে খুব তাড়াতাড়ি একাকার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করতে লাগলেন উবুল্লা-বিজেতা উতবা ইবনে গাজওয়ান (রা.)। তাই খলিফার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করলেন মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র একটি শহর স্থাপনের। সে-জন্যে প্রস্তাব করলেন উবুল্লার নিকটবর্তী বসরা নামক স্থানের, যেখানে ভারতবর্ষ ও পারস্যের জাহাজগুলো নোঙ্গর করত। খলীফার অনুমতির পর উতবা (রা.) আট শ লোককে সঙ্গে নিয়ে বসরায় যান এবং ‘বসরা নগরী’র ভিত্তি স্থাপন করেন। প্রত্যেক গোত্রের জন্য পৃথক পৃথক মহল্লা নির্ধারণ করেন। নগরীর বাড়িঘর প্রাথমিকভাবে তৈরি করা হয় গাছ পাথর ইত্যাদি দিয়ে। তবে তিনি নিজের জন্য কোনো প্রসাদ নির্মাণ করেননি; বরং কাপড়ের তৈরি একটি তাঁবুতেই তিনি বসবাস করতেন।
এভাবে উতবা ইবনে গাযওয়ান (রা.) নব-স্থাপিত বসরা নগরীর শাসক নিযুক্ত হন। ছয় মাস পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে নিজেই সেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি কামনা করেন খলীফার নিকট।
গভর্নরের পদ থেকে অব্যাহতি প্রার্থনা ও ইন্তেকাল
মুগিরা ইবনে শুবা (রা.)-কে উতবা ইবনে গাযওয়ান (রা.) নিজের স্থলাভিষিক্ত করে হজের উদ্দেশ্যে মক্কায় যান। সেখানে সাক্ষাত্ করেন খলিফা উমর (রা.)-এর সঙ্গে। খলিফার কাছে বসরার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চান বারবার। কিন্তু খলিফা তা প্রত্যাখ্যান করেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও খলিফার নির্দেশ মাথা পেতে নেন। রওয়ানা হন বসরার উদ্দেশ্যে। সওয়ারির ওপর উঠার পূর্ব-মুহূর্তে দোয়া করেন, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে বসরায় ফিরিয়ে নিও না। আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়া কবুল করে নিলেন। পথিমধ্যে ‘মাদানে সালিম’ নামক স্থানে উটের পিঠ থেকে পড়ে যান এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৭৫ বছর। হিজরি সন ছিল ১৭ মতান্তরে ২০।
তবে ইবনে সাদের বর্ণনামতে, উতবা মদিনায় গিয়ে উমর (রা.)-এর সাক্ষাতে মিলিত হন এবং সেখান থেকে বসরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। বসরার অন্তর্গত মাদিনে বনু সুলাইম নামক স্থানে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। তাঁর গোলাম ‘সুওয়াইদ’ তাঁর আসবাবপত্র ও ত্যাজ্যসম্পত্তি খলিফার কাছে পৌঁছে দেন। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি মদিনায় ইন্তেকাল করেছেন।
(সূত্র : আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা : ৩/৭৩; আল-ইসতিআব ৩/১০২৬— ১০২৮; উসদুল গাবাহ : ৩/৪৬১—৪৬২)