৫ ইসলামী ব্যাংকের আমানত ফেরত নিয়ে সংসদে নানা প্রশ্ন
বেসরকারি খাতের শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা কবে, কতটুকু ও কোন শর্তে টাকা ফিরে পাবেন, তা নিয়ে সংসদের প্রশ্নোত্তরে একাধিক সংসদ সদস্য কথা বলেছেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বুধবার সংসদের প্রশ্নোত্তরে অর্থমন্ত্রীর কাছে অন্তত ছয়জন সংসদ সদস্য নানা বিষয়ের অগ্রগতি জানতে চান।
এরমধ্যে ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট, আমানতকারীর টাকা ফেরত, কথিত ‘হেয়ারকাট’, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক চালু হওয়া এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের অগ্রগতির মতো বিষয় ছিল।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ পিএলসি বা এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এবং ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসিকে ব্যাংক রেজল্যুশন স্কিম, ২০২৫ এর আওতায় নেওয়া হয়েছে।
এসব ব্যাংকের দায় ও সম্পদ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে হস্তান্তর করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, স্কিম অনুযায়ী আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রীর যে পাঁচ ব্যাংকের কথা সংসদে বলেছেন, সেগুলো আর্থিক সংকট ও নানা অব্যবস্থাপনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
তাদের একীভূত (মার্জ) করে গঠন করা হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। অনেক শাখার সাইনবোর্ড ইতোমধ্যে পাল্টে ফেলা হয়েছে।
গেল ১ ডিসেম্বর ব্যাংকটিকে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকের মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার দেয় ২০ হাজার কোটি।
এ ব্যাংকের গ্রাহকরা চাহিদামতো আমানত ফিরে পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ আছে।
এ অভিযোগের কথা বুধবার সংসদে তোলেন গোপালগঞ্জ-১ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সদস্য মো. সেলিমুজ্জামান মোল্যা।
তিনি জানতে চান, অর্থ সংকটের কারণে যেসব ব্যাংক তারল্য সংকটে রয়েছে এবং গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে ‘হিমশিম’ খাচ্ছে, সেগুলোর সংকট নিরসনে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, রেজল্যুশনের আওতায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে। আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬ অনুযায়ী ওই পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা করে পরিশোধ করা হচ্ছে।
বর্তমানে আরও যেসব ব্যাংক তারল্য সংকটে রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগ কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সাধারণ আমানতকারীদের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের কথিত ‘হেয়ারকাট’ বা দুই বছরের মুনাফা কেটে রাখার নীতি বাতিল করে সম্পূর্ণ মুনাফাসহ আমানত ফেরতের পরিকল্পনা আছে কিনা, তা জানতে চান।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, শরিয়াহ আইন অনুযায়ী ইসলামী ব্যাংকিংয়ে ব্যাংক মুনাফা করলে আমানতকারীরা মুনাফা পাওয়ার অধিকারী হন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ব্যাংক মুনাফা না করলেও আমানতকারীদের ৪ শতাংশ ‘এহসান’ হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
তবে ‘হেয়ারকাট’ প্রত্যাহার হবে কিনা বা গ্রাহকরা পূরো মুনাফা পাবেন কি না, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বা সময়সীমা অর্থমন্ত্রীর জবাবে আসেনি।
সংরক্ষিত আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, পাঁচ ব্যাংক একীভূত হলেও গ্রাহকরা এখনও টাকা পাচ্ছেন না— এ অভিযোগ সত্য হলে সরকার কী পদক্ষেপ নেবে?
এ প্রশ্নের জবাবেও অর্থমন্ত্রী গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা করে পরিশোধ করা বিষয়টি তুলে ধরেন।
বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তার বলেন, তারল্য সংকটের কারণে যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের সঞ্চিত অর্থ ফেরত দিতে পারছে না, সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রাহকের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করতে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্রাহকের অর্থ দেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক জরুরি তারল্য সহায়তা দিয়েছে। ২০২৬ সালের ১৫ জুন পর্যন্ত জরুরি তারল্য সহায়তা হিসেবে ব্যাংকগুলোকে ৭৫ হাজার ৯০৩ কোটি ১১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
কুড়িগ্রাম-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম জানতে চান, দেউলিয়ার পথে থাকা ব্যাংকগুলো সচলে করতে ‘লুট হওয়া অর্থ’ পুনরুদ্ধারে সরকারের কোনো আলাদা পরিকল্পনা আছে কি না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সৃষ্ট খেলাপি ঋণের টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংক ঋণের অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে ব্যাংকগুলো নয়টি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট সই করে ‘নো উইন নো ফি’ শর্তে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
“প্রথম পর্যায়ে ছয়টি কেইস নিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সেগুলো হল সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন গ্রুপ।”
এ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে বলে সংসদে তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
জামালপুর-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর ও সচল করতে মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা জানতে চান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদে চেয়ারম্যান দেওয়া হয়েছে এবং তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন। পর্ষদে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের জন্য মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়েছে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে।
ব্যাংকটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে সাংগঠনিক কাঠামো, চাকরি প্রবিধানমালা, আইটি, সিবিএস, জনবল ও শাখা একীভূতকরণ এবং কোম্পানি সেক্রেটারি, চিফ ফাইন্যান্স অফিসার ও চিফ টেকনোলজি অফিসার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান তিনি।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের আওতায় পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত হয়। অধ্যাদেশটি আইনে রূপ দিতে গত এপ্রিলে সংসদে পাস হয় ব্যাংক রেজল্যুশন বিল।
ওই বিল পাসের সময় নতুন ‘১৮ক’ ধারা নিয়ে বিতর্ক হয়। ওই ধারায় রেজল্যুশনের আগে থাকা শেয়ারধারী বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে উপযুক্ত বিবেচিত অন্য পক্ষকে শর্তসাপেক্ষে ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনঃধারণ বা ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
দেশে ব্যাংক হিসাব ‘১৯ কোটি ৩২ লাখ’
চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ১৯ কোটি ৩২ লাখ ৫১ হাজার ২৩২টি ।
অর্থমন্ত্রীর হিসাবে, মোট ব্যাংক হিসাবের মধ্যে সঞ্চয়ী ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫টি। আর ঋণ হিসাবের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬৭টি।
শেখ ফরিদের আরেক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২৬ সালের মধ্যে শতভাগ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনার উদ্দেশ্যে সরকার জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল বা এনএফআইএস প্রণয়ন করেছে।
তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার ৬৪ দশমিক ৫০ শতাংশ।
জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু বলেন, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ৭৮ হাজার ২৩৩ দশমিক ৪৪৮ মিলিয়ন ডলার।
এর মধ্যে কনসেশনাল ঋণের অনুপাত ৬১ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং নন-কনসেশনাল ঋণের অনুপাত ৩৮ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ বলে জানান তিনি।
ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে রাজস্ব প্রদানকারী নিবন্ধিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৬। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ সংখ্যা ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেড়েছে।
গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সারের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের আওতায় চলতি অর্থবছরে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এতে দেশের ১৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৩১ জন কৃষক উপকৃত হয়েছেন বলে জানান তিনি।
সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আমিরুল ইসলাম খানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের ৬৩টি ব্যাংক ১১ হাজার ৩২৬টি শাখা এবং ৪ হাজার ৯২৯টি উপশাখার মাধ্যমে পরিচালিত করছে।