নতুন মুখে আস্থা রেখে বিএনপি সরকারের নবযাত্রা
অভ্যুত্থানে সরকার পতন আর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পেরিয়ে নতুন বাস্তবতায় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যাত্রা শুরু হল। তার নেতৃত্বে সরকার পরিচালনায় এবার নবযাত্রা হচ্ছে বিএনপিরও; যাতে নতুনদের ওপরই আস্থা রেখেছেন তিনি।
বাবা-মায়ের পর সরকারপ্রধানের দায়িত্বে আসা বিএনপি চেয়ারম্যান তার বাজি জিততে প্রবীণদেরও রেখেছেন। সংখ্যায় কম হলেও তাদের সঙ্গী করেছেন অর্ধশত জনের নতুন সরকারে।
অতীতে জাতীয় সরকারের ধারণা বিএনপি চেয়ারম্যান দিলেও মন্ত্রিসভায় এর প্রতিফলন দেখা যায়নি। ভোটের আগেই সেখান থেকে সরে আসার বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। তবে আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জোটবদ্ধভাবে ভোটের মাঠে থাকা তিন শরিক দলের নেতাকে যুক্ত করেছেন সরকার পরিচালনার কাজে।
নির্বাসন থেকে ফিরে ক্ষমতার চূড়ায় ওঠা তারেকের মন্ত্রিসভায় মঙ্গলবার সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে হাজির হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকা খলিলুর রহমানের অন্তর্ভুক্তি।
তার বিরুদ্ধে ‘বিদেশি নাগরিক’ হওয়ার অভিযোগ এনে উপদেষ্টার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে একদা উচ্চকণ্ঠও হয়েছিলেন বিএনপির নেতারা। তারেকের প্রথম মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামলানোর ভার তার কাঁধে যাওয়ার বিষয়টি যে কারণে সবার কাছে বিস্ময়ই ঠেকেছে।
এর বাইরে সরকার চালাতে নতুনদের ওপর বাজি রেখেছেন তিনি; তরুণ নেতাদেরও যুক্ত করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে তার এমন পদক্ষেপকে গত ১৭ বছর রাজনীতির মাঠে থাকা ত্যাগীদের মূল্যায়ন হিসেবেই দেখছেন। মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে আর কোনো চমক চোখে লাগছে না তাদের কারও কারও।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, “সরকারের টিমে পরিবর্তন পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের ধারা তৈরি হয়েছে, তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বের মধ্য দিয়ে। নতুন একটা প্রজন্ম শুরু হয়েছে, সেটা আগে ছিল না। নতুন-পুরাতন মিলে টিমটা করা হয়েছে।
“সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল, তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ। এটার প্রধান কারণ হল যে, প্রায় ১৯ বছর নিগৃহীত থাকার পরে একজন ব্যক্তি কর্তৃত্ববাদ-ফ্যাসিবাদ দূর করে তিনি সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হলেন।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, “নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য যে যোগ্যতা, মেধা থাকার কথা বলা হচ্ছিল, সেটা এখানে আছে। আর দ্বিতীয় হলো যে, যারা ত্যাগী নেতাকর্মী ছিল, তাদেরকে জায়গা দেওয়া হয়েছে। তৃতীয়ত, যারা জোটে থেকে বিএনপির দীর্ঘদিনের সঙ্গী ছিল এবং নির্বাচন পর্যন্ত তাদের সাথে ছিল, তাদেরকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
“এখানে বাংলাদেশের একটা তরুণ প্রতিনিধিত্ব আছে। এটা ওনার জন্য না, দলের বিবেচনা দলকে তরুণদের সাথে কানেক্ট করার জন্য। যারা বয়সে তরুণ তাদের অনেককে মন্ত্রিসভায় নিয়ে আসা হয়েছে, যেন তরুণরা তাদের প্রতিনিধিত্ব খুঁজে পায় মন্ত্রিসভায়। এটা দলের ভবিষ্যতের জন্য করা হয়েছে।”
ভোটের পর থেকে আলোচনা ও আগ্রহের কেন্দ্রে থাকা নতুন মন্ত্রিসভায় ‘বিস্মিত’ হওয়ার মতো কিছু না দেখার কথা বলছেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এমন কোনো সারপ্রাইজ নাই। আলোচনা বা গসিপ যা যা ছিল, সে রকমটাই হয়েছে। খুব একটা সারপ্রাইজ না।”
মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “টিমে আগে যারা ছিলেন অনেক আছেন, আবার নতুন অনেকে আছেন। জোটের সঙ্গী আছেন, দুজন বোধহয়। তরুণ আছেন বেশ কয়েকজন। দেখা যাক, কীভাবে পারফর্ম করে। বিস্মিত হওয়ার মত কিছু না। এটাই হওয়ার কথা।”
রাজনীতিক ও বিশ্লেষক মুশতাক হোসেন বলেন, “সব সরকারই নতুন-পুরাতন মিলে করে থাকে। যদি একেবারে সবাই পুরাতন বাদ দিয়ে নতুন করত, তাহলে একটা একটা মন্তব্য করার বিষয় ছিল। বা সবই যদি পুরাতন হতো, তাহলে ও কিন্তু কথা ছিল।
“নতুন-পুরাতনে সমন্বয়, তারপরে বিভিন্ন এলাকার প্রতিনিধির সমন্বয়, বিভিন্ন সেক্টর- যিনি প্রধানমন্ত্রী, তিনি এসব হিসাব করেন।”
মন্ত্রিসভার গঠন কেমন হলো, তা বোঝার জন্য মন্ত্রীদের কার্যক্রম দেখতে অপেক্ষায় থাকার কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, যারা সরকার গঠন করে, তারা বিভিন্ন এলাকা-অঞ্চলকে ভারসাম্য রেখে করেন, নারী-পুরুষ এবং ধর্মীয় অবস্থাকে বিবেচনায় নেন।
“আবার অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন স্বার্থ থাকে, লবি থাকে, সেগুলো তার বিষয়। আমরা সার্বিকভাবে সরকারের পলিসি এটা বাস্তবায়ন করতে কতটুকু পারছে, সেটা ভবিষ্যতে মূল্যায়ন হবে। এখনই তো সবকিছু বলা সম্ভব। এটা প্রধানমন্ত্রী নিজেই জানেন যে, তিনি কোন কোন বিবেচনা করছেন এবং সংবিধান অনুযায়ী তিনি ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য না। আমরা মন্তব্য করতে পারি, কিন্তু তিনি ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য না।”
খলিলুরে ‘বিস্ময়’
এবারের মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে বড় চমক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে জায়গা পাওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে নির্বাচিত সরকারে তার যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বিস্মিত হওয়ার কথা বলেছেন রাজনীতিক ও বিশ্লেষক মুশতাক হোসেন।
তিনি বলেন, “ড. খলিলের অন্তর্ভুক্তিতে আমরা বিস্মিত হয়েছি। কী বিবেচনায় তাকে নেওয়া হয়েছে, এটাও আমরা বুঝতে পারতেছি না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনেক বিতর্কিত কাজের জন্য তাকে দায়ী করা হয়। সেই বিতর্কিত কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে নাকি বর্তমান সরকার, সেটাতো বোঝা মুশকিল।”
তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারে যারা থাকে তাদেরকে ধরা হয় তারা দল নিরপেক্ষ, তাহলে একটা দলীয় মন্ত্রিসভায় তিনি সঙ্গে সঙ্গে ঢুকে পড়লেন, এটা কি প্রশ্নবিদ্ধ হবে না যে, উনি একটা বিশেষ দলের স্বার্থ রক্ষা করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে? এই নৈতিক প্রশ্নটাও কিন্তু আসবে।”
তার নিয়োগের বিষয়ে এক প্রশ্নে অধ্যাপক কাজী মাহবুব বলেন, “হয়ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মনে করেছেন, যাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে বেছে নিয়েছেন, আমরাতো এটুকু জেনেছি, উনার আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ অনেক ভালো। সেই যোগাযোগ কাজে লাগানোর জন্যতো বর্তমান প্রধানমন্ত্রী চাইতেই পারেন। সেই জায়গা থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বাছাই করেছেন।”
অন্তর্বর্তী সরকার থেকে নির্বাচিত সরকারে যাওয়াতে কোনো সমস্যা না থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারও না, নিরপেক্ষ সরকারও না। এখানে নিরপেক্ষতার কোনো ধারণা ছিল না। বিভিন্ন দলের, বিভিন্ন মতাদর্শের অনেককে আমরা বিভিন্নভাবে এই সরকারের অংশ হিসাবে দেখেছি।
“আমার কাছে মনে হয় এটাতে কোনো প্রবলেম নাই। প্রবলেমটা হলো যে, যে লোকটাকে দেওয়া হয়েছে তিনি যদি ব্যর্থ হন, সৎ না হন, শুদ্ধ না হন। তিনি কর্মক্ষম কি-না, তিনি পারবেন কিনা? এখন হয়তো মনে করা হচ্ছে তিনি পারবেন। কিন্তু ভবিষ্যতে পারফরম্যান্স মূল্যায়ন তো হবেই ধারাবাহিকভাবে, জনগণও দেখবে, প্রধানমন্ত্রীও দেখবেন।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খলিলুরের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে লেখক-গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, “এটা নিয়েও অনেক দিন আলোচনা ছিল আসলে, ড. খলিলকে নিয়ে আলোচনা ছিল। তারেক রহমানের ফিরে আসা, তার একটা দূতিয়ালি হয়ত কাজ করেছে, এটা বোঝা যায় আর কি।”
মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারে প্রথমে উপদেষ্টার মর্যাদায় রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টিটিভ হিসাবে দায়িত্ব পান খলিলুর। এরপর তাকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করা হয়।
মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে সহায়তা পাঠাতে জাতিসংঘের উদ্যোগে ‘মানবিক করিডোর’ দেওয়ার আলোচনায় অন্তর্বর্তী সরকার ঢুকলে, তা নিয়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন মহলের তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়।
ওই আলোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে ভূমিকা রাখা খলিলুর রহমানকে ‘বিদেশি নাগরিক’ হিসেবে অভিহিত করে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল বিএনপি।
২০২৫ সালের ১৭ মে খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠে এক সমাবেশে খলিলুরের বিষয়ে কড়া সমালোচনা করেছিলেন নতুন মন্ত্রিসভায় তার সহকর্মী সালাহউদ্দিন।
তিনি বলেছিলেন, “আপনার সরকারে একজন বিদেশি নাগরিককে আপনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করেছেন। আপনার কি সেই আক্কেল-জ্ঞান নাই? একজন বিদেশি নাগরিকের কাছে এই দেশের সেনাবাহিনী নিরাপত্তা সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রদান করবে, কীভাবে ভাবলেন? তিনি মানবিক করিডোরের নামে বাংলাদেশকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করতে চায়।
“বাংলাদেশের মানুষের সাথে আপনি কথা বলেন নাই, এদেশের রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে কোনো আলাপ-আলোচনা করেন নাই। অত্যন্ত অ্যারোগেন্টলি আপনার সেই উপদেষ্টা বলছে, তাতে নাকি কিছু যায় আসে না!”
খলিলুরকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি ওই সময় জানিয়েছিলেন তারেকের নতুন মন্ত্রিসভার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন।
ওই সময় খলিলুরের পদত্যাগ দাবি করে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছিলেন, “রাষ্ট্র নিরাপত্তা নিয়ে পরীক্ষা করার সুযোগ নেই। মানবিক করিডোরের নামে ড. খলিলুর রহমান বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চাচ্ছে, দেশকে অনিরাপদ করতে চাচ্ছে। তাই অতিদ্রুত খলিলুর রহমানের পদত্যাগের দাবি করছি।”
অন্তর্বর্তী সরকারে বড় দুই পদে থাকা খলিলুর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির দরকষাকষি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে জাতিসংঘে সম্মেলন আয়োজনের পাশাপাশি লন্ডনে ইউনূস-তারেক বৈঠক আয়োজনে সামনের সারিতে ভূমিকা রাখেন।
জাতিসংঘে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করা পররাষ্ট্র ক্যাডারের সাবেক এই কর্মকর্তা ২০০১ সালে তৃতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানের একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতির ডিগ্রিধারী খলিলুর ১৯৭৮-৭৯ সালে আমেরিকান এক্সপ্রেস ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংকে নির্বাহী পদে চাকরিরত ছিলেন। ১৯৭৭৮ সালের প্রথম বিসিএসের মাধ্যমে ১৯৭৯ সালে তিনি পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেন।
১৯৮০-৮৩ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন ও আইন ও কূটনীতিতে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি করেন।
পেশাদার কূটনীতিক খলিলুর ১৯৯১ সালে জেনিভায় জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনে (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে জাতিসংঘ সচিবালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। পরের ২৫ বছর জেনিভা ও নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন তিনি।
ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা খলিলুর রহমান প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে উপদেষ্টার মর্যাদা, বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছিলেন।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে খলিলুর সঙ্গে পেয়েছেন শামা ওবায়েদকে। বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শামা দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্যদের একজন। তিনি বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী কে এম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে।
প্রবীণদের সঙ্গে এক ঝাঁক তরুণ
দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতাকে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার যে চল অতীতে দেখা গেছে, সেটি আবারও ফিরিয়ে এনেছেন তারেক রহমান।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয় চালানোর জন্য বেছে নিয়েছেন তিনি।
২০০১ সালে খালেদা জিয়া সরকারেও একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া। তার আগে ১৯৯৬ শেখ হাসিনার প্রথম সরকারে স্থানীয় সরকামন্ত্রী ছিলেন দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান।
এরপর ২০০৯ ও ২০১৪ সালে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।
অবশ্য দ্বিতীয়বার মেয়াদ শেষের আগেই সৈয়দ আশরাফকে ওই মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর আরও দুইবার সরকার গঠন করলেও দলীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে এ মন্ত্রণালয় দেননি শেখ হাসিনা।
খালেদার কারাজীবন ও অসুস্থতা আর তারেকের নির্বাচনের মধ্যে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া মির্জা ফখরুল ২০০১ সালের বিএনপি সরকারে দুই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। প্রথম কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।
মির্জা ফখরুলের মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) থেকে নির্বাচিত এমপি মীর শাহে আলমকে। শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহসভাপতির দায়িত্বে আছেন তিনি।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে মন্দা, কর্মসংস্থানের থমকে থাকা আর সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে পিছিয়ে পড়ার মধ্যে অর্থ ও পরিকল্পনার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে দিয়েছেন তারেক রহমান।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য ২০০১ সালের খালেদা জিয়া সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন। ভাইয়ের কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থ দেখার অভিযোগ ওঠার পর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ২০০৪ সালে মার্চে তাকে সরিয়ে দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।
এ দুই মন্ত্রণালয়ে আমীর খসরুর প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শরিক দল গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান জোনায়েদ সাকিকে দায়িত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান।
ইশতেহার অনুযায়ী ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে নিত্যদিনের বিভিন্ন অর্থনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে তাদেরকে।
এছাড়া বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের পাঁচ লাখ সরকারি শূন্য পদে কর্মচারী নিয়োগ, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়ন করা, পেনশন ফান্ড গঠন ও বেকারভাতা চালু, আইটি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য বাস্তবায়নের দায়িত্বও থাকছে তাদের সামনে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর আসা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বেহাল দশা পেরিয়ে আসা নতুন সরকারে সালাহউদ্দিন আহমদকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করেছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাষ্ট্র সংস্কার উদ্যোগে বিএনপির তরফে প্রধান ভূমিকা রাখা দলীয় এই স্থায়ী কমিটির সদস্যকে আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা উঠেছিল।
২০০১ সালের খালেদা জিয়া সরকারে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা এই নেতা একই দপ্তরে মন্ত্রীও ছিলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ গুম হওয়ার ৬৩ দিন পর সালাহউদ্দিনকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলং শহরে পাওয়া যায়। আইনি জটিলতা ও মামলা মোকাবিলার কারণে তিনি প্রায় নয় বছর সেখানে অবস্থান করেন।
তার দেশে ফেরার পথ সুগম হয় ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর। এর ছয়দিন পর ১১ আগস্ট শিলং থেকে দেশে ফেরেন তিনি। পরে সংস্কার বিষয়ক আলোচনায় দলের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি।
খালেদা জিয়ার ২০০১ সালের সরকারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলানো ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে একই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী করেছেন তারেক।
২০২৩ সালে দুদকের এক মামলায় সাজা হওয়ার মধ্যে দেশ ছেড়ে যান তিনি। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের অক্টোবরে দেশে ফিরে তিনি বলেছিলেন, “পৌনে ২ বছর বনবাসে থেকে ফিরলাম।”
সাজার বিরুদ্ধে আপিলের পর গত সেপ্টেম্বরে ওই মামলার সাজা থেকে খালাস পেয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য।
তার সঙ্গে এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে। সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ছেলে অমিত যশোর-৩ আসন থেকে এমপি হয়েছেন।
কোম্পানি কমান্ডার হিসাবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দেওয়া অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছেন তারেক।
খালেদা জিয়ার দুই সরকারে পানি সম্পদ, পাট এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলানো এই নেতা বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য।
ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে ১৯৯৬ সালের ১৯ মার্চ থেকে ২৯ মার্চ খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
খালেদা জিয়ার ২০০১ সালের মন্ত্রিসভায় প্রথমে পাটমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে ২০০৩ সালের ২২ মে পর্যন্ত ছিলেন। মন্ত্রিসভার রদবদলের পর ওইদিন তাকে পানি সম্পদমন্ত্রী করেন খালেদা জিয়া।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত ওই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলানোর মধ্যে শেষ ছয় মাস বাণিজ্যমন্ত্রীও ছিলেন তিনি।
এক সময় পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দল এবং মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের কৃতী ফুটবলার হাফিজ উদ্দিন ‘ফিফা সেন্টেনারি অর্ডার অব মেরিট’ পদকও পেয়েছেন।
এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসাবে গেরিলা যোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেনকে পেয়েছেন হাফিজ উদ্দিন। ইশরাকের বাবা অবিভক্ত ঢাকার মেয়র ছিলেন।
দেশের প্রতিটি পরিবারের নারী সদস্যের নামে 'ফ্যামিলি কার্ড' দেওয়ার যে উচ্চাভিলাষী ইশতেহার দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, সেখানে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এজেডএম জাহিদ হোসেনকে সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী করেছেন তারেক।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চিকিৎসক জাহিদ হোসেন একজন মূত্ররোগ বিশেষজ্ঞ। বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
জাহিদ হোসেনের দুই মন্ত্রণালয়ে ফারজানা শারমিন পুতুলকে প্রতিমন্ত্রী করেছেন তারেক। খালেদা জিয়ার দুই সরকারে তিন দপ্তরে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন তার বাবা, প্রয়াত ফজলুর রহমান পটল। বাবার নাটোর-১ আসন থেকে এমপি হয়েছেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টুকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী করেছেন তারেক রহমান।
আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে আসা দলীয় এই ভাইস চেয়ারম্যান প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন ফেনী-৩ আসন থেকে।
ব্যাংক-বীমা, আর্থিক খাত, কৃষি, তৈরি পোশাক, রাসায়নিকসহ বিভিন্ন খাতের এই ব্যবসায়ী বর্তমানে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান।
তার সঙ্গে এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাগেরহাট-৩ (মোংলা ও রামপাল) আসন থেকে নির্বাচিত এমপি শেখ ফরিদুল ইসলামকে।
এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সরকারে প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদকে মায়ের মতো ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছেন তারেক।
জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে ১৯৮৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন কায়কোবাদ। ১৯৯০ সালের ২ মে থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে তিনি বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০০২ থেকে একবছর পুনরায় ধর্মপ্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু নতুন মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পেয়েছেন ভূমিমন্ত্রী হিসেবে। তার সঙ্গে বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামালকে দেওয়া হয়েছে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে। আইনজীবী কায়সার কামাল নেত্রকোনা-১ (সদর-দুর্গাপুর) আসনের এমপি।
এরশাদের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরীকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করেছেন তারেক।
নিতাই রায় চৌধুরী ১৯৮৮ সালে মাগুরা-২ আসন থেকে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দায়িত্ব পালন করেন মন্ত্রীর মর্যাদায় মাগুরা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে।
এরপর তিনি ১৯৯০ সালের ২ মে থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী এবং এরপর থেকে ওই বছর ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকার পতনের আগ পর্যন্ত যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছেন আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ামকে। রাজবাড়ী-১ (সদর ও গোয়ালন্দ) আসনে দ্বিতীয়বারের মতো এমপি হয়েছেন তিনি।
প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভায় আসা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে তিন মন্ত্রণালয়- বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটের মন্ত্রী করেছেন তারেক রহমান।
২০১৬ সাল থেকে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসা এই ব্যবসায়ী সিলেট-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার বাবা খন্দকার আবদুল মালিকও এই আসনের তিনবারের সদস্য সদস্য ছিলেন।
মুক্তাদিরের সঙ্গে তিন মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে রাখা হয়েছে কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মো. শরিফুল আলমকে। কিশোরগঞ্জ- ২ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
সিলেটের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন তারেক।
বর্তমানে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আরিফ এর আগে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
ছাত্রদলের রাজনীতি পেরিয়ে আসা এই নেতা ২০০৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হন। সেই সঙ্গে তিনি তখন সিটি করপোরেশনের নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন।
আরিফুল হক ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগের প্রয়াত মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে হারিয়ে প্রথমবার মেয়র হন। ২০১৮ সালে পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের চারটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। একমাত্র সিলেটে বিএনপি থেকে আরিফুল হক মেয়র নির্বাচিত হন। তবে সর্বশেষ ২০২৩ সালে বিএনপি সিটি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় তিনি প্রার্থী হননি।
বিএনপি জোটের শরিক গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি মো. নুরুল হক নুরকে আরিফুলের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী করেছেন প্রধানমন্ত্রী। পটুয়াখালীর গলাচিপা-দশমিনা আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন ডাকসুর সাবেক ভিপি নুর।
নিজের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য জহির উদ্দিন স্বপনকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন তারেক। বরিশাল-১ আসন থেকে নির্বাচিত এই এমপি বিএনপির মিডিয়া সেলের সাবেক আহ্বায়ক।
ছাত্রজীবনে বামধারায় রাজনীতি যুক্ত থাকা স্বপন বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্বপনের সঙ্গে ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসনের এমপি ইয়াসের খান চৌধুরীকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন তারেক। নান্দাইল উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইয়াসের দলটির দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতা।
তার বাবা মো. আনোয়ারুল হোসেন খান চৌধুরী এবং খুররম খান চৌধুরী ওই এলাকার এমপি ছিলেন। বিবিসি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক লন্ডন এর তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছেন ইয়াসের।
নতুন সরকারের দায়িত্বে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হয়েছেন কুমিল্লা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াছিন, যিনি এর আগে ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন।
কৃষক কার্ড ও কৃষি বীমা চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে জয়ী বিএনপি তাকে দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব। একইসঙ্গে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর দপ্তর সামলাবেন তিনি।
ইয়াছিনের সঙ্গে এই তিন মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে দিয়েছেন তারেক রহমান। ছাত্রদল এবং যুবদলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই নেতা বর্তমানে বিএনপির প্রচার সম্পাদক। টাঙ্গাইল সদর আসন থেকে প্রথমবারের মতো এমপি হয়েছেন তিনি।
প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন মানিকগঞ্জ-৩ (সদর ও সাটুরিয়া) আসনের আফরোজা খানম (রিতা)।
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রিতাকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করেছেন তারেক।
তিনি মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান। তার বাবা প্রয়াত শিল্পপতি হারুনার রশিদ খান মুন্নু ছিলেন মানিকগঞ্জ-২ এবং মানিকগঞ্জ-৩ আসনে চারবারের সংসদ সদস্য। খালেদা জিয়ার ২০০১ সালের সরকারে মন্ত্রী ছিলেন তিনি।
রিতার সঙ্গে এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির কোষাধ্যক্ষ এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। জামালপুর-১ আসন থেকে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন তিনি।
২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারে আসা তারেক রহমান পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিকে।
ছাত্রদলের রাজনীতি পেরিয়ে বিএনপিতে আসা এ্যানি লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য থেকে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
এ্যানি তার মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসাবে পেয়েছেন পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য ফরহাদ হোসেন আজাদকে। তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির পল্লী উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক ও পঞ্চগড় জেলা বিএনপির সদস্যসচিব।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারে আসা তারেক রহমান তার সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করেছেন আসাদুল হাবিব দুলুকে।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক দুলু ওই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে গড়ে ওঠা ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন’ এর প্রধান সমন্বয়কারী।
আসাদুল হাবিব দুলু যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপমন্ত্রী এবং লালমনিরহাট সদরের প্রাক্তন সংসদ সদস্য। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপমন্ত্রী ছিলেন।
ময়মনসিংহ-৩ (গৌরিপুর) আসনের এমপি ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেইনকে দুলুর সঙ্গে একই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করা আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামানকে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করেছেন তারেক।
অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ ছেড়ে ঝিনাইদহের শৈলকুপা আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করার ক্ষেত্রে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দলীয় নীতি অনুযায়ী এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব উঠছে তার কাঁধে।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক জাকারিয়া তাহের সুমনকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করেছেন তারেক।
জাকারিয়া তাহের কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি সুমন কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসন থেকে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
তার সঙ্গে পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আহম্মদ সোহেল মঞ্জুরকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করেছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী।
রাঙামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান নতুন সরকারে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।
জুডিশিয়াল সার্ভিসে ১৯ বছর চাকুরি শেষে রাজনীতিতে আসা এই নেতা বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক।
তার বাবা প্রয়াত সুবিমল দেওয়ান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সরকারে মন্ত্রী পদমর্যাদায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব করেছেন।
দীপেন দেওয়ানের সঙ্গে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে। বিএনপির দ্বিতীয় প্রজন্মের এই নেতা চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক। বাবা মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার সরকারে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে 'মিড ডে মিল' বা দুপুরের খাবার, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস এবং বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসা বিএনপির নতুন সরকারে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
মা খালেদার মতো তারেকের মন্ত্রিসভাতেও জায়গা পাওয়া মিলন চাঁদপুর-১ আসন থেকে মোট তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারে তিনি শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সেই সময়ে তিনি পরীক্ষার হলে নকল মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী ব্যাপক অভিযান শুরু করেন। এতে সফল হলে আলোচনায় আসেন তিনি।
মিলনের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ববি হাজ্জাজকে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দপ্তর দিয়েছেন তারেক। বিএনপির জোটসঙ্গী এনডিএমের চেয়ারম্যান দল ছেড়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন।
এক লাখ স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা দিয়ে আসা বিএনপি নতুন সরকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করেছে মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলকে।
নরসিংদী-৪ (মনোহরদী-বেলাবো) আসন থেকে চার বারের এই এমপি নরসিংদী সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস ছিলেন।
তার সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের এমপি এম এ মুহিতকে। পেশায় চিকিৎসক মুহিতের মামা টুকু নতুন সরকারের বিদ্যুৎ মন্ত্রী হয়েছেন।
মন্ত্রিসভায় আরেক নতুন মুখ ফকির মাহবুব আনাম স্বপনকে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন তারেক।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য স্বপন ফকির টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর) আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ রবিউল আলমকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং নৌ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর দপ্তর সামলাবেন তিনি।
৪৮ বছর বয়সী এই রাজনীতিক ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ধানমন্ডি থানা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বেও রয়েছেন। ঢাকা-১০ (ধানমন্ডি) আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
আরেক তরুণ নেতা হাবিবুর রশিদ হাবিবকে এই তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসাবে রেখেছেন তারেক রহমান। নির্বাচনি প্রচারে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ অবস্থান রেখে প্রশংসিত হয়েছিলেন ছাত্রদলের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদক।
ওই তিন মন্ত্রণালয়ে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মো. রাজীব আহসানকেও প্রতিমন্ত্রী হিসাবে রেখেছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসন থেকে এমপি নির্বাচতি রাজীব স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
জনপ্রশাসন সামলাতে অন্তর্বর্তী সরকার বেশ হিমশিম খেয়েছে। নতুন সরকারের জন্যও এটি বেশ চ্যালেঞ্জের। এ মন্ত্রণালয়ে কাউকে দায়িত্ব দেননি নতুন প্রধানমন্ত্রী। তারমানে এটা তার হাতেই থাকছে।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সচিব মো. আব্দুল বারীকে। জয়পুরহাট-২ আসনের এই এমপি বেশি পরিচিত ‘ডিসি বারী’ নামে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে কাউকে পূর্ণমন্ত্রী না করে সাবেক ফুটবলার আমিনুল হককে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন তারেক। ঢাকা-১৬ আসনে ভোটে হেরে যাওয়া আমিনুলকে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় এনেছেন তিনি।
জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক আমিনুল বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ক্রীড়া সম্পাদক এবং ঢাকা উত্তর বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন।