সোমবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ফাল্গুন ১১ ১৪৩২, ০৬ রমজান ১৪৪৭

ব্রেকিং

পুলিশের কাজে অবৈধভাবে কেউ বাধা দিতে পারবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ত্রয়োদশ সংসদ: প্রথম অধিবেশনের ডাক রাষ্ট্রপতির অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চাঁদাবাজি বেড়েছে ২০-৫০%: ঢাকা চেম্বার গোপালগঞ্জে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুপক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১ মঈদুল হাসান, মোহন রায়হানসহ ৯ জন পাচ্ছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার তুষারঝড়ে বিপর্যস্ত যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, ৫ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা ছিল শতভাগ: রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত সরকার পছন্দের লোক বসাবে, এটাই স্বাভাবিক: তাজুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ নেপালে যাত্রীবাহী বাস গিরিসঙ্কটে পড়ে পর্যটকসহ নিহত ১৯ নড়াইলে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ৪ চট্টগ্রামে রান্নাঘরে গ্যাস `বিস্ফোরণে` দগ্ধ ৯, সবার অবস্থা ‘আশঙ্কাজনক` মেক্সিকোর শীর্ষ মাদক কারবারি ‘এল মেনচো’ সামরিক অভিযানে নিহত

পর্যটন

তেঁতুলিয়াতীরে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী: রহস্যঘেরা ঘসেটি বিবির মসজিদ

 প্রকাশিত: ২০:৩৩, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

তেঁতুলিয়াতীরে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী: রহস্যঘেরা ঘসেটি বিবির মসজিদ

পটুয়াখালীর উপকূলঘেঁষা জনপদে ইতিহাস যেন নীরবে শ্বাস নেয় ইটের গাঁথুনিতে। কালের আবর্তে বহু স্থাপনা বিলীন হলেও কিছু নিদর্শন এখনো অতীতের সাক্ষ্য বহন করে দাঁড়িয়ে আছে অবিচল। তেমনি এক রহস্যঘেরা মোগল আমলের স্থাপনা জেলার বাউফল উপজেলার শৌলা গ্রামে তেঁতুলিয়া নদীর তীরে অবস্থিত ‘ঘসেটি বিবির মসজিদ’। ছোট আকারের দোতলা এ ইটের মসজিদ শুধু স্থাপত্যশৈলীর কারণেই নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস ও লোককথার জন্যও এলাকাবাসীর কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বহু বছর আগে নির্মিত এ মসজিদটি নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে এখনো টিকে আছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এটি নবাব সিরাজউদ্দৌলার খালা ঘসেটি বেগমের নামে নির্মিত। 

তবে কেউ কেউ মনে করেন, উপমহাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে ধর্মীয় অনুরাগ থেকেই তিনি এ অঞ্চলে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো শিলালিপি বা লিখিত দলিল এখনো পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, স্থানীয়দের একটি অংশের বিশ্বাস ভিন্ন। তাঁদের মতে, এটি নবাব পরিবারের সেই ঘসেটি বেগমের নির্মাণ নয়; বরং অন্য এক ধর্মপ্রাণ নারী, যিনি হজব্রত পালন শেষে মক্কা-মদিনা থেকে ফিরে এসে নিজের বসবাস ও ইবাদতের জন্য দোতলা এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। কথিত আছে, নিচতলায় নামাজ আদায় হতো এবং ওপরতলায় তিনি অবস্থান করতেন। এ নিয়ে এলাকায় এখনো নানা গল্প প্রচলিত রয়েছে।

কালাইয়া ইউনিয়নের শৌলা গ্রামের বাসিন্দা মো. হাসনাইন বলেন, ‘আমাদের দাদারা বলতেন, আজানের সময় নাকি মসজিদের আশপাশ থেকে সাপ বের হতো। কিন্তু কাউকে কখনো ক্ষতি করত না। সবাই এটাকে অলৌকিক ঘটনা মনে করত।’ 

স্থানীয় আরেক প্রবীণ বাসিন্দা আমেনা খাতুন জানান, ‘ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, এখানে এক সাধ্বী মহিলা থাকতেন। তিনি খুব পরহেজগার ছিলেন। তাঁর কারণেই জায়গাটা পবিত্র বলে মানুষ মনে করে।’

স্থানীয় তরুণ সমাজকর্মী ইমরান হোসেন বলেন, ‘এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হলেও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পর্যটন বা সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। সামান্য সংস্কার ও প্রচারণা থাকলে এটি বাউফলের অন্যতম দর্শনীয় স্থান হতে পারে।’ তাঁর মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এলাকাবাসীও সংরক্ষণে এগিয়ে আসবে।

মসজিদটির স্থাপত্যেও রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ছোট আকৃতির হলেও দোতলা নির্মাণশৈলী এ অঞ্চলে বিরল। ইটের গাঁথুনি ও খিলানধর্মী দরজার নকশা মোগল আমলের স্থাপত্যরীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা। বর্তমানে মসজিদটির কিছু অংশ জীর্ণ হয়ে পড়েছে। যথাযথ সংরক্ষণ না থাকায় প্লাস্টার খসে পড়ছে, দেয়ালে ধরেছে শ্যাওলা।

সরকারি বরিশাল বিএম কলেজ (ব্রজমোহন কলেজ) এর ইতিহাস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মো. গোলাম মোর্শেদ বলেন, “ঘসেটি বিবির মসজিদ আমাদের দক্ষিণাঞ্চলের ইসলামি স্থাপত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এর স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণরীতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি মোগল আমলের শেষ ভাগে কিংবা তার কিছু পরে নির্মিত হতে পারে। স্থানীয় ইতিহাস গবেষণায় মনোযোগ বাড়ানো গেলে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব।” 

তিনি আরও বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের মাধ্যমে সঠিক সময়কাল নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের প্রতি।

তেঁতুলিয়া নদীর কোলঘেঁষা নির্জন পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা এ মসজিদ আজও অতীতের নীরব স্বাক্ষী। 

ইতিহাস, লোককথা ও স্থাপত্য—সব মিলিয়ে এটি কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যের অমূল্য অংশ। যথাযথ গবেষণা ও সংরক্ষণ উদ্যোগ না নিলে সময়ের স্রোতে হারিয়ে যেতে পারে ইতিহাসের এ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—এমন আশঙ্কাই করছেন সচেতন মহল।

এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সালেহ আহমেদ বাসসকে বলেন, ঘসেটি বিবির ঐতিহাসিক মসজিদটি সংরক্ষণ ও এর ঐতিহ্য রক্ষায় উপজেলা প্রশাসন উদ্যোগ নেবে। “আমরা শিগগিরই একটি টিম নিয়ে সরেজমিনে মসজিদটি পরিদর্শন করব। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো হবে,” বলেন তিনি। 

তিনি আরও জানান, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করা হবে।