আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা ছিল শতভাগ: রাষ্ট্রপতি
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কঠিন সময় পার করার কথা জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া মো. সাহাবুদ্দিন।
তিনি বলেছেন, মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকার যেমন তাকে অপসারণের চেষ্টা চালিয়েছে, তেমনই বিদেশ সফর আটকানো, কূটনৈতিক মিশন থেকে ছবি নামিয়ে ফেলা, প্রেস উইংকে অপসারণের মত ঘটনাও ঘটিয়েছে।
গত শুক্রবার রাতে দৈনিক কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপ্রধান। সোমবার পত্রিকাটি সেই সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন ৭৫ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন। এক সময় তিনি ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার, তখন দেশের মানুষ তাকে সাহাবুদ্দিন চুপপু নামে চিনত।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর বাইরে পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।
দায়িত্ব নেওয়ার ১৬ মাসের মাথায় অভাবনীয় এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন তিনি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে শেখ হাসিনা চলে যান ভারতে।
হাসিনা আমলের কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকলেও অনিবার্য পরিণতির মত বঙ্গভবনে থেকে যান মো. সাহাবুদ্দিন। তাকেই সংসদ বিলুপ্ত করার আদেশ দিতে হয়েছে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়াতে হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে অধ্যাদেশে পরিণত করতে তাকেই সই দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সারতে হয়েছে। এমনকি নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নতুন সরকারও রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে শপথ নিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নানা ‘চক্রান্ত’ হয়েছে দাবি করে মো. সাহাবুদ্দিন সাক্ষাৎকারে বলেন, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ‘চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা’ হয়েছে।
“আমি দৃঢ়চিত্তে আমার সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম। যে কারণে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি। বিশেষ করে অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে।”
তার এ দুঃসময়ে বিএনপির কাছ থেকে ‘শতভাগ সমর্থন’ পাওয়ার কথা বলেছেন রাষ্ট্রপ্রধান।
তার কাছে প্রশ্ন ছিল, আপনার পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। বঙ্গভবন অভিমুখে মিছিল হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে। সে পরিস্থিতিতে বঙ্গভবনের ভেতরের পরিবেশ কেমন ছিল?
জবাবে মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, “আমাকে কতভাবে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে! কোনো পরিস্থিতিতেই আমি ভেঙে পড়িনি। আমি বলেছি, আমার রক্ত ঝরে যাবে বঙ্গভবনে। রক্ত ঝরে ঝরুক। আরেক ইতিহাসে আমি যোগ হব।
“কিন্তু আমি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব—আমি এই সিদ্ধান্তেই অবিচল ছিলাম। আল্লাহর ইচ্ছা আর আমার দৃঢ়তা।”
কালের কণ্ঠর প্রশ্ন ছিল, কে বা কাদের নেতৃত্বে ওই আন্দোলন হয়েছিল? কেনই বা আপনার প্রতি এত আক্রোশ ছিল তাদের?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “২২ অক্টোবর ২০২৪, বঙ্গভবন ঘেরাও হল। অমুকের দল, তমুকের দল, মঞ্চ, ঐক্য—কত কী! রাতারাতি সৃষ্টি! এগুলো একই টাইপের লোকজন সব বিভিন্ন ফোরামে, বিভিন্ন নামে। কোথায় তারা এত টাকা পেল?
“এখানে যখন ঘেরাও করল, সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন থেকে ফোর্স এসে তিন স্তরে নিরাপত্তা দিল। তারপর ওই যে মেয়েটা, লাফ দিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার ওপরে উঠে ঝাঁপ দেয়। কী আশ্চর্যের ব্যাপার! এগুলো ভাড়াটিয়া। তারপর যখন সাউন্ড গ্রেনেড মারা হলো, লাফ দিয়ে পড়ল। পড়ার পর সে পড়েই থাকবে, ছবি তোলা হবে। সে ডাকছে ক্যামেরাম্যানকে যে ছবি তোলো, ছবি তোলো।
“মানে এটা দিয়ে সে ব্ল্যাকমেইল করবে। তারপর তাকে মহিলা পুলিশ দিয়ে আর মহিলা আর্মি দিয়ে টেনেহিঁচড়ে তুলে আর্মির জিপে করে নিয়ে যায়।”
রাষ্ট্রপতি বলেন, “ওই রাতটা আমার জন্য ছিল বিভীষিকাময়। এই যে ফ্লাইওভার, এই ফ্লাইওভার দিয়ে ওই পেছনে, ওদিকে খালি ঠেলাগাড়ি, ভ্যান, কভার্ড ভ্যান দিয়ে চারদিকে ছিন্নমূল লোকজন আসে। গণভবনের মত বঙ্গভবনও লুট করতে চেয়েছিল।
“আমরা তো ঘরেই ছিলাম। আমাদের তো আর কিছু নেই, এখান থেকে তো আমি পালাব না, তাই না? সেই অবস্থা যদি হত, তখন একটা কথা ছিল। তিন স্তরের নিরাপত্তা দিয়ে কভার করা হয়েছে। সেনাবাহিনী খুব দৃঢ়তার সঙ্গে, আবার এপিসি দিয়ে ঠেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।”
ওই রাতের বর্ণনায় রাষ্ট্রপ্রধান সাহাবুদ্দিন বলেন, “রাত ১২টার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা তখনকার তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফোন করল, ‘এ রকম একটা খবর পাওয়া গেছে, ওরা আমাদের লোক না। আমি এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছি।”
“তারপর দেখি, হ্যাঁ, কিছু স্থানীয় লোক এসে ওদের নিয়ে যায়। কিন্তু কিছু লোক আবার থেকে যায়। তাদের সরাতে রাত ২টা বেজেছে। রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত আমরা তো জেগে আছি। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় তারা মিটিং করছে- রাষ্ট্রপতির অপসারণ চাই, রাষ্ট্রপতির অপসারণ চাই। রাজু ভাস্কর্যের ওখানে, তারপর বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন ছোট ছোট গ্রুপ করে তারা এটা চায়।”
রাষ্ট্রপতির কাছে প্রশ্ন ছিল, সেই দুঃসময়ে কাউকে পাশে পেয়েছিলেন?
জবাবে তিনি বলেন, “আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তারা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।
“বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।”
রাষ্ট্রপতি বলেন, “বিএনপি থেকে উচ্চপদে আসীন নেতা আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, ‘আপনার প্রতি আমাদের সমর্থন আছে। আমরা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখতে চাই। কোনো অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের পক্ষে আমরা নই’।
“আমি বলব যে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা একটা গ্রুপ হয়ে যায়। আর আরেকটা গ্রুপ হয়ে যায়, তাদের আপনারা সবাই চেনেন। তবে তারা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। উদ্যোগটা ব্যর্থ হল বিএনপি ও তাদের জোটের কারণে। একটা বৃহত্তর রাজনৈতিক দল যে স্ট্যান্ডটা নিয়েছে, সেটাকে সরকার তখন সমর্থন করতে বাধ্য হল।”
কালের কণ্ঠের প্রশ্ন ছিল, এরপর নতুন করে আর কোনো উদ্যোগ ছিল উৎখাতের?
জবাবে সহাবুদ্দিন বলেন, “হ্যাঁ, বলতে গেলে শেষ সময় পর্যন্ত তারা চেষ্টা করে গেছে—কীভাবে আমাকে উপড়ে ফেলা যায়। রাজনৈতিক পর্যায় থেকে ওই উদ্যোগটা ব্যর্থ হলে খোদ অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেই নতুন করে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
“আজকে বলতে দ্বিধা নেই যে একটা অসাংবিধানিক উপায়ে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে এসে আমার জায়গায় বসানোর চক্রান্ত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই মুভটা হয়েছে।
“আমি বিষয়টি জেনেছি। সরকারের পক্ষ থেকে একজন উপদেষ্টা ওই বিচারপতির শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তারা ঘণ্টাব্যাপী মিটিং করেন। তবে ওই বিচারপতি রাজি হননি। উনি সাফ বলে দিয়েছিলেন, ‘উনি রাষ্ট্রপতি, উনি সবার ঊর্ধ্বে সাংবিধানিকভাবে, সবকিছুর ওপরে। ওই জায়গায় আমি অসাংবিধানিকভাবে বসতে পারি না।’ ওই বিচারপতির দৃঢ়তার কারণে শেষ পর্যন্ত সরকারের ওই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়।”
কালের কণ্ঠ জানতে চায়, সেই সময় রাষ্ট্রধানের দৃঢ় মনোবলের নেপথ্যে কী ছিল, কেউ কি সাহস জুগিয়েছিল?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, “সত্যি বলতে, একা আমার পক্ষে মনোবল ঠিক রাখা কঠিন হত, যদি না অনেকের আশ্বাস বা অভয় বাণী না পেতাম।
“বিশেষ করে বিএনপির সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আমাকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিল যে আমি যেন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় অবিচল থাকি। কোনো অবৈধ উপায়ে রাষ্ট্রপতি অপসারণের পক্ষে তারা নয়।
“এ ছাড়া তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে আমাকে সর্বোচ্চ সমর্থন দিয়েছে। তারা শুধু একটা কথাই বলেছে, ‘মহামান্য, আপনি হচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। আপনার পরাজিত হওয়া মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীরই পরাজিত হওয়া। এটা আমরা যেকোনো মূল্যে রোধ করব।’ শেষ পর্যন্ত তারা এটা করেছে। তারা বিভিন্ন সময় আমার কাছে এসে আমাকে মনোবল দিয়েছে।
“শুধু তাই নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকে আরেকবার আমাকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে শুনেছি। তখনো তিন বাহিনীর প্রধানরা আমার পক্ষে অবস্থান নেন। তারা তাদের এই অভিমত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানকেও গিয়ে জানান যে কোনো অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ড তারা হতে দেবেন না। বঙ্গভবনের সামনে যখন মব সৃষ্টি করা হয়, তখনো সশস্ত্র বাহিনী ওই অবস্থান নিয়েছিল।”
ইউনূসের ভূমিকা কী ছিল
কালের কণ্ঠের একটি প্রশ্ন ছিল, অপসারণ চেষ্টার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি তখনকার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কি না?
জবাবে রাষ্ট্রপ্রধান সাহাবুদ্দিন বলেছেন, “ওই পরিস্থিতিতে ড. ইউনূসের কাছ থেকে কোনো ফোন পাইনি। আমার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো অবস্থানেই তিনি ছিলেন না। অবশ্য উনাকেও আমি সাহায্য চেয়ে কোনো আবদার করিনি।
“আমার মনোভাব ছিল, যা হচ্ছে হতে থাকুক, দেখা যাক কতদূর গড়ায়। তবে আমি এটুকু বলতে পারি যে, কূটনৈতিক মহল থেকেও আমাকে অপসারণ করার বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান ছিল।
“আমি এভাবে অসাংবিধানিক ও বেআইনিভাবে অপসারিত হই, সেটা তারাও চায়নি। এটাও বড় শক্তি ছিল। তবে আমি সব সময় স্বীকার করি যে বিএনপি এবং তার জোট অন্যের প্ররোচনায় প্রলুব্ধ হয়নি। তারা নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল ছিল।”
রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা কি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সমন্বয় করেছিলেন?
এ প্রশ্নের উত্তরে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা সংবিধানের কোনো বিধান মেনে চলেননি। সংবিধানে বলা আছে, উনি যখনই বিদেশ সফরে যাবেন, সেখান থেকে ফিরে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবেন এবং আমাকে ওই আউটপুটটা জানাবেন।
“কী আলোচনা হল, কী হল, কোনো চুক্তি হল কি না, কী ধরনের কথাবার্তা হল, এটা আমাকে লিখিতভাবে অবহিত করার কথা। তো, উনি তো বোধহয় ১৪ থেকে ১৫ বার বিদেশ সফরে গেছেন। একবারও আমাকে জানান নাই। একবারও আমার কাছে আসেননি।”
কালের কণ্ঠ জানতে চায়, তার মানে নির্বাচনের আগে সর্বশেষ যে চুক্তিটি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, সে বিষয়েও আপনি অবগত নন?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “না, কোনো কিছুই আমি জানি না। এ রকম রাষ্ট্রীয় একটা চুক্তি অবশ্যই আমাকে জানানো দরকার ছিল। এটা ছোটখাটো হোক আর বড় কিছু হোক, অবশ্যই পূর্ববর্তী সরকারপ্রধানরা রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছেন। আর এটি হলো সাংবিধানিক একটা বাধ্যবাধকতা।
“কিন্তু তিনি তো তা করেননি। মৌখিকভাবেও জানাননি, লিখিতভাবেও জানাননি। আসেনওনি। আর এমনিতেই তো উনার আসার কথা!”
সাক্ষাৎকারগ্রহীতারা জানতে চান, তার মানে, গত দেড় বছরে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আপনার স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিল না? সমন্বয়ও ছিল না?
জবাবে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “উনি যে প্রধান উপদেষ্টা হলেন, সেই প্রক্রিয়ার উৎসই ছিলাম আমি। অর্থাৎ, আমার উদ্যোগেই এই সরকার গঠনের প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা পরবর্তী সময়ে আমার সঙ্গে সেভাবে সমন্বয় করেননি।
“এটি আসলে বোঝানোর কোনো উপায়ও নেই। কেননা তিনি একটিবারের জন্যও আমার কাছে আসেননি। আমাকে সম্পূর্ণভাবে আড়ালে রাখার চেষ্টা করে গেছেন। আমার দুইবার বিদেশ সফর উনি আটকে দিয়েছেন।”
বিদেশ সফর আটকানোর একটি ঘটনা তুলে ধরতে গিয়ে সাহাবুদ্দিন বলেন, “কাতারের আমির আমাকে দাওয়াত করল ওখানে একটা সামিটে অংশগ্রহণের জন্য। রাষ্ট্রপতি অ্যাড্রেস করবেন। সেই সেমিনারে রাষ্ট্রপতি ছাড়া আর কেউ থাকবে না। তখন আমার কাছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমাকে একটি চিঠি দেওয়া হল। চিঠিটি বানিয়ে দেওয়া হল, তারাই ড্রাফট করল।
“ড্রাফট করে আমার কাছে পাঠায়। আর ওই দাওয়াতপত্রটাও পাঠায়। চিঠিটার মধ্যে ছিল যে, ‘আমি রাষ্ট্রীয় কাজে ভীষণ ব্যস্ত’। সুতরাং এই সেমিনারে অংশগ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি দুঃখিত। ওই চিঠিতে আমি যেন সই করে দিই।”
কালের কণ্ঠ জানতে চায়, আপনি কি সত্যিই রাষ্ট্রীয় জরুরি কাজে ব্যস্ত ছিলেন?
হেসে সাহাবুদ্দিন উত্তর দেন, “একজন রাষ্ট্রপতি কি এত বেশি ব্যস্ত থাকে, আমাদের সংবিধানের আলোকে? যাই হোক, পরে আমি ওই চিঠিতে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে পাল্টা একটি চিঠি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাই।
“তাতে আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমন শিষ্টাচারবহির্ভূত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই। ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের অপরাধ না করা হয়, সে বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে চিঠি দিই। ওই চিঠির জবাবে তারা নিরুত্তর ছিল। তবে এরপর আর কোনো দেশ থেকে আমন্ত্রণ এসেছিল কি না, সে বিষয়ে জানার সুযোগও হয়নি।”
কেবল বিদেশ নয়, দেশের অনুষ্ঠান বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির যাওয়ার কথা থাকলেও তা আটকানো হয় বলে অভিযোগ রাষ্ট্রধানের।
ছবি অপসারণ
‘অপমানিত’ হওয়ার আরেকটি ঘটনা তুলে ধরতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, “একদিন হঠাৎ করে কোনো একজন উপদেষ্টা বিদেশ ভ্রমণে গেছেন। সেখানে বাংলাদেশ হাই কমিশনে আমার ছবিটা লাগানো আছে। সারা বিশ্বে বাংলাদেশের কনস্যুলেট থেকে শুরু করে হাই কমিশন—সব জায়গায় রাষ্ট্রপতির ছবি থাকে।
“কারণ স্টেটকে রিপ্রেজেন্ট করে রাষ্ট্রপতি। এটা বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। কোনো একজন উপদেষ্টা তিনি বিদেশে গিয়ে আমার ছবিটা দেখেছেন। দেখে ওখানেই কনস্যুলেটের প্রধানকে গালিগালাজ করেছেন, এই ছবি এভাবে থাকবে কেন?
“তারপর এক রাতের মধ্যে সারা পৃথিবীর সব হাই কমিশন থেকে আমার ছবি নামিয়ে দেওয়া হলো। দীর্ঘদিনের একটা রেওয়াজ রাতারাতি শেষ করে দেওয়া হলো। ওই ঘটনাটি গণমাধ্যমে এলে আমি জানতে পারি।”
রাষ্ট্রপ্রধান বলতে থাকেন, “তখন আমার মনে হয়েছে যে এটি বোধহয় আমাকে অপসারণের প্রথম ধাপ। সুতরাং পরবর্তী ধাপে হয়তো আমাকে সরিয়ে দেবে। এ জন্য আমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
“এ ছাড়া জনগণের মধ্যেও তো একটা বিরূপ বার্তা যায় যে উনাকে রাখা হচ্ছে না। এ ধরনের কাজও হয়েছে। তা-ও তো সহ্য করে, দৃঢ়তার সঙ্গে আমি থেকেছি, শুধু সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য।”
‘প্রেস উইং একদম নিল করে দিল’
আলাপচারিতায় রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, “একবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচনে জেতার পর পুরো কমিটির সদস্যরা আমার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলেন। আমি সাংবাদিকবান্ধব মানুষ হিসেবে তাঁদের সঙ্গে দেখা করি। খুবই সাধারণ একটা সাক্ষাৎ ছিল। আমাদের মধ্যে সামান্য কথাবার্তা হয়েছিল, তারপর ফটোসেশন হয়।
“ওই ঘটনা পরদিন কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশ হলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং তা স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। জোর করে উনারা খুঁজতে থাকল যে বঙ্গভবনের প্রেস উইংয়ের কে এই কাজটা করেছে।
“আসলে প্রেস উইংয়ের কেউ তো এই কাজ করেনি। আমি নিজেই সাংবাদিকদের চিঠি পেয়ে তাঁদের আসতে বলেছিলাম। কিন্তু তারা অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে তিনটা মানুষকে এখান থেকে অপসারণ করে নিয়ে গেল।
“প্রেস সেক্রেটারি, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রেস সেক্রেটারি—তিনজনকেই নিয়ে গেল। পুরো উইংটাই প্রত্যাহার করে নিয়ে গেল।”
কালের কণ্ঠ প্রশ্ন রাখে, আপনার এখন কোনো প্রেস উইং নেই?
জবাবে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “না। তিনজনকেই নিয়ে গেছে। এমনকি দুজন ফটোগ্রাফার ছিল, যারা ৩০ বছর এখানে কাজ করছিল ফটোগ্রাফার হিসেবে, তাদেরও প্রত্যাহার করে নিয়ে গেল। প্রেস উইং একদম নিল করে দিল।
“আমরা এখান থেকে কোনো প্রেস রিলিজ দিতে পারি না। বাংলাদেশের ক্রিকেট টিম কোথাও জিতলে অভিনন্দন জানিয়ে যে একটা প্রেস রিলিজ দেব, সেটাও পারি না। একদম প্রতিবন্ধী করে দিল।
“আমি রাষ্ট্রপতি হয়ে নিজে ক্যাবিনেট সেক্রেটারিকে বারবার ফোন করেছি, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিকে ফোন করেছি, এস্টাবলিশমেন্ট সেক্রেটারিকে ফোন করেছি। কেউই পাত্তা দেয়নি।”