শনিবার ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মাঘ ২৫ ১৪৩২, ১৯ শা'বান ১৪৪৭

ব্রেকিং

রাশিয়ার বড় ধরনের হামলায় ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিড ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকের ঋণ মওকুফ হবে : তারেক রহমান এমপি হয়ে প্লট, শুল্কমুক্ত গাড়ি নেব না: হবিগঞ্জে জামায়াত আমির হাদি হত্যার বিচার না পাওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবো না: হাদির বোন কারাগারে মারা গেলেন সাবেক এমপি রমেশ চন্দ্র সেন এনসিটি ইজারা: রোববার থেকে লাগাতার ধর্মঘটের ডাক মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে আহত সেই শিশুর মৃত্যু আবার বাড়লো সোনার দাম, প্রতি ভরি ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা ‘খুব ভালো’ হয়েছে : ট্রাম্প জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য সরকার? তারেক বললেন, বিএনপি ‘একাই সক্ষম’ তারেক রহমানকে ওপেন ডিবেটের আমন্ত্রণ জামায়াত আমিরের আসন্ন নির্বাচনে বিএনপিকে ‘ফেভারিট’ বলল দ্য ইকোনমিস্ট দুর্নীতিতে ‘চ্যাম্পিয়ন’: নির্বাচনি ইশতেহারে তারেকের ব্যাখ্যা ও প্রতিশ্রুতি বিশ্বকাপ শুরু, ৩০ বছর পর নেই বাংলাদেশ ইউক্রেইনে ‘মার্চের মধ্যে’ শান্তি চুক্তি ও দ্রুত নির্বাচন ‘চায় যুক্তরাষ্ট্র’

রাজনীতি

মাদারীপুরে আওয়ামী লীগের ‘ঘাঁটিতে’ বিএনপি ‘বিদ্রোহের’ মুখে

 প্রকাশিত: ১৪:৪৪, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মাদারীপুরে আওয়ামী লীগের ‘ঘাঁটিতে’ বিএনপি ‘বিদ্রোহের’ মুখে

স্বাধীনতার আগ থেকে মাদারীপুর জেলার তিনটি সংসদীয় আসনই আওয়ামী লীগের ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতার পর ১২টি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে অংশগ্রহণমূলক অধিকাংশ নির্বাচনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে শোচনীয় পরাজয় হয়েছে বিএনপির।

তবে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার সুযোগে ফুরফুজে মেজাজে রয়েছে বিএনপি, জামায়াত ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।

জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নিলেও তাদের প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রচারে অনেকটাই পিছিয়ে।

তবে তিনটি আসনের মধ্যে দুটি আসনে একাধিক ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী থাকায় বিএনপির প্রার্থী বিপাকে পড়েছেন। সেই সুযোগ নিয়ে চমক দেখাতে চায় জামায়াত ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।

মাদারীপুর-১: দুই ‘বিদ্রোহীর’ সামনে বিএনপি

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর শিবচর উপজেলা নিয়ে গঠিত মাদারীপুর-১ আসনের রাজনীতির চিত্র বদলাতে শুরু করে। বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীও মাঠে নামে। ইসলামী আন্দোলনের কর্মী-সমর্থকদের মাঠে দেখা যায়।

তবে ভোটের হিসাব বলছে ভিন্ন কথা। ভোটারদের মতে, এই আসনে ভোটে বড় ফ্যাক্টর আওয়ামী লীগের সমর্থকরা। তারা যেদিকে ঝুঁকবেন, জয়ের সম্ভাবনা তারই। আর এটা মাথায় রেখেই প্রচার চালাচ্ছেন প্রার্থীরাও।

এই আসনে বিএনপি থেকে প্রার্থী হয়েছেন চৌধুরী নাদিরা আক্তার। দলটি থেকে আছেন দুজন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী। তারা হলেন জাহাজ প্রতীক নিয়ে শিবচর উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক কামাল জামান মোল্লা এবং ফুটবল প্রতীক নিয়ে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী।

জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকের সাঈদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা। এ ছাড়া মাঠে আছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আকরাম হুসাইন, গণঅধিকার পরিষদের রাজিব মোল্লা, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মো. হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির আবদুল আলী, জাতীয় পার্টির মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম মিন্টু ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ইমরান হাসান।

বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলে কোন্দল ছিল। একাধিক নেতার বলয়ে যুক্ত ছিলেন কর্মীরা। এই কোন্দল ৫ অগাস্টের পরও নিরসন হয়নি। বিএনপির সমর্থকেরা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে নির্বাচনি মাঠে প্রচার চালাচ্ছেন।

তবে বিএনপির প্রার্থী চৌধুরী নাদিরা আক্তার বলেন, “শিবচরে বিএনপিকে বিজয়ী করতে আমরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। ভোটারদের কাছে যাচ্ছি। এবার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটের মাধ্যমে শিবচরে বিএনপি জয়লাভ করবে।”

সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, শুধু দলীয় প্রতীক নয়, ‘ব্যক্তি ইমেজও’ গুরুত্বপূর্ণ হবে এবারের ভোটে।

আব্দুল হালিম নামে স্থানীয় এক কৃষক বলেন, “যে প্রার্থী সাধারণ মানুষের পাশে থাকবে, যার কাছে সহজেই সাধারণ মানুষ পৌঁছাতে পারবে, আমরা সে রকম একজন প্রার্থীকেই চাই।”

এদিকে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী কামাল জামান মোল্লার নির্বাচনি প্রচারে শেষ মুহূর্তে এসে যুক্ত হয়েছেন তার বড় ভাই আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লাসহ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রচারের পালে লেগেছে জোর হাওয়া।

কামাল জামান মোল্লা বলেন, “আমাকে বিএনপি থেকে প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়েও ষড়যন্ত্র করে বাদ দেওয়া হয়েছে। শিবচর উপজেলার জনগণ ও তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা আমাকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংসদে দেখতে চায়। তাই আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাহাজ প্রতীকে নির্বাচন করছি। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে এই আসনটি বিএনপিকেই উপহার দেব।”

বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর পাশে আওয়ামী লীগ নেতারা যাওয়ায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের একটি অংশের মধ্যেও দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

তৃণমূলের একাধিক আওয়ামী লীগ কর্মী বলেন, প্রথম দিকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত তারা জেনেছিলেন। তবে উপজেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা হঠাৎ করেই স্বতন্ত্র এক প্রার্থীর প্রচারে প্রকাশ্যে মাঠে নেমেছে। এতে তারা বিভ্রান্ত।

স্থানীয় ভোটের পর্যবেক্ষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সমর্থকরা যাকে ভোট দেবেন, তার জয়ের সম্ভাবনা বাড়বে।

মাদারীপুর-২: বিএনপি বনাম ‘বিদ্রোহী’র লড়াই

সদর ও রাজৈর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে এবারের ভোটের মাঠে মূল লড়াই গড়ে উঠেছে বিএনপি প্রার্থী জাহান্দার আলী মিয়া এবং দলের ‘বিদ্রোহী’ স্বতন্ত্র প্রার্থী মিল্টন বৈদ্যর (কলস প্রতীক) মধ্যে।

দুই প্রার্থীরই শক্ত বলয় থাকায় আসনটিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের চিত্র তৈরি হয়েছে। জাহান্দার আলী মিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব হওয়ায় সদর ও রাজৈর উভয় অংশেই পরিচিত মুখ। দলীয় সাংগঠনিক কাঠামো ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বড় অংশ তার পক্ষে মাঠে রয়েছে।

অন্যদিকে মিল্টন বৈদ্য দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কৃত হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রাজৈর উপজেলায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। নিজ উপজেলা হওয়ায় সেখানে তার ব্যক্তিগত প্রভাব ও সামাজিক যোগাযোগ তাকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে।

স্থানীয় ভোটারদের মতে, মাদারীপুর সদর অংশে জাহান্দার আলী ছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা আলী আহমাদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুফতি আব্দুস সোবহানের নিজ নিজ অনুসারী রয়েছে।

অন্যদিকে রাজৈর অংশে মিল্টন বৈদ্য ছাড়াও ইসলামী বক্তা স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহা. কামরুল ইসলাম সাঈদও ভালো অবস্থানে রয়েছেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে জাহান্দার আলী মিয়া ও মিল্টন বৈদ্য- এই দুই প্রার্থীর বলয়ের ভোটের ভারসাম্যের ওপরই মূলত ফল নির্ভর করছে কে হবেন জয়ী।

এই আসনে মোট ভোটারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট রয়েছে, যার বড় অংশই মূলত রাজৈর উপজেলায় বসবাস করেন। ফলে মিল্টন বৈদ্যে রাজৈর উপজেলার সন্তান হওয়ায় আঞ্চলিকতার কারণে এই ভোটারদের সমর্থন বেশি থাকবে বলেও অনেকে মনে করছেন। তাই হিন্দু ভোটারদের ওপরই জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ বেশি থাকবে বলেও অনেকে মনে করেন।

রাজৈর উপজেলা আওয়ামী লীগের সমর্থক বলেন, “এবারের নির্বাচনে নৌকা প্রতীক না থাকায় আমাদের এলাকার একটা বড় অংশ ভোট দিতে আগ্রহী না। তবে অনেক ভোটার এবার আঞ্চলিকতা মাথায় রেখেও ভোট দিতে পারেন।”

এক বিএনপি কর্মী বলেন, “জাহান্দার আলী আর মিল্টন বৈদ্য- এ দুজনের মধ্যেই আসল লড়াই হবে।”

এই আসনে মোট প্রার্থী রয়েছেন ১০ জন। অন্য প্রার্থিরা হলেন- স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসলামী বক্তা মুহা কামরুল ইসলাম সাঈদ (হরিণ), জাতীয় পার্টির মো. মহিদুল ইসলাম হাওলাদার (লাঙ্গল), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের মো. দিদার হোসেন (কাঁচি), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির সুবল চন্দ্র মজুমদার (হাত ঘড়ি), ব্যারিস্টার শহিদুল ইসলাম খান (মোটর সাইকেল) এবং মো. রেয়াজুল ইসলাম (ঘোড়া)।

এই আসনে ভোটারদের অন্যতম দাবির মধ্যে রয়েছে- ভাঙ্গা-বরিশাল মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নতকরণ করা।

মাদারীপুর-৩: অনেকটাই ‘নির্ভার’ বিএনপি

কালকিনি, ডাসার ও সদরের একাংশ নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির প্রার্থী আনিসুর রহমান তালুকদার (খোকন)। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহগণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক। এখানে বিএনপির কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী নেই। ফলে বিএনপিকে এই আসনে মোকাবিলা করতে হচ্ছে প্রধানত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী রফিকুল ইসলাম মৃধাকে।

এই দুই প্রার্থীর মত প্রচারে অন্য দলের প্রার্থীরা আলোচনা সৃষ্টি করতে পারেননি। স্থানীয় ভোটাররা মনে করছেন, মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকায় এই আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে যে কোনো একজন জয়ী হবেন।

এই বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী আনিসুর রহমান তালুকদার বলেন, “আমি দলের তৃণমূল পর্যায়ের সবাইকে নিয়ে ঐক্য গড়েছি। সবাই আমার হয়ে মাঠে নেমেছে। ভোটের উৎসব শুরু হয়ে গেছে। জনগণেরও ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। আশা করছি, দলমত-নির্বিশেষে জনগণ ধানের শীষে ভোট দিয়ে আমাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করবে।”

জামায়াতের প্রার্থী মো. রফিকুল ইসলাম কালকিনি পৌর কমিটির আমির। তিনি বলেন, “জয়ের আশা নিয়েই জনগণের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি। জনগণ তাদের জীবনমানের উন্নতি চায়। এত বছরে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনে তেমন পরিবর্তন আসেনি। নতুন বাংলাদেশে মানুষ পরিবর্তনের স্বাদ নিতে চায়। সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে জনগণ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে বেছে নেবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।”