দুর্নীতিতে ‘চ্যাম্পিয়ন’: নির্বাচনি ইশতেহারে তারেকের ব্যাখ্যা ও প্রতিশ্রুতি
নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যেতে পারলে দুর্নীতি দমন এবং আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, “আমরা যদি এই তিনটির ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করি, তাহলে আমরা আমাদের কোনো পরিকল্পনাকেই সফল করে গড়ে তুলতে পারব না।”
শুক্রবার বিকালে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করে এই প্রতিশ্রুতি দেন তারেক, ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের সময় দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করেন।
‘মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’ বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতিতে ৯টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে বিএনপির এবারের নির্বাচনি ইশতেহার সাজানো হয়েছে।
দলের চেয়ারম্যান বলছেন, “এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা।”
ইশতেহারের ‘রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার’ অধ্যায়ে ‘সুশাসন’ নিয়ে আলোচনায় দুর্নীতি নিয়ে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরা হয়। সেখানেই বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের করা দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশের কয়েকবার শীর্ষে থাকার প্রসঙ্গ আসে।
এবারের নির্বাচনি প্রচারের মওসুমে জামায়াতে ইসলামী ওই সময়ের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বিএনপিকে আক্রমণ করলেও ‘দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন’ তকমার দায় বিএনপি চেয়ারম্যান দিচ্ছেন তার আগের (১৯৯৬-২০০১) আওয়ামী লীগ সরকারকে।
ইশতেহারে তারেক রহমান বলেন, “২০০১ সালের অক্টোবর মাসে আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই বিএনপি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বেগম খালেদা জিয়া'র সরকার তৎকালীন 'দুর্নীতি দমন ব্যুরো'কে সরকারের হস্তক্ষেপমুক্ত সম্পূর্ণ স্বাধীন সংস্থা হিসেবে 'দুর্নীতি দমন কমিশন' গঠন করে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বিএনপি সরকারের নানাবিধ পদক্ষেপের কারণে প্রথম বছর থেকেই দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশ অগ্রগতি লাভ করতে শুরু করে।
“ফলে ২০০২ সালে প্রকাশিত টিআইবি রিপোর্টে বাংলাদেশের স্কোর ০.৪ থেকে উন্নীত হয়ে ১.২ হয়। ২০০৩ সালে ১.৩, ২০০৪ সালে ১.৪, ২০০৫ সালে ১.৫ এবং ২০০৬ সালে ২.০। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশে দুর্নীতি কমতে থাকে।”
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের লাগামহীন দুর্নীতির ফলে ২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশের স্কোর আবারও কমতে থাকে। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জনগণের রায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই হবে সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার।”
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, “বিএনপি দুর্নীতির সাথে কোনো আপস করবে না। সমাজের সর্বস্তরে দুষ্টক্ষতের মত ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য পদ্ধতিগত ও আইনের সংস্কারের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন ও দুর্নীতি দমন আইন সংস্কারের পাশাপাশি পদ্ধতিগত সংস্কারের মাধ্যমে দুদকের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। দুদক সংস্কার সংক্রান্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গৃহীত সংস্কারগুলো যথেষ্ঠ নয় বলে বিএনপি মনে করে।”
প্রায় দুই ঘণ্টার বক্তৃতার একেবারে শেষ আবারও দুর্নীতি ও সুশাসন নিয়ে কথা বলেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, “আজকে এখানে দাঁড়িয়ে আমার দলের পক্ষ হয়ে আমি আপনাদেরকে এতটুকু বলতে চাই যে—আমার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আগামী ১২ তারিখে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ইনশাআল্লাহ সরকার গঠনে সক্ষম হলে, আমাদের সর্বাধিক আর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে এই তিনটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করা— দুর্নীতি, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতা। যে কোনো মূল্যে আমরা এটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেব।”
বিকাল সাড়ে ৩টায় ঢাকার হোটেল সোনারগাঁওয়ের বলরুমে কোরাআন তেলাওয়াত ও জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠান শুরু হয়।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব রুহুল কবির রিজভী। সবশেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান।