শনিবার ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মাঘ ২৫ ১৪৩২, ১৯ শা'বান ১৪৪৭

আন্তর্জাতিক

ইউক্রেইনে ‘মার্চের মধ্যে’ শান্তি চুক্তি ও দ্রুত নির্বাচন ‘চায় যুক্তরাষ্ট্র’

 প্রকাশিত: ১২:৪৮, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ইউক্রেইনে ‘মার্চের মধ্যে’ শান্তি চুক্তি ও দ্রুত নির্বাচন ‘চায় যুক্তরাষ্ট্র’

রাশিয়া ও ইউক্রেইনকে এ বছরের মার্চের মধ্যে শান্তি চুক্তিতে রাজি করানোর উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটি লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেইনীয় আলোচকদের মধ্যে কথা হয়েছে, তবে ভূখণ্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় ওই সময়সীমা পিছিয়ে যাবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত তিনটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এসব বলেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেইনের আলোচকদের মধ্যে যে রূপরেখা নিয়ে কথা হয়েছে, সে অনুযায়ী রাশিয়ার সঙ্গে কোনো শান্তি চুক্তি হলে তা অনুমোদনের জন্য ইউক্রেইনে গণভোট ডাকতে হবে। গণভোটে নিজেদের রায় জানানোর সঙ্গে ইউক্রেইনের ভোটাররা জাতীয় নির্বাচনেও ভোট দেবেন, বলেছে পাঁচটি সূত্র। ব্যক্তিগত আলোচনা হওয়ায় এ সূত্রগুলো নিজেদের নাম-পরিচয় প্রকাশ না করতে অনুরোধ করেছে।

আবু ধাবি ও মিয়ামিতে হওয়া সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ডনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার নেতৃত্বাধীন মার্কিন মধ্যস্থতাকারী দল ইউক্রেইনীয় আলোচকদের ‘দ্রুত নির্বাচন হলে ভালো হবে’ এমন বার্তা দিয়েছে বলে জানিয়েছে তিনটি সূত্র।

মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা বলেছেন, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসতে থাকবে ট্রাম্প ততই অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মনোযোগ বাড়াবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে মার্কিন কর্মকর্তাদের হাতে সময় এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা উভয়ই কম থাকবে, বলেছে দুটি সূত্র।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় বৃহস্পতিবার আবু ধাবিতে শেষ হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেইন আলোচনায় তিন শতাধিক যুদ্ধবন্দিকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা এবং শিগগিরই ফের আলোচনায় বসার অঙ্গীকার এসেছে। পরবর্তী ত্রিপক্ষীয় বৈঠক যুক্তরাষ্ট্রে হতে পারে বলে জানিয়েছেন ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।

মে-তে ভোট

দুটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, মে-তে ইউক্রেইনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেইনের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ সময়সীমাকে ‘অবাস্তব’ বলছে একাধিক সূত্র।

ইউক্রেইনের নির্বাচন কর্তৃপক্ষের অনুমান, এখন যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে মোটামুটি একটা নির্বাচন আয়োজন করতেও তাদের প্রায় ছয় মাসের মতো লাগবে।

“মার্কিনিরা তড়িঘড়ি করছে,” ভাষ্য এক সূত্রের। তার মতে, ভোট হয়তো ছয় মাসের আগেই করা যাবে, তারপরও তা মে পেরিয়ে যাবে।

নির্বাচনের ক্ষেত্রে আইনে পরিবর্তন আনতে হবে, কারণ ইউক্রেইনে জরুরি অবস্থার মধ্যে ভোটে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই সময়ে নির্বাচন আয়োজনে খরচও আছে।

গণভোটে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ইউক্রেইন ভোটের প্রচার চলাকালে যুদ্ধবিরতিও চায়। কিন্তু যুদ্ধে বিরতি দিতে রাজি হওয়ার পর তা ভঙ্গের অতীত ইতিহাসও আছে ক্রেমলিনের, এ নিয়েও কিইভ উদ্বিগ্ন, বলছে একটি সূত্র।

“কিইভের অবস্থান হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদাররা ইউক্রেইনকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা না দিলে কোনো কিছুতেই তারা রাজি হবে না,” বলেছে সূত্রটি।

হোয়াইট হাউস এসব বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। মন্তব্যের জন্য ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এবং ওয়াশিংটনের রুশ দূতাবাসের সঙ্গে রয়টার্স যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পায়নি।

শান্তি চুক্তির সময়সীমা নিয়ে সন্দেহ

শান্তি আলোচনায় ইউক্রেইন জেলেনস্কির চিফ অব স্টাফ ও তার পার্লামেন্টারি অংশের প্রধানের মতো উচ্চপদস্থ রাজনীতিকদের পাঠালেও রাশিয়ার আলোচক দলে প্রাধান্য পেয়েছিল সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা। মস্কোর প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন রুশ গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউ-র সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সংস্থার প্রধান অ্যাডমিরাল ইগর কোস্তিওকভ।

কোস্তিওকভের ডেপুটি লেফটেনেন্ট জেনারেল ভ্লাদিমির আলেক্সেইয়েভ শুক্রবার মস্কোতে অজ্ঞাত এক বন্দুকধারীর হামলার শিকার হয়েছেন। হামলাকারীর ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত আলেক্সেইয়েভ এখনও চিকিৎসাধীন।

রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এ হামলার জন্য ইউক্রেইনকে দায়ী করেছেন। বলেছেন, রুশ জেনারেলকে মেরে কিইভ শান্তি আলোচনা নস্যাৎ করতে চায়।

ইউক্রেইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা ওই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, হামলার সঙ্গে কিইভের কোনো ধরনের যোগসাজশ নেই।

দেশটির এক কর্মকর্তা বলেছেন, জেলেনস্কি নিকট ভবিষ্যতে নির্বাচন আয়োজনের কথা ভাবছেন এবং তাতে জেতার ব্যাপারে তিনি আত্মবিশ্বাসী।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে মার্কিন কর্মকর্তারা বারবারই ইউক্রেইনে নির্বাচন আয়োজনে তাগাদা দিয়ে আসছিলেন।

রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেইনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযানে’ নামার পর থেকে জেলেনস্কির সমর্থন ক্রমশ কমলেও এখনও তা ৫০ শতাংশের উপরে আছে বলেও ওই কর্মকর্তা দাবি করেছেন।

কিন্তু নির্বাচন বা গণভোটের আগে যেটি জরুরি, তা হল শান্তি চুক্তি; আর দনবাস অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে মস্কো-কিইভ এখনও একমত না হওয়ায় খুব দ্রুত কোনো চুক্তির আশাও দেখা যাচ্ছে না, বলেছে কয়েকটি সূত্র।

রাশিয়া বলছে, পুরো দনবাস অঞ্চল তাদের হাতে তুলে দেওয়া ছাড়া কোনো শান্তি চুক্তিই হবে না। ওই অঞ্চলের সিংহভাগ এখন মস্কোর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দুই হাজার বর্গমাইলের খানিকটা বেশি এলাকা এখনও ইউক্রেইনের দখলে রয়েছে।

ইউক্রেইন দনবাস নিয়ে রাশিয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তবে কিইভের কর্মকর্তারা এ সঙ্কট নিরসনে কিছু সৃজনশীল সমাধানের কথাও ভাবছেন, যেমন ওই অঞ্চলকে মুক্ত বাণিজ্য বা সামরিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ এমন এলাকায় পরিণত করা।

“ভূখণ্ডের প্রশ্নে এখনও কোনো অগ্রগতি হয়নি,” রয়টার্সকে এমনটাই বলেছে একটি সূত্র।

জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়েও মতবিরোধ আছে দুইপক্ষের। মস্কোর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় পড়া কেন্দ্রটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ইউক্রেইনকে সস্তায় বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া, ইউক্রেইন তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

এর পাল্টায় ওয়াশিংটন বলেছে তারা কেন্দ্রটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেইন উভয়কেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে, কিন্তু মস্কো এ প্রস্তাবে রাজি হচ্ছে না।

এসব বিষয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার পরও ইউক্রেইনের ভোটাররা গণভোটে ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারে, সেক্ষেত্রে সবই পণ্ডশ্রম হবে।

ভবিষ্যৎ রুশ আগ্রাসন থেকে সুরক্ষায় পশ্চিমা নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিনিময়ে ভূখণ্ড ছাড়ের প্রস্তাবে এখনও অনেক ইউক্রেইনীয় রাজি নয় বলে একাধিক জনমত জরিপ দেখাচ্ছে, তবে গত কয়েক বছর ধরে এ নারাজ অংশের হার ক্রমশ কমছে, বলছে রয়টার্স।