শবে কদরে বিশেষ দোয়া ও দোয়ার বিশেষত্ব
রমজান মাসের রাতসমূহের মধ্যে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময় রাত হলো শবেকদর বা কদরের রাত। এ রাত রমজান মাসের সেৌন্দর্য ও মর্যাদা আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বরকতময় এ রাতের স্রোতধারা প্লাবিত হয়েছে পবিত্র মাহে রমজান। কোরআনুল কারিমে এ রাতকে বলা হয়েছে লাইলাতুল কদর। এ রাতেই অবতীর্ণ হয়েছে মহাগ্রন্থ আল কোরআন। আল্লাহ বলেন, নিঃসন্দেহে কদরের রাতে আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি।' (সুরা কদর, আয়াত : ১)
শবেকদরের আমল ও বিশেষ দোয়া : রমজানের শেষ দশক আসার সাথে সাথেই রাসুলুল্লাহ (সা.) সপরিবারে রাত জাগরণ করে ইবাদত-বন্দেগি করতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রমজানের শেষ দশদিন আসার সাথে সাথেই রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে রাত জাগরণ শুরু করতেন এবং পরিবারবর্গকে জাগাতেন। ইবাদতের মধ্যে অত্যন্ত পরিশ্রম করতেন এবং দৃঢ় করে লুঙ্গি বঁেধে নিতেন। অর্থাত্ কোমর বঁেধে ইবাদতে আত্মনিয়োগ করতেন। (বুখারি, হাদিস : ১৯২০; মুসলিম, হাদিস: ২৮৪৪)
কদরের রাতের ইবাদত-বন্দেগি বান্দাকে গোনাহ মুক্ত করে হাজার রাতের ইবাদতের নেকি অর্জন করার সেৌভাগ্য দান করে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে কদরের রাতে ঈমানের সাথে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে কিয়ামুল লাইল (রাত জেগে ইবাদত) করবে, তার পেছনের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (বুখারি, হাদিস: ৩৫; মুসলিম, হাদিস: ১৮১৮)
লাইল হলো রাত জেগে ইবাদত করা। অর্থাত্ একান্ত মনে নফল নামাজ, মনযোগের সাথে বিশুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াত, অশ্রুবিজড়িত অবস্থায় আল্লাহর কাছে তাওবা, ইসি্তগফার ও ক্ষমা প্রার্থনা ইত্যাদির মাধ্যমে রাতকে জাগ্রত রাখা। শবেকদরে পাঠের জন্য এক বিশেষ দোয়া কথা হাদিসে এসেছে। আয়েশা (রা.) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি লায়লাতুল কদর জানতে পারলে তাতে কী প্রার্থনা করবো? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি বলবে আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফাফু আন্নি।'
অথর্াত্ হে আল্লাহ! নিশ্চয় তুমি ক্ষমাশীল দয়ালু। ক্ষমা করাকে ভালোবাসো। কাজেই আমাকে ক্ষমা করো। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫১৩; ইবন মাজাহ, হাদিস : ৩৮৫০)
বিশেষ দোয়ার বিশেষত্ব : আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফাফু আন্নি।' দোয়াটি বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ হওয়ার কারণ হলো আরবি ভাষায় মাগফিরাহ এবং আফওয়া দুটি শব্দের অর্থই ক্ষমা। কিন্তু আফওয়া' শব্দটি মাগফিরাহ শব্দের চেয়ে অধিক মর্যাদাসম্পন্ন ক্ষমা অর্থে ব্যবহার হয়। আরবি ভাষায় মুছে ফেলা অর্থে আফওয়া শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন আপনি চক দিয়ে ব্লাকবোর্ডে লিখছেন। এমন সময় আপনার লেখার মধ্যে কিছু ভুল শব্দ লিখে ফেলেছেন, তখন কি করবেন? নিশ্চয়ই ডাস্টার দিয়ে ভুল লেখাগুলো মুছে ফেলবেন? এই মুছে ফেলা অর্থে আফওয়া শব্দটি ব্যবহার হয়।
অর্থাত্ আফওয়া হলো এমন ক্ষমা, আল্লাহ আমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেওয়ার পর তা পুরোপুরি মুছে ফেলবেন। এমনকি বিচার দিনেও আমাদের সেই গুনাহগুলো সম্পর্ক জিজ্ঞেস করবেন না। আল্লাহ তঁার বান্দা এবং ফেরেশতাদের এই গুনাহগুলোর কথা ভুলিয়ে দেবেন। যেনো বিচার দিনে এই গুনাহগুলোর জন্য আমাদের অপমানিত হতে না হয়। যখন মানুষ তার পাপ কর্মের জন্য মন থেকে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চায়, তখন আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত খুশি হয়ে এই ধরনের ক্ষমা করেন। পক্ষান্তরে মাগফিরাহ অর্থও ক্ষমা। অথর্াত্ আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দিয়েছেন, কিন্তু গুনাহগুলো তারপরও লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে। বিচারের দিন এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে। বিচার দিনের আগে গুনাহগুলো মুছে ফেলা হবে না। এই দোয়ায় এই আফওয়া' শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে।