রোববার ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, পৌষ ২০ ১৪৩২, ১৫ রজব ১৪৪৭

ব্রেকিং

ঢাকা-১৭ আসনেও তারেক রহমানের মনোনয়নপত্র বৈধ দেশে কোটি কোটি ‘নকল ফোন’, বন্ধ হচ্ছে না এখনই ‘বানিয়াচং থানা পুড়িয়েছি, এসআইকে জ্বালিয়েছি’ বললেন বৈষম্যবিরোধী নেতা শরীয়তপুরে ছুরিকাঘাতের পর শরীরে আগুন, দগ্ধ খোকন দাসের মৃত্যু ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রী আটক: ট্রাম্প আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মনোনয়নপত্র বাতিল তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র বাতিল ঢাকা-১৩: বিএনপির ববি হাজ্জাজ ও খেলাফতের মামুনুলসহ ৬ জনের মনোনয়ন বৈধ ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের আমির-বিএনপির মিল্টন, ঢাকা-১০ আসনে রবির মনোনয়ন বৈধ ঢাকা-১১ আসনে এনসিপির নাহিদ ইসলামের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা মায়ের দেখানো পথেই দেশ এগিয়ে নেবেন তারেক রহমান: রিজভী কলকাতার স্কোয়াড থেকে মোস্তাফিজকে বাদ দিতে বললো বিসিসিআই জানুয়ারিজুড়ে থাকবে শীতের দাপট, আরও নামতে পারে তাপমাত্রা

ইসলাম

১৭ বছরের ইমামতির অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা

 প্রকাশিত: ১৪:২১, ৩ জানুয়ারি ২০২৬

১৭ বছরের ইমামতির অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা

প্রথম কথা—ইমামতি কোনো চাকরি নয়। ইমামতি হলো আমানত। এটি সময়ের চুক্তি নয়। এখানে দায়িত্বের কোনো শেষ নেই। এখানে কাজ বিরতিহীন, কোনো ছুটি নেই।

মুসলমানের জীবনে নামাজ এমন এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সময় হওয়ার সাথে সাথে সবার আগে এই দায়িত্ব তাকে পালন করতেই হবে। কোনো অবস্থাতেই ছুটি নেই। কাজেই ইমামতির দায়িত্বের বাৎসরিক মাসিক সাপ্তাহিক কোনো ছুটি নেই। ধর্মীয় দিবস জাতীয় দিবসেরও কোনো ছুটি নেই। বিষয়টিকে এভাবেই ভাবতে হবে।

মনে রাখবে, তুমি যখন মিম্বারে উঠবে, শুধু মানুষ তোমাকে দেখবে না। তোমার প্রতিটি শব্দ আল্লাহর দরবারে রেকর্ড হবে।

তুমি যদি ইমামতিকে কেবল বেতন, সুবিধা, অবস্থান হিসেবে দেখো তবে শুরুতেই থেমে যাও। এই পথে দীর্ঘদিন টিকে থাকা যাবে না। সবচাইতে বড় কথা এই পথ তোমার জন্য নয়।সম্মানের মোহে পড়ো না। সাবধান। এই সমাজ একদিন তোমাকে ‘হুজুর’ বলবে, আরেক দিন তোমাকে প্রশ্নে জর্জরিত করবে, পরদিন অন্যায় সন্দেহ করবে, আর সুযোগ পেলে অপমানও করবে।

এই সমাজ তোমাকে সম্মান দেবে—যতদিন তুমি তাদের সুবিধার মধ্যে থাকবে। তাদের ইচ্ছাগুলো তুমি বাস্তবায়ন করবে। যেদিন তুমি সত্য বলবে, অপ্রিয় কথা বলবে, সুবিধার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে সেদিন বুঝবে

সম্মান আসলে কতটা জটিল। তাই সম্মানের নেশায় মাতবে না।কঠিন কঠিন পরিস্থিতি ধৈর্যের দ্বারা মোকাবেলা করতে হবে। মনে রাখবে মর্যাদা আল্লাহ দেন, মানুষ নয়। মানুষের সন্তুষ্টি নয় তোমার লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি।

প্রস্তুত থেকো—তোমাকে একা করে দেওয়া হবে। মসজিদে ঢুকে তুমি ভাববে ‘এখানে সবাই দীনের মানুষ।’ কিন্তু অচিরেই দেখবে— পক্ষ, উপদল, প্রভাব, আধিপত্য। কেউ চাইবে তুমি তার লোক হও, কেউ চাইবে কারো বিপক্ষে কথা বলো।আর তুমি যদি নিরপেক্ষ থাকো—তখনই তুমি সবচেয়ে বেশি একা হয়ে যাবে। এই একাকিত্বের জন্য প্রস্তুত থেকো। কারণ ইমামতির পথ অধিকাংশ সময় নিঃসঙ্গতার পথ। কখনো কেউ পাশে থাকে না।কঠিন পরীক্ষার জন্য মানসিকভাবে তৈরি থেকো। একদিন তোমার যোগ্যতা মাপা হবে তোমার ইলম দিয়ে নয়, তোমার তাকওয়া দিয়ে নয়,

বরং তুমি কত টাকা তুলতে পারো, কত ডোনেশন আনতে পারো।তোমাকে বলা হবে এ সপ্তাহে তুমি কত টাকা তুলতে পারলে ‘ইমাম মানেই কালেক্টর।’ অবশ্যই মনে রাখবে। টাকা তোলা তোমার পরিচয় নয়। তোমার পরিচয় তুমি নামাজের আমানতের জিম্মাদার।

হালাল স্বাবলম্বনকে লজ্জা মনে কোরো না। সমাজ চায়—তুমি দানের উপর বাঁচো, কারো দয়ার ওপর নির্ভরশীল থাকো। কিন্তু তুমি জানবে—হালাল উপার্জন ইমামের জন্য অপমান নয়, বরং নিরাপত্তা। কাজেই তুমি ইমামতির পাশাপাশি শিক্ষকতা করো, দীনি প্রতিষ্ঠান গড়ো, কারো তোষামোদি করে নয় পরিশ্রম করে খাও। হারাম হাদিয়া, শরিয়তবহির্ভূত তোহফা—এসবকে কখনো নিজের হক মনে কোরো না।

মনে রেখো—তুমি মালিক নও, তবু দায় তোমার। তুমি মসজিদ গড়বে, মানুষ বানাবে, প্রজন্ম তৈরি করবে। কিন্তু একদিন দেখবে—তুমি সেখানে ভাড়াটিয়া। হঠাৎ ক্ষমতার পরিবর্তনে সমাজের মালিক বদলে যাবে, বদলে যাবে মসজিদ কমিটি, নতুনরা এসে তোমার অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ করবে। তোমাকে গুরুত্বহীন করে দেবে। তুমি হতাশ হবে না।কারণ তোমার আসল মালিক আল্লাহ। আল্লাহর সাথে তোমার আসল চুক্তি আখেরাতের। নিরাশ হবে না ভেঙে পড়বে না।

মনে রাখবে, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন। তিনি সর্বাবস্থায় তোমার সাথে আছেন। আল্লাহর ওপর সর্বোচ্চ আস্থা নিয়ে বলবে আল্লাহ আমার সাথে আছেন।

সমাজের বাস্তবতাকে সামনে রেখে জুমার আলোচনা প্রস্তুত করবে। সমাজের যা প্রয়োজন তাই বলবে। হক বলতে কাউকে ভয় পাবে না। আলোচনার নোট সংরক্ষণ করবে। সম্ভব হলে আলোচনা রেকর্ড করবে।

আগামী প্রজন্মের জন্য তোমার আলোচনাগুলো স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে।প্রজন্ম তোমার থেকে শিখবে একজন ইমাম কীভাবে ভাবতো? তোমার লেখা তাদের জন্য উপকারী হবে।

তোমার সমস্ত কান্না জমিয়ে রেখো সেজদার জন্য, তুমি অসহায়ত্বে কাঁদবে না। নিজেকে দুর্বল ভাববে না। মানুষের সামনে দুর্বল হবে না। সমাজ ও পরিবারের সামনে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করবে না। সর্বাবস্থায় সাহস নিয়ে চলবে। ঈমানের অপর নাম সাহস। তোমার কাঁদার জন্য, অসহায়ত্ব প্রকাশের জন্য একটি নিরাপদ জায়গা আছে। তা হলো সেজদা। সেখানে গিয়ে ভেঙে পড়ো। সেখানে গিয়ে অভিযোগ করো। কারণ আল্লাহই একমাত্র সত্তা যিনি তোমার কান্না বুঝবেন। তার কাছে অবশ্যই তোমার কান্নার মূল্য আছে।

মনে রেখো—তুমি সমাজের নীরব নির্মাতা। তুমি আলোচনায় নাও থাকতে পারো, খবরে নাও থাকতে পারো, কিন্তু সমাজের ভিত তোমার হাতেই গড়ে ওঠে। একটি শিশুর নামাজ, একজন বৃদ্ধের ঈমান, একটি পরিবারের দোয়া—এসব তোমার আমানত। আল্লাহ তোমাকে যে সম্মান দিয়েছেন এটাকে বোঝার চেষ্টা করবে। নিজেকে ছোট মনে কোরো না।

তোমার প্রতি আল্লাহর নেয়ামত স্মরণ করো। মানুষের কাছে অসহায়ত্ব দুর্বলতার কথা বলবে না। বরং তোমার ওপর আল্লাহর সীমাহীন নেয়ামতগুলোকে সকলের কাছে প্রকাশ করো। মনে রাখবে কৃতজ্ঞতার দ্বারা নিয়ামত বৃদ্ধি পায়। আর অকৃতজ্ঞতা আল্লাহর আজাবকে ডেকে আনে।ইমামতির এই পথ সহজ নয়, কিন্তু পবিত্র। এই পথ আরামদায়ক নয়, কিন্তু সম্মানজনক আল্লাহর কাছে। যদি সব হারিয়েও আল্লাহকে ধরে রাখতে পারো তবে তুমি সফল। আর যদি সব পেয়ে আল্লাহকে হারাও—তবে তুমি সবচেয়ে বড় ব্যর্থ।

ইমামতির মুসল্লায় থেকে আল্লাহকে পাওয়ার চেষ্টা করো। সমাজের প্রভাবশালী বিত্তবানদের থেকে দূরে থাকো। সাধারণ মানুষের সাথে মহব্বতের সম্পর্ক তৈরি করো।আল্লাহ আমাদের কবুল করুন, আমাদের মিম্বারকে হেফাজত করুন, আমাদের কলম, কণ্ঠ ও চরিত্রকে উম্মাহর জন্য রহমত বানান।

এ গল্পগুলো সব আমার নয়। তবে আমাদের সমাজের গল্প।